তামান্না খুনের তদন্তে রকেট গতি! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর কড়া পদক্ষেপে পুলিশের জালে প্রায় সব অভিযুক্তই!
West Bengal
-Ritesh Ghosh
নদিয়ার কালীগঞ্জের তামান্না খাতুন হত্যাকাণ্ডে অবশেষে মিলতে চলেছে পূর্ণাঙ্গ বিচার। বিধানসভায় তামান্নার মায়ের পাশে দাঁড়ানোর আর্তি জানানোর পর, নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে রক্ষা করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গত কয়েক দিনে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে ধরা পড়েছে তামান্না খুনের আরও ১২ জন প্রধান অভিযুক্ত। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ এই ধৃতদের নামের সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করেছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সমাজমাধ্যমের পোস্টে পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, রাজ্য প্রশাসনের জন্য তামান্নার পরিবারকে দ্রুত ন্যায়বিচার দেওয়া সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারের বিষয়। আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর পুলিশ প্রশাসনের এই ঝোড়ো অভিযান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। দীর্ঘদিন পলাতক থাকা এই অপরাধীদের গ্রেফতারের মাধ্যমে রাজ্য কানুন ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের পথে আরও একধাপ শক্তভাবে এগিয়ে গেল।

গত বছরের ২৩ জুন রাজ্যের উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার পর চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল কালীগঞ্জ থানার মোলান্দি গ্রামে। সেই সময় হঠাৎ একদল রাজনৈতিক দুষ্কৃতীদের বোমাবাজিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছিল মাত্র ৯ বছরের তামান্না খাতুন। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো অঞ্চল স্তব্ধ হয়ে যায়। ঘটনার পর থেকেই এলাকা ছেড়ে দূর রাজ্যে পালিয়ে গিয়েছিল অভিযুক্তদের একটি বড় অংশ। সুবিচারের দাবিতে তখন থেকেই প্রশাসনের দরজায় হন্যে হয়ে ঘুরছিলেন নিহতের মা সাবিনা ইয়াসমিন।
মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর মা সাবিনা ইয়াসমিন কালীগঞ্জ থানায় ২৪ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্তে নেমে প্রাথমিক পর্যায়ে ১১ জনকে গ্রেফতার করতে পারলেও বাকি অভিযুক্তরা রাজ্য থেকে পালিয়ে যায়। এর ফলে মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া গতি হারাতে শুরু করে। কিন্তু রাজ্যে প্রশাসনিক পালাবদলের পরই এই ঘটনার তদন্তে অদ্ভুত আমূল আমেজ ও দ্রুততা লক্ষ করা গেল।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অধিবেশনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ দৃঢ়ভাবে উত্থাপন করেন। তিনি অধিবেশনে দাঁড়িয়ে জোর দিয়ে বলেন যে, প্রশাসনের অবহেলায় কোনো পরিবার আর অবিচারের শিকার হবে না এবং তামান্নার পরিবার অবশ্যই বিচার পাবে। এর পরেই তিনি মৃত শিশুর মা সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন।
মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশের পর আর দ্বিতীয়বার ভাবেনি কৃষ্ণনগর জেলা পুলিশ প্রশাসন। পলাতক দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করে তাদের গ্রেফতার করার জন্য একটি অত্যন্ত সুদক্ষ বিশেষ গোয়েন্দা দল বা স্কোয়াড গঠন করা হয়। গোপন সূত্রে খবর সংগ্রহ করে পুলিশ দল পশ্চিমবঙ্গ সীমানার ওপারেও জাল বিস্তারিত করে। এরপরই হরিয়ানার গুরগাঁও এবং মহারাষ্ট্রের নাগপুরের মতো দূরবর্তী শিল্পাঞ্চল থেকে কয়েকজন অভিযুক্তকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়।
বর্তমানে মামলার মূল এফআইআর-এ নাম থাকা প্রায় প্রত্যেক অপরাধীই এখন জেলা পুলিশের কড়া হেফাজতে রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া সোশ্যাল মিডিয়া তালিকা থেকে স্পষ্ট যে, যেভাবে দেশের বিভিন্ন কোণ থেকে অপরাধীদের মাত্র কয়েক দিনে খুঁজে ট্র্যাকিং করা হয়েছে, তা নদিয়া জেলা পুলিশ প্রশাসনের নিখুঁত পরিকল্পনা ও সাহসিকতার পরিচায়ক। এর ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষও এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং হতাশার পাহাড় পেরিয়ে অবশেষে সুবিচারের আশায় উন্মুখ হয়ে উঠেছেন মৃত তামান্নার পরিবার। এর আগে তামান্নার মা সাবিনা ইয়াসমিন প্রাক্তন সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কাছে বহুবার আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর দাবি ছিল। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তৎপরতা তাঁর সেই পুরোনো সমস্ত ক্ষোভকে ভুলিয়ে নতুন করে আইনের প্রতি আস্থাশীল করেছে।
প্রশাসনের এই সাফল্যে তামান্নার মা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “আমার মেয়েকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু ওর হত্যাকারীদের কোমরে দড়ি পড়লে ওর আত্মা অন্তত শান্তি পাবে। এতদিন ভয়ে ও আতঙ্কে কাটাতাম, এখন মনে হচ্ছে এই রাজ্যে আইনের শাসন সত্যি আছে।” মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কেঁদে ফেলেন সাবিনা।
আইনি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই সংবেদনশীল মামলায় চার্জশিট পেশ করার ক্ষেত্রে পুলিশের এই ঝোড়ো তৎপরতা অনেক বেশি সুবিধা দেবে। পলাতক থাকা অপরাধীদের পেছনে সময় নষ্ট না হওয়ায় ট্রায়াল বা বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করা যাবে। পুলিশ খুব শীঘ্রই ধৃতদের আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে, যাতে হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের সমস্ত বিবরণ বাইরে আনা যায়।
নবান্নের উচ্চপদস্থ সূত্রের খবর, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে নতুন সরকার। ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসায় বা কোনো রকম অপরাধমূলক ঘটনায় নিষ্পাপ শিশুদের ওপর আঘাত কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। নদিয়া জেলার কালীগঞ্জের এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও আসামিদের গ্রেফতার তারই জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে দেখছে ওয়াকিবহাল মহল।



Post Comment