নিজেদের কেন্দ্রেই ধরাশায়ী দুই মুখ্যমন্ত্রী, জিতেও ক্ষমতাচ্যুত অপরজন; নেপথ্যে এই ফ্যাক্টরগুলি ?
কলকাতা : নিজেদের বিধানসভা কেন্দ্রেই ধরাশায়ী দুই মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গের ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তামিলনাড়ুর কোলাথুরে DMK-র এম. কে. স্ট্যালিন। তবে, LDF না জিতলেও, আগের থেকে খুব খারাপ মার্জিন রেখে জয় নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছেন পিনারাই বিজয়ন। কেরলের ধর্মদাম কেন্দ্রে। কিন্তু, কী কারণে এই তিন রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি থেকে সরতে হল তাঁদের ? নেপথ্যে কোন কোন কারণ বড় হয়ে দাঁড়াল ? এনিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু।
কেন ক্ষমতাচ্যুত মমতা ?
পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া ঝড়ে কার্যত খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে তৃণমূল । ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। ঘরের মাঠ ভবানীপুরে হারলেন মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০ রাউন্ড গণনা শেষে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে পরাস্ত হয়েছেন তিনি। শুভেন্দুর প্রাপ্ত ভোট ৭৩ হাজার ৯১৭ ভোট। অন্য়দিকে, মমতার ঝুলিতে গেছে ৫৮ হাজার ৮১২টি ভোট। শুধু তাই নয়, তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেসও খুব শোচনীয় ফল করেছে রাজ্যজুড়ে। ১০০-র বহু আগে থামতে হয়েছে তাদের। কমিশনের ওয়েবসাইটে শেষ তথ্য অনুযায়ী (এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত) ৮০টি আসনে জিতেছে তৃণমূল এবং ১টিতে এগিয়ে। কিন্তু, মমতার এভাবে ক্ষমতা হারানোর কারণ কী ?
পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার ক্ষমতায় বিজেপি, পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে ?
রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল বলছে, মমতার শাসনকালে ভূরিভূরি দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সেইসব অভিযোগে জেল খেটেছেন তাঁর ক্যাবিনেটের সদস্য থেকে ওজনদার নেতারা। তালিকায় আছেন-পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, জীবনকৃষ্ণ সাহা, অনব্রত মণ্ডলের মতো মন্ত্রী-নেতারা। আর জি করের মতো ঘটনা ঘটেছে। সেই ঘটনায় মমতার পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে চরম ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবাদে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত রাস্তায় নেমেছে নাগরিক সমাজ। তারপরেও ঘটেছে কসবাকাণ্ড। রাজ্যজুড়ে একের পর এক ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠলেও মুখ্যমন্ত্রী শক্ত হাতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেননি বলে বারবার অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক অতীতে, রাজ্যজুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মামলা। যার জেরে হাজার হাজার যোগ্য শিক্ষক চাকরি খুইয়েছেন। তার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ছিলই। মাসের পর মাস মমতা সরকারের বিরুদ্ধে ডিএ ইস্যুতে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন সরকারি কর্মচারীদের একটা বড় অংশ। সেই সমস্যার সমাধান হয়নি। একাধিক সরকারি চাকরির পরীক্ষা ধারাবাহিকভাবে না হওয়া নিয়ে বারবার তৃণমূল সরকারকে বিদ্ধ করেছে বিরোধীরা। কর্মসংস্থান ইস্যুতে ক্রমাগত নিশানা শানিয়ে গিয়েছে বিরোধীরা। ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে হাতিয়ার করে বিজেপির হেভিওয়েট নেতারা বারবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে গেছেন। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ। রাজনৈতিক হিংসায় খুনোখুনি, বিরোধীদের হুমকি-হুঁশিয়ারির মতো রাজ্যজুড়ে ভূরিভূরি অভিযোগ তো আছেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, মমতা-সরকারের পতনের নেপথ্যে আছে আরও কারণ।
‘দ্য কেরল স্টোরি’
মার্জিন খুব খারাপ না হলেও, কোনওক্রমে মুখ রক্ষা হয়েছে ‘ক্যাপ্টেন কমরেড’ পিনারাই বিজয়নের। কেরলের ধর্মদাম কেন্দ্র থেকে ১৯২৪৭ ভোটে জিতলেও, প্রাথমিকভাবে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল তাঁকে। প্রথম ৬ রাউন্ডে তিনি বিরোধী UDF প্রার্থীর থেকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। সপ্তম রাউন্ড থেকে তাঁর ভাগ্য ঘুরতে শুরু করে। অর্থাৎ, বেশ কষ্টসাধ্য জয় এসেছে বিজয়নের। অথচ অতীতে এই কেন্দ্র থেকেই আরামশে ৫০ হাজার ভোটের বেশি ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন তিনি। কেরলে একমাত্র তিনিই পরপর দু’বার মুখ্যমন্ত্রী কুর্সিতে বসেছেন। ২০১৬ ও ২০২১-এর ভোটে জিতে টানা মুখ্যমন্ত্রী থেকেছেন তিনি। কিন্তু, আর প্রত্যাবর্তন সম্ভব হল না। কী কারণে ক্ষমতা থেকে সরতে হল তাঁকে ? প্রতি ৫ বছরে সরকার বদলে দেওয়ার যে রীতি কেরলে রয়েছে, ২০২১ সালে বিজয়ন পুনর্নির্বাচিত হয়ে সেই ‘মিথ’ ভেঙে দেন। তাঁর সময়কালে একাধিকবার সঙ্কটজনক পরিস্থিতিরও মুখোমুখি হতে হয়েছে সরকারকে। করোনা অতিমারী, ওয়েইনাডে ধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বিধ্বংসী বন্যার মতো সঙ্কটজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এইসব পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে গিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তাঁর প্রশাসনিক কার্যকলাপ নিয়েও সরব হয়েছেন বিরোধীরা। এর সঙ্গে তৈরি হয়েছিল তীব্র প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া।
তামিলনাড়ুতে চমক…
প্রথমবার ভোটে লড়েই তামিলনাড়ুতে DMK-কে পিছনে ফেলে চমকে দিয়েছে অভিনেতা বিজয়ের দল TVK. তামিলনাড়ুতে বিজয়ের দলের সঙ্গে রাহুল গান্ধীর সমঝোতা হয় কি না, তা নিয়ে চলছে জল্পনা। একাই একশো পার করে দিয়েছে TVK। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১০৮টি আসনে জয়লাভ করেছে বিজয়ের দল। অন্যদিকে, DMK পেয়েছে ৫৯টি আসন। ADMK-র ঝুলিতে গেছে ৪৭টি আসন এবং কংগ্রেস পেয়েছে ৫টি। কিন্তু, সিংহভাগ রাজ্যবাসী কেন চাইলেন না এম কে স্ট্যালিনকে ? এমনকী নিজের আসনেও পরাস্ত হয়েছেন তিনি। কোলাথুর আসনে TVK প্রার্থী ভি এস বাবুর কাছে ৮ হাজার ৭৯৫ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন স্ট্যালিন। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৭৪ হাজার ২০২। অধিকাংশ এক্সিট পোলেই DMK-র ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু, ফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এই পরাজয়ের পিছনে অন্যতম কারণ হয়ে গেছে ‘বিজয়-এফেক্ট।’ পুলিশের ভুল পদক্ষেপ, প্রশাসনিক টালবাহানা, এড়ানো যেত এমন অনেক বিতর্কের মুখে পড়া এবং বিভিন্ন অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণের অভাব। এর পাশাপাশি উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ। স্ট্যালিন নিজে বিলাসবহুল বিদেশ ভ্রমণ বা বর্ণাঢ্য ব্যক্তিগত জীবনের জন্য পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু , তাঁকে ঘিরে থাকা এবং কাছের অনেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। উদয়ানিধি স্ট্যালিনের করা সনাতন-ধর্ম সংক্রান্ত মন্তব্য জাতীয় বিতর্কের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল। এইসব কারণগুলি বিপক্ষে গেছে স্ট্যালিনের।



Post Comment