ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় প্রাণের খোঁজে চলছে মরিয়া লড়াই, মৃত বেড়ে হাজারের কাছাকাছি

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় প্রাণের খোঁজে চলছে মরিয়া লড়াই, মৃত বেড়ে হাজারের কাছাকাছি

International

-Ritesh Ghosh

ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। গত বুধবারের এই মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশটির গত এক শতাব্দীর ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রিখটার স্কেলে যথাক্রমে ৭.২ এবং ৭.৫ তীব্রতার দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্পে পুরোপুরি লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে রাজধানী কারাকাস ও তার পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৯২০ ছাড়িয়ে গিয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতি এমন এক জটিলাকার ধারণ করেছে যেখানে আটকে থাকা মানুষদের বাঁচানোর লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক ত্রাণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে নিজেরাই উদ্ধারকাজে নেমে পড়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অন্তত ১৭২ জন মানুষ আটকে রয়েছেন বলে সরকারিভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারি স্তরে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি হাজার হাজার সাধারণ ভেনেজুয়েলাবাসী নিজেদের প্রিয়জনদের খুঁজে বের করতে খালি হাতেই ভারী কংক্রিটের চাঙর সরানোর চেষ্টা করছেন। পুরো অঞ্চলে আহতদের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৩,৩৬০ ছাড়িয়ে গিয়েছে এবং হাসপাতালগুলিতে তিলধারণের জায়গা নেই।

Emergency rescue operations in ruins of earthquake-hit Venezuela

ভূমিকম্পের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সরকারি সাহায্য সময়মতো উপদ্রুত এলাকাগুলিতে পৌঁছায়নি বলে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। এই ক্ষোভ ও হতাশা থেকে স্থানীয় নাগরিকরা নিজেদের মতো করে দল গঠন করে উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছেন। হাতুড়ি, শাবল বা সাধারণ শক্তির কিছু সরঞ্জাম নিয়েই ধ্বংসস্তূপের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তাঁরা। কারাকাসের উপদ্রুত অঞ্চলের বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী মারজুসলি সালাজার কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, “আমি আমার ছোট্ট পাঁচ মাসের ছেলে গায়েলকে খুঁজছি। আমার ১৬ বছরের বড় মেয়েটা ইতিমধ্যেই এই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা গিয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন, এখানে ভারী ক্রেন ও যন্ত্রপাতি পাঠান।”

চিকিৎসক ও উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা গোল্ডেন পিরিয়ড বলে মনে করা হয়। কারণ এই সময়ের পর ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সমুদ্র উপকূলবর্তী লা গুয়াইরা রাজ্যটি। সেখানকার ধসে যাওয়া এক বহুতল আবাসন চত্বরে উদ্ধারকারী দলের প্রধান নাদিওমার পোলানো জানান, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক এবং সম্পূর্ণ ধসে যাওয়া বড় ব্লকগুলির নিচে আটকে থাকা কোনো মানুষের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা অত্যন্ত ক্ষীণ। এখন আমাদের কর্মীরা মূলত দেহাবশেষ উদ্ধারের ওপরেই মনোযোগ দিচ্ছেন।

এদিকে শুক্রবার রাতে উপদ্রুত এলাকায় যাতায়াতের ওপর সরকারের নতুন নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল এবং উসকানিমূলক করে তুলেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অতি উৎসাহী সাধারণ মানুষের ভিড়ে ট্রাফিক জাম এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে, যা যান্ত্রিক উদ্ধারকাজের গতি ধীর করে দিচ্ছে। তাই এখন থেকে দুর্ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে হলে বিশেষ অনুমতিপত্রের প্রয়োজন হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে নিখোঁজদের পরিজনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একই সাথে ক্যাটিয়া লা মার এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে খাদ্যদ্রব্য, পানীয় জল ও জীবনদায়ী ওষুধের জন্য হাহাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বহু মানুষ সুপারমার্কেট ও ওষুধের দোকানগুলির সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছেন।

ভেনেজুয়েলার এই চরম দুর্দিনে আন্তর্জাতিক মহল সবরকম সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী সংস্থা ওচা (OCHA) নিশ্চিত করেছে যে, অন্তত ১৭টি দেশ থেকে বিশেষ উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় সরাসরি কাজ শুরু করেছে। মেক্সিকো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, কলম্বিয়া এবং এল সালভাদরের মতো দেশ থেকে ৮০০-র বেশি দক্ষ আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মী ও ট্রেইন্ড ডগ স্কোয়াড ইতিমধ্যেই উপদ্রুত এলাকায় কাজ করছে। আরও প্রায় এক হাজার জরুরি উদ্ধারকর্মী পথেই রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গিয়েছে।

ভারতের পক্ষ থেকেও এই মানবিক সংকটের সময়ে ভেনেজুয়েলাকে সবরকম চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ত্রাণ পাঠানোর বিষয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারত ছাড়াও চীন, ব্রাজিল এবং রাজনৈতিক সংকটে দীর্ণ ইরান ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। অন্যদিকে ভাটিকান সিটির পোপ লিও চতুর্দশ ভেনেজুয়েলার মানুষের জন্য প্রাথমিকভাবে ১ লক্ষ ইউরো জরুরি আর্থিক সাহায্য পাঠিয়েছেন। রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ভেনেজুয়েলার এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন যে বিশ্ব সংস্থা দেশের সাধারণ মানুষের পুনর্বাসনের জন্য যথাসাধ্য কাজ করবে।

ভেনেজুয়েলা ভূমিকম্পের একনজরে পরিসংখ্যান

বিষয় বিবরণ ও সংখ্যা
ভূমিকম্পের তীব্রতা রিখটার স্কেলে ৭.২ এবং ৭.৫ তীব্রতার জোড়া ভূমিকম্প
নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯২০ জনেরও বেশি (সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা)
আহতের সংখ্যা ৩,৩৬০ জনের বেশি মানুষ চিকিৎসাধীন
আটকে থাকা মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৭২ জন এখনো নিখোঁজ বা বন্দি
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা লা গুয়াইরা, রাজধানী কারাকাস এবং ক্যাটিয়া লা মার

ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ডেলসি রদ্রিগেজের সরকারের জন্য এই বিপর্যয় এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষা। মার্কিন সশস্ত্র হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রাক্তন বামপন্থী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের পরপরই এই ধরনের ভয়াবহ দুর্যোগ রদ্রিগেজ প্রশাসনের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ত্রাণ বণ্টন তরান্বিত করতে প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বিদেশ সচিব মার্কো রুবিওর সাথে দীর্ঘ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেছেন এবং উদ্ধারকাজ সমন্বয়ের জন্য মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও চরম অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো এবং চিকিৎসাব্যবস্থা আগেই রুগ্ন হয়ে পড়েছিল। তার ওপর এই শতাব্দীর সবচেয়ে মারাত্মক জোড়া ভূমিকম্প দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এই মুহূর্তে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলির দ্বন্দ্ব ভুলে দ্রুত ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা এবং উপদ্রুত এলাকাগুলিতে মহামারী রোধ করাই হবে সর্বপ্রধান চ্যালেঞ্জ। ধ্বংসস্তূপের বুক চিরে ভেনেজুয়েলা আবার কবে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসবে, তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব হলেও লড়াই জারি রাখছেন দেশের সাধারণ মানুষ।

Previous post

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক মোড়! ইজরায়েল-লেবানন ঐতিহাসিক চুক্তি, তবুও কেন বাড়ছে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা?

Next post

South 24 Parganas News: বারবার বাঁধ দেওয়ার খরচ এবার অতীত, উত্তাল ঢেউ রুখতে ফলতায় মাস্টারস্ট্রোক! বছরের পর বছর নিশ্চিন্ত থাকবেন

Post Comment

You May Have Missed