মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক মোড়! ইজরায়েল-লেবানন ঐতিহাসিক চুক্তি, তবুও কেন বাড়ছে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা?

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক মোড়! ইজরায়েল-লেবানন ঐতিহাসিক চুক্তি, তবুও কেন বাড়ছে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা?

International

-Ritesh Ghosh

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এক বড়সড় কূটনৈতিক অগ্রগতি দেখা গেল। ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রশাসনের মধ্যস্থতায় একটি ত্রিপক্ষীয় রূপরেখা চুক্তি বা ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টে সই করেছে ইজরায়েল ও লেবানন। ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইজরায়েলি সেনার রক্তক্ষয়ী লড়াই বন্ধ করার লক্ষ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পর শুক্রবার এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মার্কিন বিদেশ মন্ত্রকের আয়োজিত এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও এবং লেবাননে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিশেল ইসা। লেবাননের পক্ষে রাষ্ট্রদূত নাদা মোয়াওয়াদ এবং ইসরায়েলের পক্ষে সে দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার এই ত্রিপক্ষীয় নথিতে সই করেন। চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ ‘ত্রিপক্ষীয় সামরিক সমন্বয় গোষ্ঠী’ গঠন করা হবে বলে জানা গেছে।

US officials witness historic Israel-Lebanon peace framework 2026

এই প্রক্রিয়াকে সফল করতে ওয়াশিংটন বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও সামরিক সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রসংঘের সঙ্গে সমন্বয় রেখে লেবাননে জরুরি মানবিক সহায়তার জন্য অবিলম্বে ১০ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়া হবে। এছাড়াও, সমগ্র লেবাননের ভূখণ্ডে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্রটির সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করতে আরও ৩ কোটি ডলারের বেশি আর্থিক প্যাকেজ দেওয়া হবে।

চুক্তি স্বাক্ষরের আগে মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব মার্কো রুবিও এই চুক্তিকে শান্তির পথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রারম্ভিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এটি একটি অত্যন্ত কঠিন ও জটিল যাত্রার শুরু মাত্র, তবে এই পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল। তার মতে, দীর্ঘ সংঘাতের অবসানের লক্ষ্যে এটি কেবল একটি শুভ সূচনা এবং আগামী দিনে দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রচুর কাজ করতে হবে।

চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন। নিজের কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই রূপরেখা চুক্তিটি দেশের ভূমি ও জনগণের ওপর লেবানন রাষ্ট্রের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার প্রথম ধাপ। এর ফলে বাস্তুচ্যুত লেবাননের নাগরিকেরা নিজেদের স্বাধীন ভূখণ্ডে ও নিজেদের পুনর্নির্মিত বসতবাড়িতে ফিরে যেতে পারবেন। তিনি আরও স্পষ্ট করে দেন যে, দেশের সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে অন্য কোনো শক্তির অংশীদারিত্ব মেনে নেওয়া হবে না।

একই রকম ইতিবাচক সুর শোনা গেছে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামের গলাতেও। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার শুরু হওয়ার শুভ মুহূর্তটির জন্য তিনি সাগ্রহে অপেক্ষা করছেন। এই সেনা প্রত্যাহারের পরেই যেন সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে দ্রুত পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা যেতে পারে, সেই দিকেই এখন মূল নজর থাকবে প্রশাসনের।

ইজরায়েলের পক্ষ থেকে এই চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক কূটনৈতিক বিজয় বলে দাবি করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইজরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার জানান, এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে বড় পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এটি একটি নতুন অধ্যায়। তার ভাষায়, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে ইরান ও হিজবুল্লাহর প্রভাব সীমান্ত অঞ্চল থেকে মুছে যাবে এবং ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ উন্মুক্ত হবে।

অন্যদিকে, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে একটি ‘বিরাট সাফল্য’ হিসেবে উল্লেখ করলেও বিতর্কিত অবস্থান বজায় রেখেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চল থেকে এখনই নিজেদের সেনা সরাবে না ইসরায়েল। যতক্ষণ না হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ হচ্ছে এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তা হুমকি দূর হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগত অবস্থানে ইসরায়েলি সেনার উপস্থিতি বজায় থাকবে।

নেতানিয়াহু আরও বলেন যে, ইজরায়েলি সেনা লেবাননের সেনাবাহিনীকে ওই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করার অনুমতি দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে লিটানি নদীর দক্ষিণে ও উত্তরে দুটি পাইলট জোন তৈরি করা হচ্ছে। তবে চুক্তি অনুযায়ী আপাতত দক্ষিণ লেবাননের বিতর্কিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া অসামরিক লেবাননের নাগরিকদের অবিলম্বে নিজেদের ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। ইরান জোরপূর্বক ইজরায়েলকে পিছু হঠাতে চেয়েছিল, তবে এই চুক্তি তাদের সেই প্রচেষ্টায় বড় আঘাত হানল।

এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছে লেবাননের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লা। গোষ্ঠীটির প্রভাবশালী সাংসদ হাসান ফাদলাল্লা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই চুক্তি লেবাননে একটি নতুন গৃহযুদ্ধের জন্ম দিতে পারে। ওয়াশিংটনের মদতে লেবাননের কর্তৃপক্ষ জোর করে এই চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ভেঙে পড়বে। তিনি স্পষ্ট জানান যে, প্রতিরোধ আন্দোলনের তথা হিজবুল্লার সম্মতি ছাড়া লেবাননে কোনো রাজনৈতিক সমাধান সফল হতে পারে না।

হিজবুল্লার দাবি, এই ওয়াশিংটন চুক্তি আসলে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পূর্বে আলোচনা হওয়া প্রাথমিক সমঝোতা বা ‘ইসলামাবাদ শান্তি প্রক্রিয়া’ ব্যাহত করার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এই তীব্র ভিন্নমতের মাঝে ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা রূপরেখা শেষ পর্যন্ত সীমান্ত অঞ্চলে কতটা শান্তি বয়ে আনবে, তা নিয়ে এখনও গভীর সংশয় রয়েছে ওয়াকিবহাল মহলে। কারণ দুই দেশের সেনার উপস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা চুক্তির বাস্তবায়নকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

Previous post

শোয়েব আখতারের দাদার শেষকৃত্যে হাজির লস্কর জঙ্গিরা, পহেলগাঁও হামলার মাস্টারমাইন্ডও? ভিডিও ভাইরাল

Next post

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় প্রাণের খোঁজে চলছে মরিয়া লড়াই, মৃত বেড়ে হাজারের কাছাকাছি

Post Comment

You May Have Missed