শোয়েব আখতারের দাদার শেষকৃত্য হাজির পহেলগাঁও হামলার মাস্টারমাইন্ড লস্কর জঙ্গিরা!
International
-Ritesh Ghosh
পাকিস্তানের প্রাক্তন তারকা পেসার শোয়েব আখতারের বড় ভাই শাহিদ আখতারের শেষকৃত্যে লস্কর-ই-তৈবা (এলইটি) জঙ্গি সংগঠনের প্রথম সারির জঙ্গিদের উপস্থিতি ঘিরে তীব্র আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ইসলামাবাদের এইচ-৮ কবরস্থানে অনুষ্ঠিত এই শেষকৃত্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতের নিরাপত্তা মহল এবং আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে পাকিস্তানে জঙ্গিরা কতটা অবাধে বিচরণ করতে পারে।
ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, লস্করের ডেপুটি চিফ সইফুল্লা কাসুরি এবং এই জঙ্গি সংগঠনের রাজনৈতিক মুখ হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান মার্কাজি মুসলিম লীগের (পিএমএমএল) সভাপতি ইনাম উর রহমান সরাসরি ওই শেষকৃত্যে যোগ দিয়েছেন। গত ২৪ জুন শাহিদ আখতারের মৃত্যুর পর শোয়েব আখতারের পারিবারিক এই শোকের মুহূর্তে কুখ্যাত জঙ্গি নেতাদের উপস্থিতি পাকিস্তানের সাধারণ এলাকাগুলোতে জঙ্গিদের অবাধ যাতায়াত ও গভীর প্রভাবকে আবারও বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করেছে।

জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক জঙ্গি তথা লস্কর প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ সইদ মূলত জামাত-উদ-দাওয়া এবং মিলি মুসলিম লীগের মতো মূল ধারার নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর ওপর চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতেই এই পিএমএমএল নামের নতুন রাজনৈতিক দলের জন্ম দিয়েছেন। এই ছদ্মবেশী উগ্রপন্থী সংগঠনটি ২০২৪ সালের পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনেও পূর্ণ শক্তিতে অংশ নিয়েছিল। ক্রিকেটারের ভাইয়ের শেষকৃত্যে পিএমএমএল সভাপতির উপস্থিতি দেখিয়ে দিল যে দেশটির স্থানীয় রাজনীতিতেও জঙ্গিরা সরাসরি সক্রিয় রয়েছে।
মুম্বইয়ের নৃশংস ২৬/১১ হামলা থেকে শুরু করে কাশ্মীরের পহেলগাাঁওয়ে লালিত উগ্রপন্থীদের সাম্প্রতিক নাশকতা পর্যন্ত প্রতিটি রক্তক্ষয়ী ঘটনার পিছনে লস্কর-ই-তৈবার নাম সরাসরি জড়িত থেকেছে। রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট এই সন্ত্রাসবাদীরা যেভাবে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের বুকে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ। আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি সংস্থা এবং বাকি বিশ্বকে তোয়াক্কা না করেই পাকিস্তান উগ্রপন্থীদের নিরাপদ লালনক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
লস্করের সহ-প্রধান সইফুল্লা কাসুরি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য উস্কানি ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রচারের জন্য পরিচিত। গতবছরে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় ২৫ জন পর্যটকের মৃত্যুর পর কাসুরির একাধিক ভারত-বিরোধী বক্তব্য সম্বলিত ভিডিও নতুন করে সামনে এসেছে। ওই নাশকতার কঠোর জবাব দিতে ভারত তাৎক্ষণিকভাবে সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করে এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে থাকা একাধিক জঙ্গি ঘাঁটি তছনছ করে দিয়েছিল।
ভারতের সেই অতর্কিত প্রত্যুত্তরের পর থেকেই লস্কর-ই-তৈবার মূল ঘাঁটিগুলোতে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই সইফুল্লা কাসুরি ভারতকে উদ্দেশ্য করে সমুদ্রপথে আবারও ২৬/১১-এর মতো আর একটি বড় মাপের নাশকতার ছক কষার ও হামলার প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রচারিত অন্য একটি ভিডিও বার্তায় এই জঙ্গিনেতাকে বলতে শোনা যায়, ভারতের জন্য জল, স্থল বা আকাশ কোনও পথেই আর কোনও নিরাপদ জায়গা অবশিষ্ট রাখা হবে না।
এই পুরো বিতর্কের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হল কাসুরির মুখ থেকেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে লস্করের সরাসরি যোগসূত্রের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়া। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কাসুরিকে নিজের মুখে দাবি করতে দেখা গেছে যে, পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা তাকে প্রায়শই তাদের সরকারি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। এমনকী নিহত পাকিস্তানি সেনাদের শেষকৃত্যের নমাজেও তাকে বিশেষভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।
গত বছর ভারতের পক্ষ থেকে চালানো আকস্মিক ও শক্তিশালী বহুমুখী হামলার পর লস্কর ও জম্মু-কাশ্মীর কেন্দ্রিক অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছিল। মুরিদকে এলাকায় অবস্থিত লস্করের মূল সদর দফতরসহ রাওয়ালপিন্ডি এবং সুক্কুর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি সামরিক মদতপুষ্ট একাধিক ক্যাম্প ভারতের নিখুঁত নিশানা ও অভিযানের মুখে ধ্বংস হয়ে যায়। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই ধ্বংসলীলা সামলে উঠে লস্করের জঙ্গিরা এখন গোপনে তাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা পুনর্গঠিত করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
শোয়েব আখতার ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিলেও বিশ্বজুড়ে ধারাভাষ্যকার ও ক্রিকেট বিশ্লেষক হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। একসময় আইপিএলেও তিনি মাঠের ভেতরে খেলেছেন এবং পরে দীর্ঘদিন ধারাভাষ্য দিয়েছেন। তার মতো একজন বিশ্বখ্যাত তারকার পারিবারিক আচারের সাথে জঙ্গিদের নাম জড়িয়ে পড়ায় পাকিস্তান ক্রিকেটের ওপর থাকা পুরানো কালিমা আরও স্পষ্ট হল।
পারিবারিক অনুষ্ঠানে জঙ্গিদের এই ভিড় প্রমাণ করে যে, আমেরিকার চাপ বা আন্তর্জাতিক কঠোর নীতি সত্ত্বেও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাস দমনের বিষয়টি কতটা লোক দেখানো। ভারতের কঠোর অবস্থান এবং অভিযানের পরেও ইসলামাবাদের এই নির্লিপ্ততা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে। বিশ্ব পরিমণ্ডলে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের মরিয়া চেষ্টা চালালেও, দেশের মাটিতে উগ্রপন্থা দমনে পাকিস্তানের দ্বিচারিতাই শেষ পর্যন্ত সামনে চলে আসে।



Post Comment