বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে বিশেষ মর্যাদা কেন্দ্রের, নজরে দু’দেশের সসম্পর্ক পুনঃস্থাপন

বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে বিশেষ মর্যাদা কেন্দ্রের, নজরে দু’দেশের সসম্পর্ক পুনঃস্থাপন

International

-Ritesh Ghosh

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে তুলতে এবং কূটনৈতিক বন্ধন নতুন করে জোরালো করতে বড় পদক্ষেপ নিল নয়াদিল্লি। এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে কাজ শুরু করেছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদী। ভারত সরকার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমমর্যাদা দিল। বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ শাহাবুদ্দিনের কাছে তাঁর পরিচয়পত্র পেশ করার মাধ্যমে ত্রিবেদী আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের পক্ষে এই নতুন দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন।

নতুন কর্মস্থলে নিজের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দুই দেশের সীমান্ত পারের যোগাযোগ ও মানবিক সম্পর্কের বরফ গলাতে একটি অত্যন্ত বড় ঘোষণা করেছেন দীনেশ ত্রিবেদী। বিগত প্রায় দুই বছর নানা সমস্যার কারণে বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য দীর্ঘপ্রতীক্ষিত সাধারণ ভ্রমণ বা ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নবনিযুক্ত হাইকমিশনার জানিয়েছেন, আগামী ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশি সাধারণ নাগরিকরা ভারতের ভিসা পাওয়ার জন্য নতুন করে আবেদনপত্র জমা দিতে পারবেন। ভারতের এই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত উভয় দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা অনেকটাই মেটাবে।

Indian High Commissioner Dinesh Trivedi announces tourist visa resumption

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বুধবার একটি বিশেষ নির্দেশিকা জারি করে দীনেশ ত্রিবেদীকে এই ক্যাবিনেট মন্ত্রীর সমমর্যাদা প্রদান করার কথা ঘোষণা করেছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স বা দেশের রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার তালিকায় ত্রিবেদীকে ব্যক্তিগত স্তরে এই বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তবে এই মর্যাদা মূলত কূটনৈতিক ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেই বহাল থাকবে। এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে হাইকমিশনার করে পাঠানো এবং তাঁকে ক্যাবিনেট পদমর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি দিল্লির বিশেষ গুরুত্বকেই স্থাপন করে।

২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে অধ্যাপক মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এরপর থেকেই ঢাকা ও নয়াদিল্লির পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। ভারতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা উদ্বেগ এবং বাংলাদেশে দ্রুত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হওয়ার কারণে দুই দেশের দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্কের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হতে দেখা যায়। দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকার রাষ্ট্রদূত করে পাঠানোর সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট যে, নয়াদিল্লি এখন সম্পর্কের দ্রুত স্বাভাবিক করাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ ইতিমধ্যে সেদেশে তারেক রহমানের বিনএনপির সরকার গঠিত হয়েছে।

সাধারণত বিদেশে ভারতের যেকোনো রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারের দায়িত্ব পেশাদার বিদেশ নীতি বিশেষজ্ঞদের ওপরেই ন্যস্ত করা হয়ে থাকে। দীনেশ ত্রিবেদীর আগে বাংলাদেশে সফলভাবে এই পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন ১৯৯৪ ব্যাচের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ভারতীয় বিদেশ পরিষেবা তথা আইএফএস অফিসার প্রণয় কুমার বর্মা। তবে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে একজন পেশাদার আমলার বদলে একজন অভিজ্ঞ এবং রাজনৈতিকভাবে উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন ভারতীয় নেতাকে ঢাকা পাঠানোর এই সিদ্ধান্ত দিল্লির সরকারের অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারকেই স্পষ্ট করে তোলে।

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ভিসা পরিষেবা পুনরুদ্ধার অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা গ্রহণ করতে, উচ্চশিক্ষা ও বড় ব্যবসায়িক প্রয়োজনে অথবা স্রেফ বেড়ানোর উদ্দেশে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যাতায়াত করেন। কিন্তু বিগত দিনের বৈরী পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় ভ্রমণ ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল। এর ফলে উভয় দেশের মধ্যে এক ধরনের বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, যা সীমান্ত বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁর আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র পেশ করার প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে শেষ করার পরপরই দীনেশ ত্রিবেদী সরাসরি ঢাকার ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে পৌঁছান। সেখান থেকেই তিনি সাধারণ ট্যুরিস্ট ভিসা পরিষেবা পুনরায় নিয়মিত উপায়ে সচল করার এই বহুল প্রতীক্ষিত ঘোষণাটি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করেন। তিনি উপস্থিত গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে বলেন, দুই দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ভারতের ভ্রমণ ভিসা আবার নতুন করে চালু করতে পেরে আমি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত আনন্দিত।

বহু কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হল, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবিশ্বাসের যে ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, তা মেটাতে ত্রিবেদীর এই কার্যভার গ্রহণ প্রথম বড় সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ক্যাবিনেট পদের গৌরবময় মর্যাদা দিয়ে একজন বড় স্তরের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঢাকায় পদায়ন করার মাধ্যমে ভারত সরকার প্রতিবেশীর গুরুত্বকে সবার উপরে স্থান দিয়েছে। দীনেশ ত্রিবেদীর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের প্রজ্ঞা ও পরিচিতি ঢাকা ও দিল্লির পারস্পরিক সহযোগিতা পুনরুদ্ধার করতে এক ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ভৌগোলিক নিরাপত্তা, শান্তি বজায় রাখা এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সুদৃঢ় রাখতে ঢাকা এবং দিল্লির বন্ধুত্বপূর্ণ সমীকরণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীনেশ ত্রিবেদীর হাইকমিশনার পদে সরাসরি নিযুক্তি এবং ভিসা প্রদানের সদর্থক সিদ্ধান্ত দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে আবারও এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী দিনে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ ও দীর্ঘস্থায়ী মৈত্রী রক্ষা করতে নতুন হাইকমিশনারের কূটনৈতিক প্রয়াস ও ব্যক্তিগত সংযোগ কতটা সফল প্রভাব ফেলে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মহল এখন সেদিকেই গভীর আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য রাখছে।

Post Comment

You May Have Missed