পরাশক্তি হিসাবে ভারতের উত্থানের অনুঘটক কী কী? গৌতম আদানি তুলে ধরলেন সংস্থার অনুষ্ঠানে
India
-Ritesh Ghosh
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে ভারতকে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে ‘পরিকাঠামো’ এবং ‘ইন্টেলিজেন্স’ বা প্রযুক্তিগত মেধাকে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। তাঁর মতে, এই দুই স্তম্ভই আগামী দিনে ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে এবং একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে দেশের অবস্থান মজবুত করবে।
মুম্বইয়ে আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেডের বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) বক্তব্য রাখার সময় গৌতম আদানি এই দূরদর্শিতার কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান, আধুনিক বিশ্বে পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত বুদ্ধিমত্তা আর দুটি ভিন্ন বিষয় নয়। বরং এই দুটি উপাদান এখন একে অপরের পরিপূরক এবং ভারতের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছিল এবং শক্তির নিরাপত্তা বা ‘এনার্জি সিকিউরিটি’ প্রতিটি দেশের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় হয়ে উঠেছিল। আদানি গ্রুপ এই বৈশ্বিক পরিবর্তনকে অনেক আগেই আঁচ করতে পেরেছিল এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল সাজিয়ে নিয়েছে।
আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান তাঁর বক্তৃতায় বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান সংকটের প্রতি নজর কাড়েন। তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক ফাটল চওড়া হচ্ছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল খণ্ডিত হয়ে পড়ছে। এই ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে কেবল সাধারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়, দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
গৌতম আদানি মনে করেন, প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান দখলের লড়াইয়ে এখন আর শুধু তীব্র আকাঙ্ক্ষাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত শক্তিশালী, সুরক্ষিত এবং সংযুক্ত পরিকাঠামোর উপস্থিতি। এই উন্নত পরিকাঠামোই দেশকে যেকোনো বৈশ্বিক চাপ থেকে মুক্ত রাখতে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে নিরাপদে পূরণ করতে সাহায্য করবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান প্রগতির যুগে পরিকাঠামো কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক সম্পদ নয়, এটি এখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার। শক্তির নিরাপত্তা এবং পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে পুরোপুরি স্বনির্ভরতা বজায় রাখতে পারলে বৈশ্বিক মঞ্চে ভারত নিজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তার করতে পারবে।
এছাড়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ প্রযুক্তির বিকাশের ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন ধরনের মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে। আদানির মতে, এই প্রযুক্তিগত লড়াই মোকাবিলা করার মতো ক্ষমতা নিশ্চিত করতে গেলে ভারতের নিজস্ব বড় আকারের পরিকাঠামো কাঠামো তৈরি করা সময়ের দাবি, যা দেশকে যেকোনো অর্থনৈতিক বা কারিগরি অবরোধ থেকে রক্ষা করবে।
আদানি গ্রুপের প্রধান শক্তি কোনও একটি নির্দিষ্ট ব্যবসার ক্ষেত্র বা একক বিনিয়োগের ওপর গড়ে ওঠেনি। বরং এটি গড়ে উঠেছে বিভিন্ন খাতকে একে অপরের সাথে নিখুঁতভাবে যুক্ত করার ক্ষমতার মাধ্যমে। খনি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, বণ্টন, বন্দর পরিচালনা, লজিস্টিকস, সড়ক নির্মাণ এবং জল পরিকাঠামো—সব কিছুতেই আদানির উপস্থিতি দৃশ্যমান।
বর্তমান ‘ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ডেটা সেন্টার এবং শক্তিসম্পদের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গৌতম আদানি জানান, বুদ্ধিদীপ্ত এই নতুন যুগের ডিজিটাল চাহিদা মেটাতে যে সমন্বিত পরিকাঠামোর প্রয়োজন, আদানি গ্রুপের কাছে তার প্রতিটি স্তর এবং নিখুঁত প্রযুক্তিগত পরিচালনা সক্ষমতা রয়ে গিয়েছে।
গোষ্ঠীটি এখন কেবল কাঁচামাল উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেই সম্পদকে নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা এবং ডেটা সেন্টারের মতো অত্যাধুনিক ডিজিটাল পরিকাঠামো পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। এই এন্ড-টু-এন্ড বা আদি-অন্ত সমন্বিত ক্ষমতা আদানিকে ভারতীয় বাজারে একটি অনন্য অবস্থানে নিয়ে গিয়েছে।
ডিজিটাল বিপ্লবকে সফল করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডেটা সেন্টার এবং ফুলফিলমেন্ট সেন্টারের মতো অত্যাধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। খনিজ সম্পদ লজিস্টিকসের মাধ্যমে দ্রুত পরিবহণের ব্যবস্থা করায় ভারতের শিল্প খাত লাভবান হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে দেশকে ডিজিটালাইজেশনের দৌড়ে অন্যান্য দেশের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে রাখছে।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মন্দা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের নানামুখী অস্থিরতার মধ্যেও আদানি গ্রুপ তাদের সম্প্রসারণের গতি মন্থর করেনি। যেখানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অনেক বড় বড় সামগ্রিক করপোরেট গোষ্ঠী বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছিল বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে আদানি গ্রুপ নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় অনড় থেকে উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে আদানি গ্রুপের দুর্দান্ত ব্যবসায়িক ফলাফল তাদের এই চারিত্রিক স্থিতিশীলতারই প্রমাণ দেয়। ভারতের আত্মনির্ভর হয়ে ওঠার স্বপ্নের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থকে সমান্তরালভাবে যুক্ত করে আদানি গ্রুপ দেশীয় শিল্পক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। এই দূরদর্শী অবস্থান দেশকে দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভরতা এনে দেবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ভারত সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের আধিপত্য বাড়ানোর যে বিশাল লক্ষ্য রয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই গোষ্ঠী কাজ করছে। বন্দর, সড়ক এবং গ্রিন এনার্জি খাতে তাদের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ ভারতের সামগ্রিক জাতীয় প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
পরিকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণের কাজ যদি সমান তালে এবং দ্রুত গতিতে চালানো না হয়, তবে বৈশ্বিক বাজারে ভারতের পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। গৌতম আদানি বিশ্বাস করেন, দেশের অগ্রগতির চাকা সচল রাখতে সরকারি নীতির গভীর সমর্থনে বেসরকারি উদ্যোগগুলোর অগ্রণী ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমান জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে আদানি গ্রুপের এই সমন্বিত ব্যবসায়িক মডেল ভারতের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। বিশ্ব দরবারে ভারতের ক্ষমতাকে তুলে ধরতে পরিকাঠামোর শক্তি ও ডিজিটাল প্রযুক্তির এই সহাবস্থান আগামী দিনে জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম সেরা দিশানির্দেশক হতে চলেছে।



Post Comment