ফেভারিট ফ্রান্সকে জব্দ করে ফের বিশ্বকাপের ফাইনালে অপ্রতিরোধ্য স্পেন, নিষ্প্রভ এমবাপে
Football
-Ritesh Ghosh
দীর্ঘ ষোলো বছর পর আবারও ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ইতিহাস গড়ার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল স্পেন। টেক্সাসের আর্লিংটনে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর প্রথম হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালে ফেভারিট ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিল ‘লা রোহারা’। দুর্দান্ত এই জয়ের সুবাদে ২০১০ সালের সেই সোনালী ট্রফি জয়ের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে পা রাখল স্প্যানিশরা। পুরো ম্যাচ জুড়েই ছিল স্পেনের আক্রমণভাগের একক আধিপত্য।
খেলার শুরু থেকেই চমৎকার পাসিং গেমে ফরাসি রক্ষণকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে স্প্যানিশ মিডফিল্ডাররা। প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে মিকেল ওয়ারজাবালের নিখুঁত স্পট-কিক স্প্যানিশদের এগিয়ে দেয়। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে পেদ্রো পোরোর চমৎকার গোল টুর্নামেন্টের অন্যতম দাবিদার ফ্রান্সের ম্যাচে ফেরার সব আশা চিরতরে শেষ করে দেয়। অন্যদিকে, টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ধাক্কা খেল কিলিয়ান এমবাপেদের।

লামিনে ইয়ামালের ম্যাজিক ও প্রথম গোল
ম্যাচের শুরুর দিকে দুদলই কিছুটা সতর্ক ফুটবল খেললেও খেলার বয়স বাড়ার সাথে সাথে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় স্পেন। বিশেষ করে ম্যাচের ২২ মিনিটে প্রথম সাফল্য পায় তারা। সদ্য ১৯ বছর বয়সী তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামালের গতি ও উপস্থিত বুদ্ধির কাছে একপ্রকার পরাস্ত হয় ফ্রান্সের বিশ্বমানের ডিফেন্ডাররা। পেনাল্টি বক্সের ভেতর ইয়ামালের দুরন্ত দৌড় থামাতে গিয়ে তাকে ফাউল করে বসেন ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিগনে।
ইয়ামালকে ফাউল করায় রেফারি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নেন। আর স্পট থেকে কোনওরকম ভুল না করে লক্ষ্যভেদ করেন মিকেল ওয়ারজাবাল। অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ড ঠান্ডা মাথায় ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইগনানকে পরাস্ত করে দলকে ১-০ ব্যবধানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লিড এনে দেন। এটি কেবল ওয়ারজাবালের চলতি বিশ্বকাপের পঞ্চম গোলই ছিল না, বরং এই গোলের মধ্য দিয়ে পুরো টুর্নামেন্টে এই প্রথম কোনও ম্যাচে পিছিয়ে পড়েছে বিশ্বর্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা অন্যতম ফেভারিট ফ্রান্স।
ফ্রান্সের মতো বিশ্বমানের ডিফেন্স লাইনের বিরুদ্ধে গোল আদায় করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। এই সেমিফাইনালের আগে খেলা সাতটি ম্যাচে ফরাসিরা গোল হজম করেছিল মাত্র দুটি। কিন্তু স্পেনের আক্রমণাত্মক কৌশলের সামনে তারা আজ একেবারেই সুবিধা করতে পারেনি। অবশ্য প্রথমার্ধের অষ্টম মিনিটে ফাউল থেকে বিপজ্জনক জায়গায় একটি ফ্রি-কিক পেয়েছিল স্পেন। আদ্রিয়েন রাবিওত হলুদ কার্ড দেখেন, তবে অ্যালেক্স বায়েনার নেওয়া সেই ফ্রি-কিক ফরাসি দেয়ালে প্রতিহত হয়।
পেদ্রো পোরোর গোল ও স্পেনের রক্ষণভাগের প্রাচীর
এক গোলে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে খেলতে নেমে আরও আক্রমণাত্মক মেজাজে ফুটবল খেলতে শুরু করে স্পেন। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রেখে দ্বিতীয় গোলের জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে তারা। অবশেষে পেদ্রো পোরোর দুর্দান্ত এক ফিনিশিংয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করে স্প্যানিশ আর্মাডা। টটেনহ্যামের এই নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার দানি ওলমোর সঙ্গে চমৎকার ওয়ান-টু পাসের মাধ্যমে ফরাসি রক্ষণভাগ ভেদ করেন এবং বিন্দুমাত্র ভুল না করে ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে দেন।
ব্যবধান ২-০ হওয়ার পর ম্যাচে ফ্রান্সের ফিরে আসার কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়। কারণ স্পেনের রক্ষণভাগ এবার টুর্নামেন্ট জুড়েই অপ্রতিরোধ্য পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে তারা এখনও পর্যন্ত মাত্র একটি গোল হজম করেছে। রক্ষণ ও আক্রমণের এমন নিখুঁত ভারসাম্যই জুয়ান দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যদের বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং ধারাবাহিক দলে পরিণত করেছে, যার অনবদ্য প্রমাণ সেমিফাইনালে দেখা গেল।
এমবাপের নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স ও গোল্ডেন বুটের লড়াই
ম্যাচের অন্যতম বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে কিছুটা ইনজুরির কবলে পড়ায় দ্বীতীয়ার্ধের ৭৭ মিনিটে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। সেমিফাইনালের শুরু থেকেই তার মাঠে নামাটা ফরাসি শিবিরে বড় স্বস্তির কারণ হলেও স্প্যানিশ ডিফেন্ডারদের কড়া পাহাড়ায় তাকে আজ অনেকটাই নিষ্প্রভ দেখিয়েছে। গোল করতে না পারায় ব্যক্তিগত মাইলফলকের দিক থেকেও কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন তিনি।

চলতি টুর্নামেন্টে এমবাপে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এখনও আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির সমানে সমানে লড়াই করছেন। ৩৯ বছর বয়সী মেসি যেখানে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২১টি গোল করে নতুন এক ইতিহাস গড়ে অবস্থান করছেন, সেখানে মাত্র ২৭ বছর বয়সী এমবাপের ঝুলিতে রয়েছে ২০টি বিশ্বমঞ্চের গোল। আজ জালের দেখা পেলে মেসিকে স্পর্শ করার সুযোগ তৈরি হতো, কিন্তু ফরাসি স্ট্রাইকারের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় স্পেনের রক্ষণাত্মক দেওয়াল।
টানা তৃতীয় ফাইনালের স্বপ্নভঙ্গ ফ্রান্সের
সেমিফাইনালে এমন হারের ফলে রানার্স-আপ হিসেবে গত কাতার আসর শেষ করা ফ্রান্সের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন এখানেই থমকে গেল। ২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এবার ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের টানা তৃতীয়বার ফাইনালে নিয়ে গিয়ে নতুন রেকর্ড গড়ার স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু স্প্যানিশ তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার চোখ ধাঁধানো রণকৌশলের সামনে ফরাসিদের সেই মহাকাব্যিক পথচলা আর্লিংটনের মাঠেই শেষ হয়ে গেল। ফরাসি শিবিরে এখন চরম হতাশার ছায়া।
ফাইনালে বিশ্বজয়ের মহারণ, প্রতিপক্ষ কে?
ফাইনালে ওঠার পর এখন স্পেনের একমাত্র লক্ষ্য পরবর্তী প্রতিপক্ষের অপেক্ষার অবসান ঘটানো। আটলান্টায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দ্বিতীয় সেমিফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হবে শক্তিশালী ইংল্যান্ড এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। এই টানটান উত্তেজনার ম্যাচের বিজয়ী দলই ফাইনালে স্পেনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নামবে। মেসিদের আর্জেন্টিনা নাকি হ্যারি কেনদের ইংল্যান্ড স্পেনের সামনে এসে দাঁড়াবে, তা নিয়েই এখন শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
২০১০ সালের অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ জয় এবং ২০১২ সালের ইউরো জয়ের পর বিশ্বমঞ্চে স্পেনের ফুটবলে যে খরা তৈরি হয়েছিল, তা এবার কেটে যাওয়ার সময় এসেছে। এবারের আসরে দলটির অনবদ্য ফুটবল শৈলী বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের মন জয় করে নিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ফাইনালে নিজেদের জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে স্পেন ফের বিশ্বকাপ জিততে পারে কিনা।
Post Comment