সিজেপি-র অভিজিৎ দিপকেকে চড়, নিট প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে উত্তাল প্রতিবাদে নিশানায় সরকার
India
-Ritesh Ghosh
রাজস্থানের রাজধানী জয়পুরের শহিদ স্মারকে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিশাল ছাত্র সমাবেশে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিল। বিক্ষোভ প্রদর্শন চলাকালে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রধান অভিজিৎ দিপকে একদল অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির হাতে হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারী যুবকদের ওপর এই অনভিপ্রেত হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজস্থানের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, ঘটনার সময় শহিদ স্মারক চত্বরে ব্যাপক সংখ্যায় যুবক ও চাকরিপ্রার্থীরা সমবেত হয়েছিলেন। সমাবেশস্থলে পৌঁছনোর সাথে সাথেই দলীয় কর্মী ও সমর্থকেরা অভিজিৎ দিপকেকে কাঁধে তুলে নিয়ে স্লোগান দিতে শুরু করেন। ঠিক তখনই আচমকা ভিড়ের বুক চিরে কয়েকজন দুষ্কৃতী তাঁর ওপর চড়াও হয় এবং তাঁকে সজোরে চড় মারে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অপ্রত্যাশিত হামলার জেরে কিছুক্ষণের জন্য সমাবেশ চত্বরে হুড়োহুড়ি ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার পরেও নিজের প্রতিবাদী মনোভাব থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হঠেননি যুবনেতা অভিজিৎ। জনসভায় দেওয়া তাঁর আবেগপূর্ণ ভাষণে তিনি স্পষ্ট ভাষায় অহিংসার বার্তা দেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ঢোকার মুখেই তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়েছিল এবং মারধর করা হয়েছিল। তবে প্রতিপক্ষের উদ্দেশে তাঁর হুঁশিয়ারি, তাঁরা যেন কোনও অবস্থাতেই হিংসার বিপরীতে নিজেরা হিংসার পথ বেছে না নেন। তাঁর মতে, মারপিট কেবল দুর্বল ও ভীতু মানুষেরাই করে থাকে।
আন্দোলনকারীদের সুশৃঙ্খল থাকার আহ্বান জানিয়ে অভিজিৎ জোর দিয়ে বলেন, একটি নয়, তাঁর ওপর যদি একশোবারও এমন কাপুরুষোচিত আক্রমণ চালানো হয়, তবুও তাঁর কণ্ঠকে দমিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। ন্যায়ের দাবিতে তাঁদের এই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জারি থাকবে। যুব সমাজের ন্যায্য অধিকারের কথা বলতে গিয়ে তাঁরা বুক চিতিয়ে লড়াই করবেন, কিন্তু কোনও মতেই আইন হাতে তুলে নেবেন না। তাঁর এই শান্ত অথচ প্রত্যয়ী স্বভাব উপস্থিত হাজারো আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের উদ্বুদ্ধ করে তোলে।
নিজের ভাষণে অভিজিৎ দিপকে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে রাজস্থানের বর্তমান শাসকদলের মন্ত্রীদের উদাসীন দৃষ্টিভঙ্গির কড়া সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, রাজস্থানের এক প্রভাবশালী মন্ত্রী নিট পরীক্ষার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাকে অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। যুবনেতা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে মনে করিয়ে দেন যে, সাধারণ ঘরের মেধাবী পড়ুয়ারা যখন নিজের দেশে পরীক্ষার ব্যবস্থার ত্রুটি ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছে, তখন উচ্চপদস্থ রাজনীতিকদের সন্তানরা বাইরে পড়াশোনা করছে।
তিনি বলেন, রাজনীতিকরা নিজেদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য আমেরিকায় পাঠাচ্ছেন। তিনি নিজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করার সময় এই সমস্ত প্রভাবশালীদের পরিবারের সন্তানদের অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন প্রত্যক্ষ করেছেন। সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য কতটা সস্তা, তা বোঝাতে গিয়ে গত বছর ঝালওয়ারে একটি স্কুলের ছাদ ভেঙে ৬-৭ জন নিষ্পাপ ছাত্রছাত্রীর মৃত্যুর হৃদয়বিদারক ঘটনাটি স্মরণ করান তিনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সেই দুর্ঘটনায় যদি কোনও বিধায়কের সন্তান থাকত, তবে কি প্রশাসন এতটা চুপ থাকত?
দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি নিশানা করে অভিজিৎ বলেন, যাকে ভক্তরা এবং প্রচার মাধ্যম ‘মহামানব’ বলে স্তুতি গায়, যিনি নাকি সুদূর রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধ এক লহমায় থামিয়ে দেওয়ার দাবি করেন, তিনি ভারতের অভ্যন্তরে হওয়া পরীক্ষাগুলোর প্রশ্ন চুরি ও ফাঁস হওয়া আটকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। বিদেশে বড় বড় দাবির আড়ালে দেশের লাখ লাখ ছাত্র-যুবকের কেরিয়ার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সরকারের সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। এই বৈপরীত্য দেশের যুবশক্তি আজ ভালোভাবে চিনে নিয়েছে।
যাঁরাই সরকারের নীতি ও ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদেরকেই তকমা সেঁটে দেওয়ার নোংরা রাজনীতিরও তীব্র প্রতিবাদ করেন এই যুবনেতা। তিনি বলেন, ন্যায্য অধিকারের দাবি নিয়ে জয়পুরে সমবেত হওয়া সাধারণ যুবকদের অবলীলায় ‘পাকিস্তানি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেবল আন্দোলনকারীরাই নন, যেসব নির্ভীক সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম এই দুর্নীতির বিষয়ে প্রশাসনকে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছেন, তাঁদেরকেও দেশদ্রোহী ও পাকিস্তানি আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এই স্বৈরাচারী মনোভাবের মোকাবিলা করার সময় এসেছে।
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিতে সুদূর সিকিম থেকে রাজস্থানে এসেছিলেন তরুণ আন্দোলনকারী বেবেশ অধিকারী। দুর্ভাগ্যবশত, জয়পুরের এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তিনিও হিংস্র হামলার মুখে পড়েন। উগ্র আক্রমণকারীদের মারধরের জেরে তিনি শারীরিকভাবে জখম হন এবং হাতাহাতির জেরে তাঁর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মোবাইল ফোনটি হারিয়ে যায় বলে অভিযোগ। একটি ভিন রাজ্য থেকে আসা যুবকের ওপর জয়পুরের রাজপথে এই ধরনের সংঘাতের ঘটনা রাজস্থানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।
তবে হামলার মুহূর্তে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে নেন উপস্থিত পুলিশকর্মীরা। রাজস্থান পুলিশের কয়েকজন তৎপর জওয়ান তৎক্ষণাৎ বেবেশ অধিকারীকে হামলাকারীদের বেষ্টনী থেকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যান। পরে মঞ্চে উঠে নিজের বক্তব্যে বেবেশ এই অত্যন্ত সঙ্কটজনক সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য এবং অবধারিত বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য স্থানীয় পুলিশকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান। তাঁর হারানো ফোনটি উদ্ধারেও প্রশাসন যথাসাধ্য সাহায্য করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জয়পুরের শহিদ স্মারকের এই রক্তাক্ত অধ্যায় ভারতের যুব সমাজের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ ও হাহাকারের বাস্তব ছবিটিকে আরও একবার দেশবাসীর সামনে তুলে ধরল। পরীক্ষা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার আইনি লড়াই রাজপথের হিংসার মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা গণতন্ত্রের পক্ষে কখনই শুভ লক্ষণ নয়। শিক্ষার অধিকার ও কর্মসংস্থানের দাবিতে হওয়া যুবদের এই কণ্ঠস্বরকে বাহুবল দিয়ে স্তব্ধ করা যাবে না বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক মহল। প্রশাসন ও সরকারের আগামী দিনের পদক্ষেপেই এখন ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।



Post Comment