সোনম ওয়াংচুককে অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়েছে! আদালতের দ্বারস্থ স্ত্রী গীতাঞ্জলি
India
-Ritesh Ghosh
সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থা এবং তাঁর চিকিৎসা নিয়ে বিতর্ক এবার আদালতের দরজায় পৌঁছল। সফদরজং হাসপাতাল থেকে ওয়াংচুককে অবিলম্বে কোনও বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার নির্দেশ চেয়ে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো। সরকারি এই হাসপাতালের চিকিৎসার গুণমান এবং উদ্দেশ্য নিয়ে তীব্র অনাস্থা প্রকাশ করেছেন তিনি।
দিল্লি হাইকোর্টে দায়ের করা জরুরি আবেদনে দাবি করা হয়েছে, সোনম ওয়াংচুককে চিকিৎসার নামে অবৈধ এবং অসাংবিধানিক উপায়ে আটকে রাখা হয়েছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে দীর্ঘ ২১ দিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে অনশন করার পর প্রশাসন তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যায়। আবেদনকারীর দাবি, সরকার পরিচালিত এই হাসপাতালেই ওয়াংচুককে প্রায় বন্দি দশা কাটাতে হচ্ছে, যা তাঁর মানবাধিকারের পরিপন্থী।

গীতাঞ্জলি আংমো তাঁর রিট পিটিশনে সোনম ওয়াংচুকের অবিলম্বে মুক্তি অথবা অন্ততপক্ষে তাঁর পরিবারের পছন্দের কোনও বেসরকারি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দাবি করেছেন। পিটিশনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকারি নজরদারিতে থাকা অবস্থায় ওয়াংচুককে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে, যা তাঁর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পটাশিয়ামের মাত্রা এবং মেডিক্যাল রিপোর্টে অসঙ্গতি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি দীর্ঘ পোস্টে গীতাঞ্জলি আংমো সফদরজং হাসপাতালের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, হাসপাতালের পক্ষ থেকে প্রথমে ওয়াংচুকের পরিবারকে জানানো হয়েছিল যে তাঁর শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে ২.৯-এ নেমে এসেছে। চিকিৎসকেরা এটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং প্রাণঘাতী পরিস্থিতি বলে বর্ণনা করেছিলেন।
অথচ কিছু সময় বাদেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জারি করা জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বুলেটিনে নির্দিষ্ট কোনও সংখ্যার উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে শুধু বলা হয়েছে যে ওয়াংচুকের রক্তের পটাশিয়াম কমছে। এই অমিল এবং তথ্যের অস্পষ্টতা পরিবারের মনে গভীর সন্দেহের জন্ম দেয়। হাসপাতালের এমন রহস্যজনক আচরণ দেখেই তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর দীর্ঘ ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে টানা অনুরোধ এবং চেষ্টার পর অবশেষে রাত সাড়ে দশটা নাগাদ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা রক্তের নমুনা নেওয়ার অনুমতি দেন। পরিবার সেই রক্তের নমুনা একটি স্বাধীন ও স্বনামধন্য বেসরকারি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠায়। সেই বিশ্বস্ত বেসরকারি ল্যাবরেটরির রিপোর্টে দেখা যায়, সোনম ওয়াংচুকের পটাশিয়ামের স্তর আসলে ৩.৫, যা চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী একদম স্বাভাবিক বা বিপন্মুক্ত।
মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন ও প্রশাসনের কড়া নজরদারি
আদালতে দায়ের করা আর্জিতে ওয়াংচুকের মৌলিক অধিকার খর্ব হওয়ার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। অনশনকারীর আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন যে, ভারতীয় সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ (বাক স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার) এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) বর্তমান পরিস্থিতির কারণে মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। চিকিৎসার নামে কার্যত তাঁর প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
পারিবারিক স্তরে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, হাসপাতালে সোনম ওয়াংচুককে কার্যত পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন বা আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। দীর্ঘ ২০ দিন ধরে যে পারিবারিক চিকিৎসকেরা তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে আসছিলেন, তাঁদের কাউকেই সফদরজং হাসপাতালের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকী তাঁর আইনি পরামর্শদাতার সঙ্গেও তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া হাসপাতালের ওয়ার্ডের ভেতর ও বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী। গীতাঞ্জলির দাবি অনুযায়ী, যে ফ্লোরে সোনম চিকিৎসাধীন আছেন, সেখানে সর্বক্ষণ প্রায় ৩০ জন পুলিশকর্মী পাহারা দিচ্ছেন। পুরো হাসপাতাল চত্বরে মোতায়েন করা হয়েছে একশোরও বেশি পুলিশকর্মী। এই নজিরবিহীন নিরাপত্তার কারণে পরিবারের সদস্যদের গতিবিধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং এক প্রকার ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দমনপীড়নের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও। বিরোধীদের অভিযোগ, গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদের পথ রুখে দিতেই অসুস্থতার নামে এই সমাজকর্মীকে গৃহবন্দি করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদিও তাদের অনড় অবস্থানে রয়েছে এবং দাবি করেছে যে, এতদিনের অনশনের পর ওয়াংচুকের শরীর চরম দুর্বল হয়ে পড়ায় তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
হাসপাতালের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, ডিহাইড্রেশন বা শরীরে জলশূন্যতা কাটাতে সোনম ওয়াংচুককে চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট রুটিন মেনে দেখভাল করছেন এবং বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তবে ওয়াংচুকের পরিবার মনে করে, যদি দ্রুত তাঁকে এই পরিবেশ থেকে বের করে কোনও বেসরকারি মেডিক্যাল সেন্টারে স্থানান্তরিত না করা হয়, তবে তাঁর স্বাস্থ্যের বড় ধরনের কোনও ক্ষতি হতে পারে, যার দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে।
আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সোনম ওয়াংচুককে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের এই চেষ্টা এখন আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এই বিশিষ্ট পরিবেশকর্মীর শারীরিক নিরাপত্তা এবং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষ এবং তাঁর অনুগামীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এখন দিল্লি হাইকোর্ট এই জরুরি আবেদনের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সবপক্ষ।


Post Comment