কংগ্রেসের শহিদ দিবসের মঞ্চে এবার মমতাকে আমন্ত্রণ প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্করের, দিলেন চ্যালেঞ্জ
Kolkata
-Ritesh Ghosh
২১ জুলাই, শহিদ দিবস নিয়ে কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসকে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল প্রদেশ কংগ্রেস। দীর্ঘ কয়েক দশক পর বিধান ভবনের চার দেওয়াল ছেড়ে শহিদ মিনার ময়দানে নেমে ২১ জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ ও বড় সমাবেশের আয়োজন করছে হাত শিবির। আর সেই ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকেই সরাসরি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানিয়ে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক চাল চাললেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার।
শহিদ মিনারে এই সমাবেশের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে গিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব স্পষ্ট ভাষায় এক নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। শুভঙ্কর সরকার বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সেদিনের লড়াইকে সম্মান জানাতে চান এবং বাংলার মানুষের কাছে নিজের সততার প্রমাণ দিতে চান, তবে তাঁর এই মঞ্চে আসা উচিত। প্রদেশ কংগ্রেসের এই অনমনীয় অবস্থানের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র লড়াই ও নানামুখী সমীকরণ তৈরির চেষ্টা।

১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানে পুলিশের গুলিতে ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠিত হওয়ার পর থেকে এই দিনটিকে নিজেদের প্রধান আবেগ ও শক্তি প্রদর্শনের রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে পালন করে আসছে তৃণমূল। অন্যদিকে, মূল দল কংগ্রেস এত দিন এই দিনটিতে শুধুমাত্র ঘরের ভিতরে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত।
এবার সেই পুরনো জড়তা সম্পূর্ণ কাটিয়ে প্রকাশ্য ময়দানে নেমে নিজেদের প্রাপ্য রাজনৈতিক অধিকার বুঝে নিতে চাইছে কংগ্রেস। মঙ্গলবার শহিদ মিনার ময়দানের প্রস্তুতি দেখতে গিয়ে শুভঙ্কর সরকার বলেন, “আমরা শহিদ মিনার চত্বরে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আহ্বান জানাচ্ছি। ওঁর যদি সৎ সাহস থাকে, তাহলে উনি ইতিহাস বিকৃত করবেন না। ওঁর এই শহিদ মঞ্চে এসে নিজের ভুল স্বীকার করা উচিত।”
কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবি, ১৯৯৩ সালের ওই ঐতিহাসিক আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা এবং যুব কংগ্রেসের হাত চিহ্ন প্রতীক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে লড়াকু আন্দোলনের হাত ধরে আজকে পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় পৌঁছেছেন, তার সম্পূর্ণ ভিত আসলে জাতীয় কংগ্রেসের ঘরের অবদান। দল ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে এক মস্ত বড় ঐতিহাসিক ভুল এবং ইতিহাসের প্রতি অমর্যাদা বলেই মনে করেন কংগ্রেস নেতৃত্ব।
শুভঙ্কর সরকার আরও বলেন, “ভুল স্বীকার করলে মমতাদেবী নিজের মনে শান্তি পাবেন। ওঁর দল ছাড়া এবং ইতিহাসকে সম্পূর্ণ নিজের নতুন দলের মতো করে সাজানো ভুল ছিল।” কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যদি মুখ্যমন্ত্রী তাঁর অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ভুল স্বীকার করতে চান এবং শহিদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চান, তবে এই মঞ্চে দেশের প্রাচীনতম দলটির পক্ষ থেকে তাঁকে সাদরে স্বাগত জানানো হবে।
কংগ্রেসের তোপ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদাসীনতা ও ভ্রান্ত কৌশলের কারণেই ২১ জুলাইয়ের শহিদ স্মরণের আসল লক্ষ্য এত দিনে সম্পূর্ণ বিপথগামী হয়েছে। যে পুলিশ অফিসার ও প্রশাসনিক কর্তারা সেদিন যুব কংগ্রেস কর্মীদের ওপর নির্মম গুলিবর্ষণের ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং তাঁদের অনেককেই পরবর্তীতে নানা উপায়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে কংগ্রেস নেতৃত্ব।
কালীঘাট তৃণমূলকে আরও কোণঠাসা করতে কংগ্রেস এবার এক স্পর্শকাতর প্রশাসনিক অধ্যায় সামনে এনেছে। ১৯৯৩ সালের সেই গুলিবর্ষণের ঘটনার সময় বাম সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্র সচিব ছিলেন মণীশ গুপ্ত। পরবর্তীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর সেই মণীশ গুপ্তই তৃণমূলে যোগ দেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবিনেট মন্ত্রী হন। এই পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তকেই কংগ্রেস এখন নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরছে।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রশ্ন তুলেছেন, যে মণীশ গুপ্তের প্রশাসনিক নির্দেশে সেদিন বেপরোয়া গুলি চালিয়ে ১৩ জন নিরীহ যুবকের প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তাঁকে কোন স্বার্থে ক্ষমতার শীর্ষাসনে বসিয়েছিলেন মমতা? এটি শহিদদের ত্যাগের সঙ্গে অসম্মানজনক ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়। কংগ্রেসের দাবি, সরকার অবিলম্বে লালফিতের ফাইলে বন্দি থাকা ২১ জুলাইয়ের সমস্ত জরুরি নথি সাধারণের সামনে প্রকাশ করুক।
ইতিমধ্যেই এই মণীশ গুপ্ত প্রসঙ্গ ও তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফাইল জনসমক্ষে আনার দাবিতে রাজ্যজুড়ে পোস্টার ও দেওয়াল লিখন শুরু করেছে যুব কংগ্রেসের কর্মীরা। এতদিন তৃণমূল যেভাবে একচ্ছত্রভাবে ২১ জুলাইয়ের আবেগকে নিজেদের রাজনৈতিক লাভ ও নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কাজে ব্যবহার করত, সেখানে কংগ্রেসের এই সরাসরি অংশগ্রহণ তৃণমূলের রাজনীতিকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
Post Comment