Madan Mitra: ‘শুভেন্দু আর অভিষেক আলাদা করে আমাকে একটাই প্রশ্ন করেছিল…’ কোন গোপন কথা এতদিন পর স্বীকার করলেন মদন মিত্র?
Last Updated:
মদন মিত্রের কথায়, ‘আপনাদের নেত্রী, একদিন আমার নেত্রী ছিলেন। এই পরিস্থিতিটাই কোনওদিন হত না যদি না মমতা ‘তৃণমূলে যুবা’ তৈরি করতেন৷
কলকাতা: প্রশ্ন ছিল একটাই৷ ‘কেন আপনি যুব তৃণমূল ছাড়লেন?’ উত্তরদাতাও একজন, মদন মিত্র৷ কিন্তু প্রশ্ন করেছিলেন দুই ভিন্ন ব্যক্তি৷ একজন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, অন্যজন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়৷ এই একটা প্রশ্ন ঘিরে দু’জনের রাজনৈতিক অঙ্কের দুই ভিন্ন ‘অ্যাঙ্গেল’ সামনে আনলেন কামারহাটির বর্তমান বিধায়ক৷
১৯৯৮-এ তৈরি হল তৃণমূল৷ দলের আত্মপ্রকাশের পর ধীরে ধীরে তৈরি হল শাখা৷ যুব কংগ্রেসের দায়িত্ব গেল মদনের কাছেই৷ মমতার প্রায় একই চৌহদ্দির মধ্যে বেড়ে ওঠা এবং ছাত্র জীবন থেকে রাজনীতি করা মদন ছিলেন মমতার অন্যতম সহচর৷ প্রথম থেকেই মমতার আস্থাভাজন ছিলেন তিনি৷ একুশের সভার প্রস্তুতি, লোক জোগাড়, সভা ভরানো- সবেতেই মদনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম৷ এই মদনকেই মমতা দিয়েছিলেন যুবর দায়িত্ব৷ নাগাড়ে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন মদন৷ এরপর সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্ব৷ পূর্ব মেদিনীপুরে ততদিনে উদয় হয়েছে শিশির অধিকারীর পুত্র শুভেন্দু অধিকারীর৷
কংগ্রেসী রাজনীতিতে শিশির অধিকারী অত্যন্ত পরিচিত নাম হলেও, শিশিরের মেজো ছেলেকে বাংলা রাজনীতি চিনল সেই তখন থেকেই৷ নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় স্তরের নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেলেন শুভেন্দু৷ ২০০৮ এর পঞ্চায়েতে প্রথমবারের জন্য তৃণমূলের হাতে এল পূর্ব মেদিনীপুর৷ সেই পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা পরিষদ জয়ের পিছনে শুভেন্দুর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য৷ তার এক বছরের মধ্যেই ২০০৯ এর লোকসভা নির্বাচন৷ সিপিএমের গড় বলে পরিচিত তমলুকে লক্ষ্ণণ শেঠকে সমানে সমানে টক্কর দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনেন শুভেন্দু৷ আর এসবের স্বীকৃতি স্বরূপ মদনের হাত থেকে যুব তৃণমূলের ব্যাটন চলে যায় শিশির-পুত্রের হাতে৷ রাজ্য জুড়ে শুভেন্দুর প্রসার৷ তারপরেই আচমকা অভিষেকের অভ্যুত্থান৷ ডায়মন্ড হারবারে জিতলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যয়৷ বসলেন যুবার শীর্ষে৷ রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন ছিল, একটি দলের দু’টি যুব সংগঠন কেন? তখনই অভিষেককে নিয়ে এসে কি শুভেন্দুর প্রভাব কমাতে চেয়েছিলেন মমতা? ২০১৬ তে শুভেন্দু অধিকারী মন্ত্রী হন৷ পরে তাঁকে দেওয়া হয় জেলার পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব৷ এদিকে ততদিনে অভিষেক ‘যুবা’ থেকে ‘যুব’র প্রধান৷ তার উঠেও গেল এই ‘যুবা’৷ ওয়াকিবহল মহলের প্রশ্ন তাহলে কি অভিষেককে লঞ্চ করার জন্যই ‘যুবা’কে আনা হয়েছিল?
ভারতের রাজনীতিতে, বিশেষ করে তৃণমূলীয় রাজনীতিতে যুব তৃণমূল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করত একসময়। রাজ্যের একটি বিশাল অংশ ছিল তরুণ ভোটার। নতুন প্রজন্মের মন জয় করতে যুব তৃণমূলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় কর্মসূচি, প্রতিবাদ মিছিলে যুব তৃণমূলের কর্মীরা মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে এসেছেন। রাজনীতির কারবারিদের মতে, এই যুব সংগঠনের শীর্ষে থাকলেই বাংলার বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছনো যায়৷ দলের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড গড়ে তোলার আঁতুড়ঘর হলো এই যুব সংগঠন। ফলে যুব সংগঠনের গুরুত্বের কথা আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না৷
মদন মিত্রের কথায়, ‘আপনাদের নেত্রী, একদিন আমার নেত্রী ছিলেন। এই পরিস্থিতিটাই কোনওদিন হত না যদি না মমতা ‘তৃণমূলে যুবা’ তৈরি করতেন৷ আমি ৬ বছর তৃণমূল যুবকংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলাম৷ এরপর শুভেন্দু অধিকারী সেই জায়গায় গেলেন৷ কিন্তু তারপরেই মমতা ‘যুবা’ তৈরি করে শুভেন্দুর সমান্তরাল কমিটি গঠন করে জানিয়ে দিলেন তিনি ‘যুবা’-কে সমর্থন করেন, ‘যুব’কে নয়৷ অর্থাৎ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে নিজের ভাইপোকে বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে আসল দাবিদার শুভেন্দুকে বঞ্চিত করেছেন, সে কথাই বলতে চেয়েছেন৷ এই পদে শুভেন্দু অধিকারীকে যোগ্য বলে মনে করেছেন মদন৷ কামারহাটির বিধায়কের কথায় সেদিন অভিষেকের প্রশ্ন ছিল, ‘কেন আপনি যুব তৃণমূল ছাড়লেন? তা না হলে তো শুভেন্দু আসতেন না৷’ যদি মদন মিত্রের ফেসবুক লাইভে বলা কথা সত্যি হয় তাহলে এই কথা থেকে পরিষ্কার যে শুভেন্দুর সংগঠনের ওপর রাজনৈতিক আধিপত্যই, অভিষেকের একথা বলার কারণ৷
রাজ্যে পালাবদল হয়েছে৷ সেদিনের সেই তৃণমূুল সরকার আর নেই৷ বঙ্গ রাজনীতিতে মমতার দিন শেষ হয়েছে৷ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে দলের সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন, সেই দল নেই, দলের প্রতীকও নেই৷ তবু আজও রাজনীতির চর্চায় সেদিনের সেই অঙ্ক৷ যার সূত্র ধরে মদন মিত্র দাবি করলেন, মমতার আজকের পরিণতির জন্য দায়ী মমতা নিজেই৷

Post Comment