গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে মেসিকে ছাপিয়ে গেলেন এমবাপে! ফাইনালে কি তৈরি হবে নতুন ইতিহাস?
Football
-Ritesh Ghosh
বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬-এর মঞ্চ এখন এক ঐতিহাসিক মহাকাব্যের শেষ অঙ্কে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ের লড়াই এমন এক রোমাঞ্চকর পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে চলেছে টুর্নামেন্টের একেবারে শেষ ম্যাচে। খেতাবের এই অবিশ্বাস্য ইঁদুর-দৌড়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছেন বর্তমান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই তারকা— ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি এবং ২৭ বছরের ফরাসি কিলিয়ান এমবাপে।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের অবিশ্বাস্য ৬-৪ ব্যবধানে (জয়ী ইংল্যান্ড) রোমাঞ্চকর জয়ের লড়াইয়ে জোড়া গোল করেছেন কিলিয়ান এমবাপে। এই দুই গোলের সুবাদে চলতি টুর্নামেন্টে তাঁর ব্যক্তিগত গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০-এ। এর ফলে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি লিওনেল মেসির চেয়ে এই মুহূর্তে পরিষ্কার ২ গোলে এগিয়ে গেলেন। তবে মেসির সামনে এখনও ফাইনালে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে এই ব্যবধান মুছে ফেলার একটি শেষ সুযোগ বাকি রয়েছে।

সোনার বুটের অঙ্কে মেসি বনাম এমবাপে
স্পেনের বিরুদ্ধে মেগা ফাইনালে আর্জেন্টিনা মাঠে নামলেই তৈরি হবে এক নতুন ইতিহাস। এই ম্যাচে লিওনেল মেসি যদি দুটি গোল করতে পারেন, তবে তিনি চলতি বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট নিজের নামে করে নিতে পারবেন। কারণ, গোল সংখ্যায় এমবাপেকে ছুঁয়ে ফেললেও বেশি অ্যাসিস্ট (সতীর্থদের দিয়ে গোল করানো) করার রেকর্ডে অনেক এগিয়ে রয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। টাই ভাঙার বিশেষ নিয়মে যা মেসিকে এনে দেবে পরম কাঙ্ক্ষিত সোনার বুট।
মেসি যদি এই ফাইনালে জোড়া গোল করতে না পারেন, তবে কিলিয়ান এমবাপে ফুটবল ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে পরপর দুবার গোল্ডেন বুট জয়ের এক অনন্য ও নজিরবিহীন কীর্তি গড়বেন। এর আগে কাতার বিশ্বকাপেও তিনি গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। বর্তমান ফুটবলে কিলিয়ান এমবাপের এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে কিংবদন্তিদের সমকক্ষে নিয়ে এসেছে, যা নিঃসন্দেহে ফরাসি ফুটবলের অন্যতম সেরা ট্রফি জয়ের আনন্দকে বাড়িয়ে দেবে।
কেবল চলতি আসরের গোল্ডেন বুটই নয়, এই দুই ফুটবল জাদুকরের মধ্যে এখন চলছে বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা গোলদাতার সিংহাসন দখলের এক দীর্ঘমেয়াদী লড়াইও। বর্তমানে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় ২২টি গোল নিয়ে এককভাবে শীর্ষে রয়েছেন এমবাপে। তাঁর ঠিক পেছনেই ২১টি গোল নিয়ে তাড়া করছেন লিওনেল মেসি। ফাইনাল ম্যাচের একটি গোল এই তালিকার পুরো সমীকরণ চিরতরে বদলে দিতে পারে।
ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরের লড়াই
চলতি বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপের ১০টি গোল করার কৃতিত্ব আধুনিক ফুটবলের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত বিরল। একবিংশ শতাব্দীতে অনুষ্ঠিত কোনও একটি বিশ্বকাপে এককভাবে ১০ বা তার বেশি গোল করার রেকর্ড আর কোনও ফুটবলারের নেই। এর আগে ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার গার্ড মুলার একক টুর্নামেন্টে ১০ গোল করার মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন। তারপর দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে এমবাপেই প্রথম এই গৌরব অর্জন করলেন।
ফুটবল বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে কোনও একক আসরে আট বা তার বেশি গোল করা সবসময়ই একটি কঠিনতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই টুর্নামেন্টের আগে বিশ্ব ফুটবলে মাত্র আটজন খেলোয়াড় এই অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করতে পেরেছিলেন, যার মধ্যে রয়েছেন গার্ড মুলার, জো ফন্টেইন, স্যান্ডর কোকসিস, আদেমির, ইউসেবিও, গুইলার্মো স্ট্যাবিল, ব্রাজিলের রোনাল্ডো নাজারিও এবং স্বয়ং এমবাপে। ২০২৬ আসরটি সত্যিই বিশ্ব ফুটবলের তারকাদের মহোৎসব।
এবারের আসরে শুধুমাত্র মেসি বা এমবাপেই নন, অন্যান্য তরুণ এবং অভিজ্ঞ ফুটবলাররাও নিজেদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দিয়েছেন। ইংল্যান্ডের তুরুপের তাস জুড বেলিংহাম ফ্রান্সের বিরুদ্ধে গোল করে গোল্ডেন বুটের তালিকায় সাতটি গোল নিয়ে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন। কোনও একক বিশ্বকাপে একজন ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এটিই সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। গোল সংখ্যা সমান হলেও বেশি অ্যাসিস্টের বিচারে বেলিংহাম পেছনে ফেলে দিয়েছেন নরওয়ের তরুণ স্ট্রাইকার আর্লিং হাল্যান্ডকে।
ফাইনালে বিশ্বরেকর্ডের হাতছানি
বেলিংহাম ও হাল্যান্ডের ঠিক পেছনেই ছয়টি করে গোল নিয়ে এই তালিকায় চমৎকার অবস্থানে রয়েছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেন এবং ফ্রান্সের নির্ভরযোগ্য উইঙ্গার ওসমানে ডেম্বেলে। তবে সমস্ত ফুটবল অনুরাগীদের চোখের আলো এখন কেড়ে নিয়েছে ফাইনাল ম্যাচের সেই মহাসমীকরণ। ফুটবল বিশ্লেষকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন দেখার জন্য যে, আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে মেসি কি পারবেন স্পেনের ডিফেন্স ভেঙে ইতিহাস গড়তে, নাকি এমবাপেই বিশ্ব ফুটবলে নিজের আধিপত্য বজায় রাখবেন।
আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়া স্পেনের বিরুদ্ধে ফাইনাল ম্যাচটি কেবল একটি ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, এটি লিওনেল মেসির কেরিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক রূপকথা রচনার সর্বশেষ মঞ্চ। ৩৯ বছর বয়সেও মেসির এই অবিশ্বাস্য খেলার গতি ও ফুটবল শৈলী তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগায়। অন্যদিকে, মাত্র ২৭ বছর বয়সেই এমবাপে যেভাবে একের পর এক রেকর্ড নিজের করে নিচ্ছেন, তাতে স্পষ্ট যে আগামী এক দশক তিনি বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চ শাসন করতে চলেছেন।
ফুটবলের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির মুখোমুখি খুব কম ম্যাচই দাঁড়িয়েছে। একদিকে রয়েছে মেসির ফুটবল জীবনের শেষ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরার লড়াই, অন্যদিকে এমবাপের রাজকীয় ক্ষমতা ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। ফাইনালে রেফারি বাঁশি বাজানোর আগে পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনও ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। তবে একথা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় যে, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী আরও একটি মহাকাব্যিক রাতের সাক্ষী হতে চলেছেন।


Post Comment