যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি নিয়ে ক্ষুব্ধ নেতানিয়াহু, তাহলে কি ট্রাম্পের পাশে থাকবে না ইজরায়েল?

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি নিয়ে ক্ষুব্ধ নেতানিয়াহু, তাহলে কি ট্রাম্পের পাশে থাকবে না ইজরায়েল?

International

-Ritesh Ghosh

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হতে চলেছে। সুইজারল্যান্ডে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার বিষয়টিকে বিশ্বজুড়ে স্বাগত জানানো হলেও, এতে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান শক্তি ইজরায়েল। পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার আশা দেখছেন। তবে তেল আবিব এই চুক্তিটিকে তাদের দেশের সুরক্ষার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্রমাগত ইরানি হামলার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোও জড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যেই ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ লেবাননে ছড়িয়ে পড়ে, যা সমগ্র অঞ্চলকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে এই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে চলায় তেল আবিবের রণকৌশল ব্যাপক ধাক্কা খেল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

US and Iran peace deal creates diplomatic rift

এই সমঝোতা চুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ইজরায়েলের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী জোট সরকারের শরিকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছেন। তাদের স্পষ্ট কথা, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া এই চুক্তি কোনোভাবেই তেল আবিব মানতে বাধ্য নয় এবং এটি তারা মানবেও না।

ইজরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ লিখেছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চুক্তি ইজরায়েলের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইজরায়েল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধীনস্থ অঙ্গরাজ্য নয়, বরং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। ইজরায়েল কোনো অতিসাধারণ দুর্বল দেশ নয় যে অন্যের যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে।

তিনি আরও দাবি করেছেন যে, হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনা হতে পারে না। উত্তর সীমান্তের বাসিন্দারা যখন এখনও রকেট হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে, তখন ইজরায়েলি সেনাদের উদ্ধার করা অঞ্চল থেকে পিছু হটার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। একইভাবে দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এই চুক্তিকে ইজরায়েল ও সমগ্র মুক্ত বিশ্বের জন্য একটি ‘বিপজ্জনক চুক্তি’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন এবং তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে নিজস্ব কৌশলে পথ চলার কথা বলেছেন।

সামরিক অবস্থান স্পষ্ট করে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইজরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন যে, লেবানন, সিরিয়া এবং গাজা উপত্যকা থেকে তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না। তাঁর মতে, সেনা মোতায়েন রাখা এবং বাফার জোন সুরক্ষিত রাখা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) অন্যতম বড় সাফল্য। আইডিএফ সেনা প্রত্যাহারের চরম বিরোধিতায় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কঠোর বার্তা পাঠিয়েছেন বলে কাৎজ উল্লেখ করেন।

শুধু সরকারি দলের সদস্যরাই নন, সরকারের এই পরিস্থিতিতে কড়া সমালোচনা শুরু করেছে ইজরায়েলের বিরোধী দলও। ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ইয়ার গোলান এই দিনটিকে দেশের ইতিহাসে একটি ‘কঠিন সকাল’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, সেনাবাহিনীর সাহসী বৈমানিক ও যোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অর্জনগুলো নেতানিয়াহুর নিষ্ক্রিয়তার কারণে আজ বিলীন হয়ে গেছে। যখন চুক্তি চূড়ান্ত হচ্ছিল, তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দুর্বল ও একাকী অবস্থায় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

অন্যদিকে অন্যতম শীর্ষ বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিড এই চুক্তিকে ইজরায়েলের বিদেশ ও নিরাপত্তা নীতির সবচেয়ে বড় পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ইজরায়েলের জাতীয় সুরক্ষাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ঠেলে দেবে। এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায় তিনি সরাসরি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ওপর চাপিয়েছেন।

ইজরায়েলের মূল আপত্তির জায়গা হলো এই যে, মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তির অন্যতম শর্ত অনুযায়ী সমস্ত ফ্রন্টে বৈরিতার অবসান ঘটাতে হবে, যার মধ্যে লেবানন সীমান্তও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ইজরায়েল দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার স্বার্থে লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে চায়। এছাড়া তেহরান ও ওয়াশিংটনের দ্বিপাক্ষিক এই আলোচনায় তাদের সব চেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যু্ক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল পর্যায় থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে বলে দাবি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং পারমাণবিক শক্তির বিস্তার রোধে এই চুক্তিতে সুনির্দিষ্ট কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি ইরানের বাজেয়াপ্ত করা বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক সম্পদ অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি ও গাজার হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ইজরায়েলি শিবিরে গভীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

আপাতত সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই শান্তি চুক্তিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই শান্তি চুক্তির বিষয়ে নীরব থাকলেও, ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়ন না করতে পারে তার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। এই কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার মূল বিষয়।

Previous post

Lok Adalat: বিনা খরচে দ্রুত বিচারের ম্যাজিক! বীরভূমের ৩ মহকুমা আদালতে আদায় ১২ কোটি, চমক দিল লোক আদালত

Next post

South 24 Parganas News: ফলতায় এবার কাণ্ড! নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হুগলি নদীর চরে আটকে গেল বিদেশি জাহাজ, দেখতে লোকে লোকারণ্য

Post Comment

You May Have Missed