দিল্লির হাসপাতালে ভর্তি সোনম ওয়াংচুক! পুলিশ-প্রশাসনকে কড়া  হুঁশিয়ারি স্ত্রী গীতাঞ্জলির

India

-Ritesh Ghosh

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পড়ুয়াদের আত্মহত্যার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ঘটনার জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে চলমান আন্দোলন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। টানা ২১ দিন ধরে আমরণ অনশনে বসা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুককে যন্তর মন্তর থেকে সফদরজং হাসপাতালে স্থানান্তর করেছে দিল্লি পুলিশ। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাইরে দাঁড়িয়ে ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমো স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাঁর অনুমতি ছাড়া ওয়াংচুকের শরীরে কোনও ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে না।

অনশনের তিন সপ্তাহ পরেই দিল্লি পুলিশের এই অতিসক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সোনমের পরিবার ও সমর্থকরা। গীতাঞ্জলি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে একটি বিবৃতি দিয়ে তাঁর গভীর আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, আন্দোলনকে দুর্বল করতে প্রশাসন জোরাজুরি করছে। সোনম ওয়াংচুকের এই আন্দোলন দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে এবং পুলিশি পদক্ষেপের পর ছাত্র সমাজ আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।

Sonam Wangchuk hospitalized amidst ongoing Delhi protests

দিল্লির হাসপাতালে গীতাঞ্জলির অবস্থান ও কঠোর হুঁশিয়ারি

বর্তমানে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালেই রয়েছেন গীতাঞ্জলি। তিনি সরাসরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, স্বামীর শরীর নিয়ে কোনও রকম আপস করা হবে না। তাঁর কিংবা সোনমের পূর্ববর্তী চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদের সম্মতি ছাড়া যেন হাসপাতালে কোনও ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু না করা হয়। মুখে খাওয়ার কোনও ওষুধ বা ইনজেকশন দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের স্পষ্ট অনুমতি নেওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।

সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গীতাঞ্জলি বলেন, “আমি এই মুহূর্তে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে দাঁড়িয়ে বলছি, আমার স্বামীর শরীরে আমার অনুমতি ছাড়া কোনও রকম ওষুধ বা ইনজেকশন দেওয়া যাবে না। তাঁর চিকিৎসার বিষয়ে আমার এবং আমাদের ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের সঙ্গে প্রথমে কথা বলতে হবে। যদি আমার অমতে কোনও চিকিৎসা শুরু হয় এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে, তবে তার জন্য সরাসরি হাসপাতাল ও পুলিশ প্রশাসন দায়ী থাকবে।”

গীতাঞ্জলি আরও অভিযোগ করেছেন যে, শুক্রবার পর্যন্ত সোনমের শারীরিক পরিস্থিতি অত্যন্ত স্থিতিশীল ছিল এবং তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসার কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তিনি ভারতীয় সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে নিজের মৌলিক অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সোনমকে তাঁর সম্মতি ছাড়া জোর করে কোনও ওষুধ দেওয়া আইনত অপরাধ। পরিবারের ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ছাড়া তারা সিদ্ধান্ত মানবেন না।

দিল্লি পুলিশের ব্যাখ্যা ও আদালতের নির্দেশাবলী

অন্য দিকে, দিল্লি পুলিশ সোনম ওয়াংচুকের হাসপাতাল স্থানান্তরের পিছনে ভিন্ন আইনি কারণ খাড়া করেছে। পুলিশের দাবি, সোনম ওয়াংচুককে সফদরজং হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ তাঁর জীবন রক্ষার স্বার্থে এবং অতি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের তাগিদে। এই পদক্ষেপ দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশাবলী এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

নতুন দিল্লির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) শচীন শর্মা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মাননীয় হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ অনুসারে এবং সোনম ওয়াংচুকের দ্রুত অবনতিশীল স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা একান্ত প্রয়োজন ছিল। হাইকোর্টের এই নির্দেশ পালন করতে গিয়ে যখন পুলিশ অগ্রসর হয়, তখন বিক্ষোভকারীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি সামান্য উত্তপ্ত হলেও পুলিশ অত্যন্ত সংযম দেখিয়েছে এবং সোনমকে নিরাপদে স্থানান্তর করেছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে শান্তিপূর্ণভাবে স্থান খালি করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে পুলিশের এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশ সেখানে উপস্থিত পড়ুয়াদের লাঠিচার্জ এবং মারধর করেছে। যদিও পুলিশ কমিশনার শচীন শর্মা মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, পুলিশ অত্যন্ত ধৈর্য ধরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে।

আদালত অবমাননার মারাত্মক অভিযোগ ও বিক্ষোভকারীদের প্রতিক্রিয়া

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস দিল্লি পুলিশের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি একে সরাসরি আদালত অবমাননা বলে অভিহিত করেছেন। সৌরভের দাবি, দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজর রাখতে হবে এবং কেবল তখনই কোনও হস্তক্ষেপ বা চিকিৎসা করা যাবে যদি তাঁর স্বাস্থ্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে।

সৌরভ দাস বলেন, “আমাদের নিজস্ব চিকিৎসকদের একটি নির্ভরযোগ্য দল দিনে অন্তত দুই থেকে তিন বার সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখছিল। তিনি নিজেও নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও প্রকাশ করে নিজের সুস্থতার খবর দেশবাসীকে দিচ্ছিলেন। তাঁর স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল ছিল, তাই পুলিশি হস্তক্ষেপের কোনও কারণ ছিল না। পুলিশ হাইকোর্টের নির্দেশের ভুল ব্যাখ্যা করে তাঁকে জোরপূর্বক আটকে রেখেছে।”

বিক্ষোভের নতুন তরঙ্গ ও চলো সংসদ অভিযান ২০ জুলাই

সোনম ওয়াংচুককে বলপূর্বক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন আন্দোলনকারীরা। শুক্রবার রাতে ওয়াংচুকের ওপর হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ তুলেছেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। এর প্রতিবাদে তিনি নিজে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। দিপকে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, সোনম ওয়াংচুককে অন্যায়ভাবে আটকের বিরুদ্ধে তাঁদের এই আন্দোলন আমরণ চলবে।

একই সঙ্গে সিজেপির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, সোনম ওয়াংচুককে আটকে রেখে ছাত্র ও যুব সমাজের গণ-আন্দোলনকে দমানো যাবে না। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী আগামী ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে ‘চলো সংসদ’ পদযাত্রা বা সংসদ অভিযান কর্মসূচি যথানিয়মে পরিচালিত হবে। এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ ও পড়ুয়াদের কাছে ইতিপূর্বেই আবেদন জানিয়েছিলেন সোনম ওয়াংচুক নিজে।

আপাতত সোনম ওয়াংচুককে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে চিকিৎসকদের কড়া পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতাল চত্বরে তাঁর পরিবারের কড়া নজরদারি এবং যন্তর মন্তরের তীব্র যুব আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি থমথমে। শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা সংক্রান্ত দাবি এবং ২০ জুলাইয়ের সংসদ পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে আগামী দিনে লড়াইয়ের ময়দান কোন দিকে ঘোরে, এখন সেটাই দেখার।

Previous post

সোনম ওয়াংচুকের পর এবার আমরণ অনশনে সিজেপি প্রধান দিপকে, এবার পদত্যাগ দাবি প্রধানমন্ত্রীর

Next post

সফলভাবে মহাকাশে পাড়ি দিল ভারতের প্রথম বেসরকারি রকেট ‘বিক্রম-১’, মহাকাশ গবেষণায় আরও এক সাফল্য ভারতের

Post Comment

You May Have Missed