রাশিয়ার তেল কেনায় শাস্তি! ভারতের ওপর বড় শুল্ক বসানোর পথে ট্রাম্পের আমেরিকা!
International
-Ritesh Ghosh
ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে চলেছে আমেরিকা। রুশ তেল ও জ্বালানি ক্রেতাদের লক্ষ্য করে মার্কিন সেনেটে পেশ করা হয়েছে একটি নতুন দ্বিদলীয় নিষেধাজ্ঞা বিল। এই বিলে ভারত ও চিনসহ পাঁচটি দেশের রফতানি পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই নতুন পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
হোয়াইট হাউসের স্পষ্ট সমর্থনপুষ্ট এই শক্তিশালী বিলটি আগামী অগাস্ট মাসের আগেই মার্কিন সেনেটে পাস হতে পারে বলে জোরালোভাবে মনে করা হচ্ছে। এই বিলের মূল লক্ষ্য হল রাশিয়ার অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস তথা জ্বালানি শক্তি সেক্টরকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেওয়া। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের আশা, এর ফলে ক্রেমলিন ইউক্রেনে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করতে বাধ্য হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত ভারতের মতো বন্ধুভাবাপন্ন দেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে চলেছে।

মার্কিন সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল ওয়াশিংটনে এক সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এই নতুন শুল্ক নীতিটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পাঁচটি প্রধান ক্রেতা দেশের ওপর প্রয়োগ করা হবে। এই তালিকায় রয়েছে চিন, ভারত, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজান। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার অপরাধেই মূলত এই দেশগুলিকে শাস্তিমূলক শুল্কের মুখোমুখি হতে হতে পারে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে এই কঠোর শুল্ক প্রত্যাহারের ক্ষমতাও মার্কিন প্রশাসনের হাতে রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়েছে, যেসব দেশ রাশিয়ার মোট প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ১৫ শতাংশের কম অংশ কেনে এবং জ্বালানি আমদানি কমাতে ইতিমধ্যেই সক্রিয় পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে এই কড়া নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। তবে তেল আমদানিকারকদের জন্য কোনও ধরনের অবাধ রেহাই নেই। সেনেটর ব্লুমেনথাল জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলির ওপর ঠিক কতটা শুল্ক চাপানো হবে, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি বা ইউএসটিআর (USTR)।
মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই অত্যন্ত বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। চিন, ভারত ও অন্যান্য বড় ক্রেতাদের রুশ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস কেনা থেকে কার্যকরভাবে বিরত রাখতেই এই শুল্কের হার নির্ধারণ করা হবে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির নেওয়া যেকোনও সিদ্ধান্ত বা শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব সম্পর্কে পরবর্তীতে মার্কিন কংগ্রেসকে নিয়মিত রিপোর্ট ও সার্টিফিকেশন প্রদান করতে হবে, যাতে এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
ভারত বিগত কয়েক বছর ধরে রাশিয়ার কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন বিলটি যদি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়, তবে ভারতের রফতানি সেক্টরর এক বড় সঙ্কটের মুখে পড়বে। কারণ, আমেরিকার বিশাল বাজারে ভারতীয় পণ্যের ওপর বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপে রয়েছে। বিশেষ করে ‘মিশন ৫০০ বিলিয়ন ডলার’ এর মতো বড় বাণিজ্যিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যখন দুই দেশই গভীরভাবে কাজ করছে, তখন এমন একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা বিল ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করল। একদিকে সস্তা রুশ জ্বালানি সংগ্রহ ও দেশের নিজস্ব শক্তি নিরাপত্তা বজায় রাখা, অন্যদিকে আমেরিকার বড় বাজারের স্বার্থের রক্ষা করা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা দিল্লির সামনে কঠিন লড়াই।
যদি ওয়াশিংটনের এই বিলটি শেষ পর্যন্ত আইনে রূপ নেয়, তবে তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পুরো সমীকরণকে ওলটপালট করে দেবে। ভারত সরকার এই বিষয়ে ঠিক কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং মার্কিন প্রশাসনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে কোনও বিশেষ শুল্ক ছাড় আদায়ে সক্ষম হয় কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এই বিল পাশ হওয়ার পর যে আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
Post Comment