Petrol Price Difference: দিল্লির তুলনায় কেন চেন্নাই, মুম্বই ও কলকাতায় পেট্রোলের দাম বেশি হয় ?
১৫ মে, মঙ্গলবারের হিসেব অনুযায়ী দিল্লিতে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ৯৭.৭৭ টাকা। অন্যদিকে কলকাতায় সেই দাম বেড়ে হয়েছে ১০৮.৭৪ টাকা। মুম্বইয়ে পেট্রোলের দাম ১০৬.৬৮ টাকা এবং চেন্নাইয়ে ১০৩.৬৭ টাকা প্রতি লিটার। ডিজেলের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে। দিল্লিতে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৯০.৬৭ টাকা হলেও কলকাতায় তা ৯৫.১৩ টাকা এবং চেন্নাইয়ে ৯৫.২৫ টাকা।
প্রথম নজরে এই পার্থক্য কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ ভারত কেন্দ্রীয়ভাবে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি প্রতিদিন দাম সংশোধন করে এবং দেশের বিভিন্ন শহরে জ্বালানির গুণগত মানও প্রায় একই। তাহলে একই এক লিটার তেলের দাম শহরভেদে এত আলাদা কেন?
এর সংক্ষিপ্ত উত্তর—কর। আর বিস্তারিত উত্তর—রাজ্য সরকারের ভ্যাট বা ট্যাক্স। জ্বালানির দামের সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করে VAT৷ ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের দামে একাধিক স্তর থাকে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানির মূল দাম, পরিবহণ খরচ, ডিলার কমিশন এবং কেন্দ্র সরকারের আরোপিত এক্সাইজ ডিউটি।
এরপর আসে রাজ্য সরকারের VAT বা ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স, আর সেখান থেকেই মূল পার্থক্য তৈরি হয়। GST-র বাইরে এখনও পেট্রোল ও ডিজেলকে রাখা হয়েছে। ফলে প্রতিটি রাজ্য সরকার নিজেদের মতো করে জ্বালানির উপর VAT বা বিক্রয় কর ধার্য করতে পারে। কোথাও নির্দিষ্ট শতাংশে কর নেওয়া হয়, আবার কোথাও অতিরিক্ত সেস বা সারচার্জও যোগ করা হয়।
দিল্লিতে ঐতিহাসিকভাবে VAT তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে মহারাষ্ট্র বা পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের তুলনায়। সেই কারণেই দেশের বড় শহরগুলির মধ্যে দিল্লিতে জ্বালানির দাম অনেক সময় কম থাকে।
অন্যদিকে কলকাতায়, যেখানে শুক্রবার পেট্রোলের দাম চার মেট্রোর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০৮.৭৪ টাকা প্রতি লিটার হয়েছে, সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানির উপর তুলনামূলক বেশি কর রয়েছে। মুম্বইয়ের দামও মহারাষ্ট্রের VAT কাঠামো এবং অতিরিক্ত করের কারণে বেশি।
তামিলনাড়ু আবার আলাদা কর কাঠামো অনুসরণ করে। তাই চেন্নাইয়ের জ্বালানির দাম দিল্লি ও মুম্বইয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে। ফলে শুধুমাত্র অন্য একটি রাজ্যে প্রবেশ করার কারণেই একই এক লিটার পেট্রোলের জন্য প্রায় ১০-১১ টাকা বেশি খরচ করতে হতে পারে।
জ্বালানির দামে পরিবহণ ও ফ্রেট চার্জেরও কিছু প্রভাব রয়েছে, তবে তা করের মতো এত বড় নয়। রিফাইনারি ও ডিপো থেকে পাইপলাইন, ট্যাঙ্কার এবং বিভিন্ন পরিবহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে পেট্রোল-ডিজেল পাম্পে পৌঁছয়। সরবরাহ কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা শহরগুলিতে কিছুটা বেশি পরিবহণ খরচ যোগ হতে পারে। তবে শুধুমাত্র ফ্রেট চার্জ দিয়ে বোঝানো যায় না কেন কলকাতায় দিল্লির তুলনায় বেশি দাম, কিংবা সমুদ্রতীরবর্তী শহর হওয়া সত্ত্বেও কেন মুম্বইয়ে জ্বালানির দাম এত বেশি। যদি পরিবহণই প্রধান কারণ হত, তাহলে দেশের দূরবর্তী এলাকাগুলিতেই সবসময় সবচেয়ে বেশি জ্বালানির দাম দেখা যেত। বাস্তবে কিন্তু তা হয় না। বরং অনেক সময় পোর্ট ব্লেয়ারের মতো এলাকায় মূল ভূখণ্ডের শহরগুলির তুলনায় কম দামে পেট্রোল বিক্রি হয়েছে, কারণ স্থানীয় কর ব্যবস্থাই এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। এ কারণেই রাজ্যের সীমানা পার করলেই অনেক সময় হঠাৎ জ্বালানির দামে বড় পরিবর্তন দেখা যায়, যদিও দূরত্ব খুব কম।
আবারও আলোচনায় আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম-
সাম্প্রতিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পিছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা।যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ পথ হরমুজ প্রণালী নিয়ে আশঙ্কা বাড়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে ঘোরাফেরা করছে। ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি দেশের জ্বালানির দামের উপর প্রভাব ফেলে। তবে কেন্দ্র সরকার জানিয়েছে, দেশে জ্বালানির কোনও ঘাটতি নেই।
এই সপ্তাহের শুরুতেই কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেও দেশে পেট্রোল, ডিজেল ও LPG-র সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। CII Annual Business Summit 2026-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশে পর্যাপ্ত ক্রুড মজুত রয়েছে এবং রিফাইনারিগুলি পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে।
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক ওঠানামা সত্ত্বেও ২০২২ সাল থেকে শুক্রবারের সর্বশেষ সংশোধনের আগে পর্যন্ত খুচরো জ্বালানির দাম প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
জ্বালানির দাম বাড়লেই এই প্রশ্ন সামনে আসে। অর্থনীতিবিদ এবং শিল্প বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই পেট্রোল ও ডিজেলকে GST-র আওতায় আনার পক্ষে মত দিচ্ছেন। এতে রাজ্যভেদে দামের পার্থক্য কমতে পারে এবং সারা দেশে এক ধরনের অভিন্ন মূল্য নির্ধারণ সম্ভব হতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ রাজ্য সরকার এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে, কারণ জ্বালানির উপর কর তাদের অন্যতম বড় আয়ের উৎস। অনেক রাজ্যের ক্ষেত্রেই পেট্রোল ও ডিজেলের VAT থেকে পাওয়া রাজস্ব কল্যাণমূলক প্রকল্প, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং দৈনন্দিন সরকারি খরচ চালানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। GST-র আওতায় এলে রাজ্যগুলিকে সেই স্বাধীন কর আরোপের ক্ষমতার বড় অংশ ছাড়তে হবে। তাই পরিস্থিতি না বদলানো পর্যন্ত ভারতে শহরভেদে জ্বালানির দামের এই বড় পার্থক্য বজায় থাকবে।



Post Comment