ভারতের বিরুদ্ধে আয়ারল্যান্ডের ঐতিহাসিক জয়, অধিনায়কত্বের অভিষেক হার দিয়ে শুরু আইয়ারের
Cricket
-Ritesh Ghosh
বেলফাস্টের সিভিল সার্ভিস ক্রিকেট ক্লাবে রচিত হল আইরিশ ক্রিকেটের এক সোনালী অধ্যায়। টি২০ ফরম্যাটের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারতকে প্রথমবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কোনও ফরম্যাটে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল আয়ারল্যান্ড। সিরিজের প্রথম টি২০ ম্যাচে শ্রেয়স আইয়ারের নেতৃত্বাধীন টিম ইন্ডিয়া আইরিশদের কাছে ৩৪ রানে হেরেছে। এদিন ১৮৩ রানের বড় লক্ষ্যমাত্রা তাড়া করতে নেমে ভারতীয় দল মাত্র ১৪৮ রানেই অলআউট হয়ে যায়।
সদ্য সমাপ্ত টি২০ বিশ্বকাপ জয়ের পর সূর্যকুমার যাদবের উত্তরসূরি হিসেবে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার গুরুভার উঠেছে শ্রেয়াস আইয়ারের কাঁধে। কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে শ্রেয়সের অভিষেক ম্যাচ যে এমন দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে, তা ভারতীয় ক্রিকেট প্রেমীরা কল্পনাও করতে পারেননি। আয়ারল্যান্ডের ঘরের মাঠে এই নজিরবিহীন হার ভারতের নবীন ব্রিগেডের অনভিজ্ঞতাকে আরও একবার প্রকাশ্যে নিয়ে এল।

টসে জিতে আয়ারল্যান্ডকে প্রথমে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানায় ভারত। ম্যাচের শুরুতে ভারতীয় পেসারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে আইরিশ দল রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। ৬ ওভারের পাওয়ারপ্লে শেষে মাত্র ৩৬ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল আয়ারল্যান্ড। চোট কাটিয়ে দীর্ঘ দিন পর জাতীয় দলে ফেরা হর্ষিত রানা প্রথম স্পেলেই আইরিশ টপ অর্ডারকে জোর ধাক্কা দেন।
হর্ষিত তাঁর অতিরিক্ত বাউন্স এবং নিখুঁত সুইংয়ের সাহায্যে আইরিশ ব্যাটারদের ক্রমাগত সমস্যায় ফেলছিলেন। ওপেনার রস অ্যাডায়ারকে ফিরিয়ে শুরুটা করেছিলেন হর্ষিত, এরপর মারমুখী হতে চাওয়া টিম টেকটরকে প্যাভিলিয়নের পথ দেখান তিনি। হর্ষিতকে যোগ্য সঙ্গ দেন অর্শদীপ সিং। পাওয়ারপ্লেতে আয়ারল্যান্ডের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন-আপকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় পেসাররা।
কিন্তু শুরুর এই ধাক্কা সামলে দুর্দান্তভাবে ম্যাচে ফেরে আয়ারল্যান্ড। উইকেটের পিছন থেকে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করা লরকান টাকার এবং অলরাউন্ডার গ্যারেথ ডেলানি ভারতীয় বোলারদের ওপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন। টাকার শুরুতে কিছুটা ধীর গতিতে খেললেও, থিতু হওয়ার পরেই হাত খুলতে শুরু করেন। মাত্র ৩৫ বলে তিনি নিজের অর্ধশতক পূর্ণ করে দলের সংগ্রহকে লড়াকু জায়গায় পৌঁছে দেন।
ডেলানি অন্য প্রান্তে বিধ্বংসী মেজাজে ব্যাট করতে থাকেন। ব্যক্তিগত ৮ রানের মাথায় একটি লাইফলাইন পাওয়ার পর তিনি ভারতীয় স্পিনার ও পেসারদের ঘুম উড়িয়ে দেন। বিশেষ করে ভারতীয় পেসার প্রসিদ্ধ কৃষ্ণর এক ওভারে তিনটি ছক্কা হাঁকিয়ে ডেলানি দলের স্কোরবোর্ডকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩২ বলে ৪৯ রানের এক ঝোড়ো ইনিংস খেলে মাঠ ছাড়েন তিনি।
অন্যদিকে ভারতের স্পিনার ওয়াশিংটন সুন্দর এবং পেসার প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ এদিন চরম ব্যর্থ হন। মূলত ১৬তম এবং ১৭তম ওভারে আয়ারল্যান্ডের ব্যাটাররা রীতিমতো ঝড় তোলেন। সুন্দরের এক ওভারে ১৯ রান এবং প্রসিদ্ধের ৪ ওভারে ৫৭ রান দেওয়ায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাত থেকে ফস্কে যায়। তবে হর্ষিত রানা মাত্র ২৪ রান দিয়ে ৩টি উইকেট নিয়ে ভারতের সফলতম বোলার ছিলেন।
১৮৩ রানের লক্ষ্যমাত্রা তাড়া করতে নেমে ভারতের ইনিংসের শুরুতেই ব্যাট হাতে তাণ্ডব শুরু করেন তরুণ ওপেনার অভিষেক শর্মা। সঞ্জু স্যামসন দ্রুত বিদায় নিলেও অভিষেক আইরিশ বোলারদের দাপট ম্লান করে দেন। মাত্র ১৯ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন তিনি। এটি পূর্ণ সদস্য দেশের ব্যাটারদের মধ্যে দ্রুততম টি২০ ফিফটি করার পঞ্চম নজির। পাওয়ারপ্লে শেষে ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ৬৮ রান।
তবে এক প্রান্ত থেকে অভিষেক ঝড় তুললেও, অন্য প্রান্তের ব্যাটাররা তার ফায়দা তুলতে পারেননি। বাঁহাতি ব্যাটার ইশান কিষাণ মাত্র ১ রান করে সাজঘরে ফেরেন। অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ারের অফ-ফর্ম এদিনও অব্যাহত ছিল। মাত্র ৩ রান করে অভিষেক ম্যাচেই লিয়াম ম্যাককার্থির বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। অভিষেক যখন ২০ বলে ৫০ রান করে প্যাভিলিয়নে ফেরেন, ভারতের জয়ের আশা বড় ধাক্কা খায়।
অভিষেকের আউটের পরেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে টিম ইন্ডিয়ার মিডল অর্ডার। ৮০ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর প্রয়োজনীয় রান রেট ভারতের হাতের মুঠোয় ছিল। তবে মিডল অর্ডারে দায়িত্ব নেওয়ার মতো কারও দেখা মেলেনি। রিভার্স সুইপ মারতে গিয়ে তিলক বর্মা মাত্র ১৯ রানে উইকেট উপহার দিয়ে আসেন। এরপর ওয়াশিংটন সুন্দরও ৯ রান করে আইরিশ পেসার হোলার্ডের শিকার হন।
নিজের জন্মদিনে অলরাউন্ডার শিবম দুবে দুটি পেল্লায় ছক্কা সহযোগে ২৫ রান করে কিছুটা আশা জাগিয়েছিলেন। তবে আয়ারল্যান্ডের হয়ে অভিষেক ঘটানো বোলার জয় মুন্দ্রার বলে তিনি ক্যাচ আউট হতেই ভারতের সব আশা শেষ হয়ে যায়। বল হাতে প্রথম দিকে ব্যর্থ হওয়ার পর ব্যাট হাতেও দলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হাল ধরতে পারলেন না অলরাউন্ডার অক্ষর প্যাটেল। তিনি ১৫ রান করে প্যাভিলিয়নে ফেরেন।
আইরিশ বোলারদের নিয়ন্ত্রিত স্পিন ও মিডিয়াম পেসের যুগলবন্দিতে ভারতের ব্যাটিং লেজ দ্রুত গুটিয়ে যায়। শেষ দিকে হর্ষিত রানা একটি ছক্কা মেরে ব্যবধান কমালেও তা কেবল পরাজয়ের ব্যবধান কমাতেই সাহায্য করেছে। শেষ পর্যন্ত ১৮.৫ ওভারে ১৪৮ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছে ভারত। আয়ারল্যান্ডের পক্ষে ম্যাট হোলার্ড এবং ম্যাথু হামফ্রেস নিখুঁত বোলিং করে ভারতকে রুখে দেন।
পল স্টার্লিং এবং মার্ক অ্যাডায়ারের মতো অভিজ্ঞ এবং নিয়মিত তারকাদের অনুপস্থিতিতেও আইরিশদের এই জয় প্রশংসার দাবি রাখে। অনভিজ্ঞ এক দল নিয়ে যেভাবে তারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের পর্যুদস্ত করল, তা বিশ্ব ক্রিকেটে অবশ্যই এক বড়সড় চমক।



Post Comment