যন্তর মন্তর থেকে সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিয়ে গেল পুলিশ, প্রতিবাদ সিজেপির

India

-Ritesh Ghosh

দিল্লির যন্তর মন্তরের ঐতিহাসিক প্রতিবাদস্থলে পরিবেশ আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলন নতুন এক চরম নাটকীয় মোড় নিল। টানা ২১ দিন ধরে চলা অনশনের পর, এদিন শনিবার ভোরে দিল্লি পুলিশ অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে ওয়াংচুককে জোর করে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এই পুলিশি অভিযানের প্রতিবাদে এবং ওয়াংচুকের আন্দোলনকে সচল রাখতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে অবিলম্বে আমরণ অনশন শুরু করার ঘোষণা করেছেন।

সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে দিপকে জানান, সোনম ওয়াংচুককে জোর করে সরিয়ে নেওয়ার সময় তিনি প্রতিবাদ করতে গেলে দিল্লি পুলিশ তাঁর ওপর মারাত্মক অত্যাচার চালায়। তাঁকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয় এবং দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। শুধু দিপকে একাই নন, সেখানে উপস্থিত সিজেপির অন্যান্য আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ অত্যন্ত নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করেছে বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

Sonam Wangchuk detained by police at Jantar Mantar protest

দিল্লি পুলিশের ধরপাকড় ও আন্দোলনকারীদের তীব্র ক্ষোভ

অভিজিৎ দিপকে মুক্তি পাওয়ার পর একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আন্দোলনের পরবর্তী রূপরেখা এবং পুলিশের বর্বরোচিত আচরণের বিশদ বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, শনিবার সকাল ৭টার দিকে যখন তিনি প্রাতঃকৃত্যের জন্য বাইরে গিয়েছিলেন, তখনই বিপুল সংখ্যক পুলিশ এসে ৬০ বছর বয়সী আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুককে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে নেয়। তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অনাহারে থাকা একজন প্রবীণ মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত সংবেদনহীন আচরণ করা হয়েছে।

ওয়াংচুককে “অপহরণ” করার মতো করে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে বলে ক্ষুব্ধ দাবি ব্যক্ত করেছেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একজন আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মানিত পরিবেশবিদ এবং সমাজকর্মীকে কেন গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ করার অপরাধে এভাবে হেনস্তা হতে হল? দিপকে বলেন, তিনি বিদেশে নিজের উচ্চশিক্ষা ও কাজ শেষ করে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে ভালোবাসার টানে ভারতে ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু পুলিশ এখন তাঁর সঙ্গে দাগী অপরাধীর মতো ব্যবহার করছে।

পুলিশের এই বর্বরোচিত ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দিপকে আরও বলেন, যারা এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, তারা সাধারণ মানুষের আবেগের কোনও তোয়াক্কা করে না। যন্তর মন্তর থেকে সোনম ওয়াংচুককে ঠিক কোন হাসপাতালে বা কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেই বিষয়ে পুলিশের তরফ থেকে তাঁর অনুগামীদের সঠিক কোনও তথ্য না দেওয়ায় প্রতিবাদীদের উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

আন্দোলন পণ্ড করতে দিল্লি পুলিশের এই অতিসক্রিয়তাকে ধিক্কার জানিয়ে সিজেপি নেতৃত্ব দাবি করেছেন যে, বলপ্রয়োগ করার মাধ্যমে আন্দোলন দমন করার এই চেষ্টা পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারে পুলিশের এমন ন্যক্কারজনক হস্তক্ষেপ অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং সংবিধান প্রদত্ত অধিকারের পরিপন্থী। ওয়াংচুকের আদর্শ এবং লড়াই কেবল তাঁর ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং তা দেশের আপামর জনসাধারণের লড়াই হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ বানচালের চক্রান্ত

যন্তর মন্তরের এই অবস্থান বিক্ষোভ দীর্ঘায়িত হওয়া আটকাতে আগে থেকেই গভীর ষড়যন্ত্র চলছিল বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা জানান, কয়েক দিন আগেই তিনি পুলিশের একটি বিশ্বস্ত সূত্রের মারফত পরিষ্কার আভাস পেয়েছিলেন যে, আন্দোলন পণ্ড করতে এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য কিছু বহিরাগত উসকানিদাতাকে পাঠানো হতে পারে। এই বিষয়ে অগ্রিম আশঙ্কার কথা প্রশাসনের কাছে জানানো সত্ত্বেও কোনও ইতিবাচক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

এমনকী আন্দোলন চলাকালীন গত সপ্তাহে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি যন্তর মন্তরে সোনম ওয়াংচুকের অবস্থান মঞ্চ লক্ষ্য করে একটি ক্ষতিকর বস্তু ছুড়ে মেরেছিল বলেও জানা গিয়েছে। সৌভাগ্যবশত সেই যাত্রায় ওয়াংচুক কোনও বড় চোট পাননি। এই ধরনের ক্রমবর্ধমান প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও অনশনের ২০ তম দিনে ওয়াংচুক জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, যেকোনও উপায়ে লড়াই চালিয়ে যাবেন এবং সরকারকে লাদাখের মানুষের দাবি মানতে বাধ্য করবেন।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত পুলিশি দমন অভিযানের পরেও লড়াইয়ের ময়দান ছাড়তে নারাজ প্রতিবাদী নেতৃত্ব। সব প্রতিকূলতার উর্ধ্বে গিয়ে দিপকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, আগামী ২০ জুলাই পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ‘চলো সংসদ’ যাত্রা নিশ্চিতভাবে অনুষ্ঠিত হবে। কোনও লঠিচার্জ বা আটক করার ভয় দেখিয়ে এই পদযাত্রা থামাতে পারবে না সরকার। দেশের যুবসমাজ এবং সচেতন নাগরিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই পদযাত্রায় শামিল হতে চলেছেন।

লাদাখের অস্তিত্ব রক্ষা ও ষষ্ঠ তপশিলের ঐতিহাসিক লড়াই

সোনম ওয়াংচুকের এই দীর্ঘ আন্দোলনের পিছনে লুকানো রয়েছে লাদাখের অমূল্য প্রাকৃতিক পরিবেশ ও তাদের মৌলিক সংস্কৃতিকে রক্ষা করার গভীর গুরুত্ব। লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা প্রদান এবং ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তপশিলের আওতায় এনে সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধিকার ও জমির ওপর সার্বভৌম অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলনটি গড়ে তোলা হয়েছে। পরিবেশের অবক্ষয়কারী বড় কর্পোরেট প্রকল্পগুলির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ওয়াংচুকের সওয়াল আজ এক বৈশ্বিক গুরুত্ব ধারণ করেছে।

এই আন্দোলনের প্রতি দেশের বুদ্ধিজীবী মহল, যুব সমাজ এবং অসংখ্য পরিবেশপ্রেমী মানুষ সংহতি প্রকাশ করেছেন। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ প্রথম থেকেই ওয়াংচুকের এই মহৎ ও দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের পিছনে নিজেদের নৈতিক সমর্থন জুগিয়ে আসছিল। ফলে, দিপকের অনশনে সামিল হওয়া এবং পুলিশের আকস্মিক বলপ্রয়োগ আন্দোলনের গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং দেশের রাজনৈতিক প্রাঙ্গণকে চরম নাড়া দিয়েছে।

ওয়াংচুকের মতো একজন জাতীয় নায়ককে এভাবে আটক বা নিষ্ক্রিয় করে রাখার ঘটনা নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন মানবাধিকার আন্দোলনকারীরাও। যন্তর মন্তরের শান্তিপূর্ণ আঙিনাকে যেভাবে ব্যারিকেড ও বাহিনী দিয়ে অবরুদ্ধ করা হয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারে ক্ষতের সৃষ্টি করছে। তবে লড়াই ভেঙে পড়ার বদলে সরকারের এই হঠকারী নীতি এই আন্দোলনকে আপামর ভারতের একটি একক লড়াইয়ে রূপান্তর করেছে।

আপাতত যন্তর মন্তর ও তার পার্শ্ববর্তী সংলগ্ন রাজপথগুলিতে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। ওয়াংচুকের শারীরিক হালহকিকত জানার জন্য যেমন সাধারণ মানুষ উতলা হয়ে উঠেছেন, তেমনই দিপকের প্রতিবাদের সুর সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে বহুগুণে উস্কে দিচ্ছে। ২০ জুলাইয়ের প্রস্তাবিত পদযাত্রার ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী হতে চলেছে এবং কেন্দ্র সরকার কোন অবস্থান নেয়, তার ওপর এখন সারা দেশের নজর আটকে রয়েছে।

Previous post

দময়ন্তী সেন অবশেষে উদ্ধার! কোথায় পাওয়া গেল বাংলার শ্যুটারকে? হাওড়া থানায় চলছে জিজ্ঞাসাবাদ

Next post

সোনম ওয়াংচুকের পর এবার আমরণ অনশনে সিজেপি প্রধান দিপকে, এবার পদত্যাগ দাবি প্রধানমন্ত্রীর

Post Comment

You May Have Missed