গৌতম আদানির ৬৪তম জন্মদিনে ইতিহাস গড়ল আদানি ফাউন্ডেশন! রক্তদান অভিযানে মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ
India
-Ritesh Ghosh
আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানির ৬৪তম জন্মদিন উপলক্ষে দেশজুড়ে এক ঐতিহাসিক রক্তদান শিবিরের আয়োজন করেছিল আদানি ফাউন্ডেশন। বুধবার, ২৪ জুন, আয়োজিত সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক এই মহা অভিযানে রেকর্ড গড়ে মোট ৫২,৩০৬ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। ভারতের অন্যতম বৃহত্তম স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান কর্মসূচির মর্যাদা পাওয়া এই উদ্যোগটি দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থায় এক অভাবনীয় ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তারা।
এই বিশাল কার্যক্রমটি ভারতের ২১টি রাজ্য, ৫টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রসহ মোট ৭৫৪টি স্থানে একযোগে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়। সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ রক্ত প্রায় ১ লক্ষ ৫৬ হাজারেরও বেশি মুমূর্ষু রোগীর জরুরি চিকিৎসায় ব্যবহার করা হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে শুরু করে বড় শহরের হাসপাতালগুলিতেও এই সংগৃহীত রক্ত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বছরের পর বছর ধরে এই রক্তদান অভিযানের পরিধি ও কার্যকারিতা ব্যাপক স্তরে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১১ সালে যখন প্রথমবার এই বার্ষিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু করা হয়, তখন মাত্র ১,৩০০ ইউনিট রক্ত সংগৃহীত হয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ দেড় দশকের পথচলায় সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তা আজ মহীরুহের আকার ধারণ করেছে। গত বছরের ২৮,০৯০ ইউনিটের রেকর্ড ভেঙে এবার প্রায় দ্বিগুণ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
‘সেবাই সাধনা’ এই মূল মন্ত্রকে সামনে রেখে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমে শুধু আদানি গোষ্ঠীর কর্মীরাই নন, বরং সাধারণ মানুষও অংশ নেন। প্রতিটি শিবিরেই ছিল চোখে পড়ার মতো উৎসাহ। সম্পূর্ণ পরিকাঠামো সামলাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৬,০০০-এরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক নিরলস পরিশ্রম করেছেন। এদের মধ্যে চিকিৎসক, নার্স, দক্ষ প্যারামেডিক্যাল কর্মী এবং আদানি গোষ্ঠীর বিভিন্ন ব্যবসায়িক শাখার কর্মীরা সরাসরি মাঠপর্যায়ে কর্মরত ছিলেন।
সংগৃহীত রক্তের গুণমান রক্ষা এবং যথাযথ ব্যবহারের জন্য দেশের মোট ৭৬৪টি রক্ত সংরক্ষণাগারের সঙ্গে পার্টনারশিপ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ভারতীয় রেড ক্রস সোসাইটি, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল এবং দাতব্য ট্রাস্ট পরিচালিত ব্লাড ব্যাঙ্কগুলি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সংগৃহীত রক্ত থেকে প্লাজমা, প্লেটলেট, প্যাকড রেড ব্লাড সেল এবং ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা আলাদা করে জরুরি অস্ত্রোপচার, ক্যানসার চিকিৎসা এবং প্রসূতিদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হবে।
যেকোনও বড় ধরনের অস্ত্রোপচার কিংবা ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের কেমোথেরাপির সময় রক্তের উপাদানগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। আদানি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, সংগৃহীত রক্তের প্রতিটি বিন্দু যাতে অপচয় না হয়, তার জন্য সম্পূর্ণ আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক কোল্ড চেন মেনে তা পরিবহণ করা হয়েছে। সংগৃহীত এই রক্ত উপাদান পৃথকীকরণের মাধ্যমে একই সঙ্গে একাধিক রোগীর শরীরে ব্যবহার করা সম্ভব হবে, যা একই সঙ্গে প্লাজমা বা ডব্লিউবিসি-র ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করবে।
এই ঐতিহাসিক রক্তদান শিবিরের বিশাল আয়োজন এবং তার ফলাফল সহজে বোঝার জন্য মূল পরিসংখ্যানগুলি নিচে একটি কাঠামোগত টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হল, যা এই অভিযানের সামগ্রিক সফলতার রূপরেখাকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সংক্ষেপে সকলের সামনে তুলে ধরে।
| বিষয় | পরিসংখ্যান ও বিবরণ |
|---|---|
| মোট সংগৃহীত রক্ত | ৫২,৩০৬ ইউনিট (প্রায় ২৩,৫৩৮ লিটার) |
| কার্যক্রমের স্থান | ২১টি রাজ্য, ৫টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, ৪টি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র |
| অংশগ্রহণকারী স্থান ও ব্লাড ব্যাঙ্ক | ৭৫৪টি স্থান এবং ৭৬৪টি ব্লাড ব্যাঙ্ক |
| স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা | ৬,০০০ জনের বেশি পেশাদার ও সাধারণ কর্মী |
| উপকৃত রোগীর সম্ভাব্য সংখ্যা | ১.৫৬ লক্ষের বেশি চিকিৎসাধীন রোগী |
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সফল সমাপ্তির পর আদানি ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন ডঃ প্রীতি আদানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের গভীর ভালোলাগা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, গৌতম আদানির আদর্শ ‘সেবাই সাধনা’-কে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে সমগ্র আদানি পরিবার। এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সমস্ত কর্মী এবং চিকিৎসা পেশাদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের এই নিঃস্বার্থ মহৎ কাজ হাজার হাজার পীড়িত মানুষকে এবং তাঁদের পরিবারকে নতুন বাঁচার আশা ও শক্তি জোগাবে।
মূলত ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, জীবিকা উন্নয়ন এবং গ্রামীণ উন্নয়নের প্রসারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে আদানি ফাউন্ডেশন। বর্তমানে ২২টি রাজ্যের ৭,২০০টিরও বেশি গ্রাম ও শহুরে বস্তি এলাকায় এই সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত। এই ধরনের বৃহৎ আকারের রক্তদান কর্মসূচি কেবল রক্তের সংকট পূরণেই সহায়তা করে না, বরং দেশের যুবসমাজের মধ্যে নিয়মিত রক্তদানের সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে রক্তের ঘাটতি মেটাতে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের নিয়মিত রক্ত বদলানো, আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জটিল অপারেশনের ক্ষেত্রে এই সংরক্ষিত রক্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই বিপুল কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও সম্মিলিত প্রয়াসের সমন্বয় ঘটলে যেকোনো বড় লক্ষ্য সহজেই অর্জন করা সম্ভব.
এই শিবিরের একটি বড় অংশ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে তা স্থানীয় স্তরে সচেতনতা বাড়াতে দারুণভাবে সাহায্য করেছে। চিকিৎসকদের মতে, কেবল বড় শহরের আধুনিক হাসপাতালেই নয়, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও রক্তের ঘাটতি একটি মারাত্মক সমস্যা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে রক্তদানে উৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে আদানি ফাউন্ডেশন গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় এক ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।
আদানি ফাউন্ডেশনের এই কর্মসূচিটি কেবল মাত্র একটি গোষ্ঠীর উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি দেশের লক্ষাধিক সাধারণ মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করার এক অনন্য সামাজিক অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে। এই কার্যক্রমটি দেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় তাৎক্ষণিক স্বস্তি প্রদানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রেও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। চিকিৎসাধীন অসংখ্য পরিবার আগামী দিনে এর মাধ্যমে সুস্থ জীবনের নতুন দিশা খুঁজে পাবে।



Post Comment