গ্রামগঞ্জের সুপ্ত প্রতিভা দেখাবে ব্যবসার নতুন দিশা, আদানির ‘বন্দে ভারতম’ মিশন বদলাতে চলেছে দেশকে
India
-Ritesh Ghosh
ভারতের স্টার্টআপ মানচিত্রে বৈপ্লবিক বদল আনতে ও প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে নিজের ৬৪তম জন্মদিনে এক অভিনব উদ্যোগের ঘোষণা করলেন আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। দেশের প্রতিটি কোণ থেকে প্রতিভাবান উদ্ভাবক, তৃণমূল স্তরের উদ্যোক্তা ও সমাজ সংস্কারকদের খুঁজে বের করতে শুরু হল ‘বন্দে ভারতম’ নামের একটি দেশব্যাপী কর্মসূচি। ভারতের ৩৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৮০০টিরও বেশি জেলা থেকে সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক ধারণা বা স্টার্টআপ আইডিয়া বড় মঞ্চে নিয়ে যাওয়াই এর প্রধান লক্ষ্য।
উদ্যোক্তা তৈরির এই নতুন প্ল্যাটফর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এটি সাধারণ স্টার্টআপের মতো কোনো গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিক—যেকোনও বয়সের এবং যেকোনও পেশার মানুষ এখানে অংশ নিতে পারবেন। এমনকী আবেদন করার জন্য আবেদনকারীর উচ্চশিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা বা কোনও নির্দিষ্ট পর্যায়ে ব্যবসা চালু থাকা বাধ্যতামূলক নয়। কোনও ব্যক্তি বা দল একদম প্রাথমিক স্তরের চিন্তাভাবনা বা প্রোটোটাইপ নিয়েও এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে পারবেন।

বর্তমান সময়ে ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম বিশ্বজুড়ে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। তবে একটি বড় বাস্তবতা হল, অধিকাংশ সফল স্টার্টআপ বা উদ্ভাবন কেবল বেঙ্গালুরু, মুম্বই বা দিল্লির মতো গুটিকয়েক বড় মেট্রোপলিটান শহর বা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে। দেশের গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় বসবাসকারী বহু প্রতিভাবান মানুষ উপযুক্ত সুযোগ, আধুনিক পরিকাঠামো, সঠিক মেন্টরশিপ এবং প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে নিজেদের আইডিয়া বা ধারণাকে সফল ব্যবসায় রূপ দিতে পারেন না।
‘বন্দে ভারতম’ উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হল এই ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক ব্যবধান দূর করা। এই কর্মসূচিতে প্রযুক্তির পাশাপাশি ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি, স্থায়িত্ব বা সাসটেইনেবিলিটি, ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানের মতো বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রকে গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। গ্রামীণ অঞ্চলের উদ্যোক্তা, আদিবাসী সম্প্রদায়ের উদ্ভাবক, নারী উদ্যোক্তা এবং বিশেষভাবে সক্ষম তথা দিব্যাঙ্গ ব্যক্তিদের আইডিয়াকে উৎসাহ দিতে এই প্রকল্পে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে।
এই উদ্যোগের পেছনে নিজের আবেগ ও অতীত জীবনের লড়াইয়ের কথা তুলে ধরতে গিয়ে গৌতম আদানি বলেন, “আমি যখন নিজের জীবনযুদ্ধ শুরু করেছিলাম, তখন আমার কাছে কিছুই ছিল না। আজ আমি যা কিছু অর্জন করতে পেরেছি, তা সবই দেশের মানুষের ভালোবাসা ও এই ভারতের মাটির অবদান। আমাদের দেশে মেধার কোনও অভাব নেই, কিন্তু অগ্রগতির সমান সুযোগ সবসময় দেশের প্রতিটি শেষ প্রান্তে গিয়ে পৌঁছতে পারেনি।”
আদানি গ্রুপের প্রধান আরও আশা প্রকাশ করেন যে, এই উদ্যোগের হাত ধরে এমন সব গোপন প্রতিভা বা চিন্তাবিদ উঠে আসবেন, যাঁরা কেবল নিজেদের ব্যবসাই দেখাবেন না, বরং দেশের মানুষের দৈনন্দিন নানা সংকট মেটানোর পথও দেখাবেন। সেই কারণেই ‘বন্দে ভারতম’ কর্মসূচিকে শুধু একটি প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে, নতুন প্রজন্মের ভারত বিনির্মাণের একটি সহযোগী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।
সরাসরি আবেদনের জন্য ইতিমধ্যেই গত ২৪ জুন থেকে দেশের সব প্রান্তের মানুষের জন্য বন্দে ভারতম পোর্টাল খুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে নাম নথিভুক্ত করার পর প্রাপ্ত আবেদনপত্রগুলির উদ্ভাবনী ক্ষমতা, ব্যবসায় রূপান্তরের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং সামাজিক গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা একাধিক ধাপে নিখুঁত মূল্যায়ন করা হবে। প্রথম দিকে রাজ্য ও আঞ্চলিক স্তরের স্ক্রিনিং শেষে সারা দেশ থেকে মোট ৭৫ জন সেরা আবেদনকারীকে বেছে নেওয়া হবে।
চূড়ান্ত পর্বে নির্বাচিত এই ৭৫ জন উদ্ভাবককে গুজরাতের আহমেদাবাদে এক মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। সেখানে তাঁরা দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি, সফল স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা, প্রখ্যাত বিনিয়োগকারী এবং দক্ষ ব্যবসায়িক বিশেষজ্ঞদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পাবেন। এর মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের ব্যবসার প্রসারের সঠিক পরিকল্পনা ও বিপণন কৌশল শিখবেন। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক জমকালো জাতীয় গ্র্যান্ড ফিনালেতে এই বছরের প্রতিযোগিতা শেষ হবে।
নির্বাচিত প্রতিভাবানদের কাজের সুবিধার্থে আদানির পক্ষ থেকে ইনকিউবেশন সাপোর্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বের বন্দোবস্ত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির মূল আকর্ষণ বাড়াতে নামী অভিনেতা, সঞ্চালক তথা নিজস্ব ব্র্যান্ডের উদ্যোক্তা রাজীব খন্ডেলওয়ালকে এই প্রকল্পের প্রচারদূত ও মূল ঘোষক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি দেশজুড়ে এই ক্যাম্পেন সফল করতে কাজ শুরু করেছেন। পুরস্কারের মোট অঙ্কের পরিমাণ ও বাকি পুরস্কারের অন্যান্য মানদণ্ড শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবেন কর্তৃপক্ষ।
| প্রকল্পের নাম | বন্দে ভারতম (Vande Bharatam) |
|---|---|
| উদ্যোক্তা সংস্থা | আদানি গ্রুপ (Gautam Adani Initiative) |
| আবেদনের পরিধি | ভারতের ৩৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (৮০০+ জেলা) |
| অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র | কৃষি, প্রযুক্তি, ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম, পরিবেশবান্ধব ও সামাজিক সমাধান |
| প্রধান লক্ষ্য | গ্রামীণ যুবসমাজ, নারী উদ্যোক্তা, আদিবাসী গোষ্ঠী, দিব্যাঙ্গ ব্যক্তি |
| ফাইনালিস্ট নির্বাচন | মোট ৭৫ জন প্রতিযোগীকে আহমেদাবাদে মেন্টরশিপ দেওয়া হবে |
| আবেদন শুরুর তারিখ | ২৪ জুন, ২০২৬ থেকে অফিশিয়াল পোর্টালে আবেদন গ্রহণ শুরু |
ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে তৃণমূল স্তরের সুপ্ত মেধা বিকাশের সুযোগ এখনও অত্যন্ত সংকুচিত। বেসরকারি উদ্যোগের এই ধরনের দেশব্যাপী কর্মপন্থা যদি প্রত্যন্ত এলাকার নতুন ব্যবসায়ী ধারণাকে সরাসরি মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে তা দেশের স্বনির্ভরতার লক্ষ্যকে এক বিশাল গতি দেবে। আহমেদাবাদের মহামঞ্চে দেশের এই সেরা ৭৫ জন উদ্ভাবক আগামী দিনে ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন রূপকার হয়ে উঠতে পারেন কিনা, গোটা দেশ এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে।



Post Comment