হাইকোর্টে বড় স্বস্তি ঋতব্রতর, বিরোধী দলনেতার পদে আইনি লড়াইয়ে ধাক্কা খেল ‘কালীঘাটের তৃণমূল’ শিবির

হাইকোর্টে বড় স্বস্তি ঋতব্রতর, বিরোধী দলনেতার পদে আইনি লড়াইয়ে ধাক্কা খেল ‘কালীঘাটের তৃণমূল’ শিবির

West Bengal

-Ritesh Ghosh

কলকাতা হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশে স্বস্তি পেলেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ শিবিরের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। স্পিকার রথীন্দ্র বোসের সিদ্ধান্তকে বহাল রেখে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও জানিয়ে দিয়েছেন, বিক্ষুব্ধ শিবিরের সিদ্ধান্তে আদালত আপাতত কোনও হস্তক্ষেপ করবে না। এর ফলে রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে আর কোনও আইনি বাধা রইল না। এই রায়কে রাজনৈতিকভাবে ‘কালীঘাট তৃণমূল’ তথা অফিশিয়াল শিবিরের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তৃণমূলের ‘অফিশিয়াল’ শিবিরের পরিষদীয় নেতা তথা বর্ষীয়ান বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের দায়ের করা মামলাতেই এই নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। শোভনদেববাবু স্পিকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার আদালত তাঁর আবেদন খারিজ করে দেওয়ায় বিধানসভায় বিরোধী শিবিরের চালিকাশক্তি হিসেবে ঋতব্রতবাবুর অবস্থান আরও মজবুত হল। তবে এই আইনি লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে না; আগামী জুলাই মাসে এই মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে।

Ritabrata Banerjee addresses assembly following major court victory

এই আইনি জট ও দলীয় দ্বন্দ্বের সূত্রপাত সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর থেকেই। ফল ঘোষণার পর বিধানসভায় পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচন ঘিরে চরম বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, সই জালিয়াতি করে দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল। এই ঘটনায় চরম ক্ষোভপ্রকাশ করে দলের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দলনেত্রীর ঘনিষ্ঠ বৃত্ত তথা কালীঘাট গোষ্ঠীর তরফে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

কিন্তু দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও বিধানসভার রণাঙ্গনে সমীকরণ অন্য মোড় নেয়। তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের অধিকাংশেরই সমর্থন চলে যায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের সই নিয়ে তাঁরা স্পিকারের কাছে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে তুলে ধরেন। বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোস এই আবেদনকেই মান্যতা দেন এবং ঋতব্রতবাবুকে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দেন। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরেই আইনি লড়াইয়ে নামে কালীঘাট শিবির, যা বৃহস্পতিবার বড় ধাক্কা খেল।

হাইকোর্টের এই নির্দেশের সুবাদে ঋতব্রতর পাশাপাশি অন্যান্য বিক্ষুব্ধ বিধায়করাও স্বস্তিতে। উপ-দলনেতা হিসেবে শিউলি সাহা এবং জাভেদ খান কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। একইসঙ্গে মুখ্য সচেতকের দায়িত্ব সামলাবেন আখরুজ্জামান। আদালতের রায়ের পর উচ্ছ্বসিত সন্দীপন সাহা বলেন, “স্পিকারের পর হাইকোর্টও আমাদের স্বীকৃতি দিল। আমরা নিয়ম মেনেই সব করেছি এবং দায়িত্ব পালন করব।”

এই রুদ্ধশ্বাস আইনি ও রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেই রাজ্য বিধানসভায় শুরু হচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত বাজেট অধিবেশন। রাজ্যপাল আর. এন. রবির প্রথাগত ভাষণের মধ্য দিয়ে এই অধিবেশনের সূচনা হতে চলেছে। রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বাজেট অধিবেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে, কারণ এবারই রাজ্যের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করবেন নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। আগামী ২২ জুন তিনি বিধানসভায় এই বাজেট পেশ করবেন বলে জানা গিয়েছে।

তবে এবারের বিধানসভা অধিবেশনের মূল আকর্ষণ হতে চলেছে কক্ষের ভেতরের আসন বিন্যাস। রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত স্তরে তীব্র বৈরিতা থাকলেও, সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঠিক পাশেই বসতে চলেছেন কালীঘাট তৃণমূলের অন্যতম বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বিধানসভা সচিবালয়ের সূত্র মারফত এমনটাই জানা গিয়েছে। শোভনদেব ও ঋতব্রতর এই পাশাপাশি অবস্থান অধিবেশন চলাকালীন কক্ষে বাড়তি উত্তেজনা ছড়াবে বলেই অনুমান করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্কিত লড়াই কেবল সই জালিয়াতি বা পদ দখলের সাধারণ বিবাদ নয়, এটি আসলে সংগঠনের অন্দরে ক্ষমতার মেরুকরণের গভীর লড়াই। দীর্ঘদিন ধরে দলের অভ্যন্তরে যে অসন্তোষ তিলতিল করে দানা বেঁধেছিল, নির্বাচন পরবর্তী পরাজয়ের ধাক্কায় তা প্রকাশ্য বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে। ঋতব্রত ও তাঁর অনুগামীরা যেভাবে নিজেদের পরিষদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিয়েছেন, তাতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্ব আজ বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

আগামী জুলাই মাসে হাইকোর্টে যখন এই মামলার দীর্ঘমেয়াদি শুনানি শুরু হবে, তখন দু’পক্ষই নিজেদের স্বপক্ষে আরও জোরালো সওয়াল পেশ করবে। আপাতদৃষ্টিতে ঋতব্রত শিবিরের পক্ষে আদালতের এই অন্তবর্তী নির্দেশ এক বড় মনস্তাত্ত্বিক জয় এনে দিল। বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলনেতা হিসেবে তিনি কতটা আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিতে পারেন এবং সরকারি পক্ষ কীভাবে তাঁর এই অবস্থানের মোকাবিলা করে, সেটাই এখন রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে বড় কৌতূহলের বিষয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্ট বা উচ্চ আদালতের অন্যান্য বেঞ্চে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়রা নতুন আবেদন জানান কি না, তা-ও দেখার বিষয়। তবে এই মুহূর্তে বিধানসভায় বাজেট অধিবেশন চলাকালীন পরিষদীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ঋতব্রত শিবিরের অবস্থানই সবচেয়ে মজবুত রইল। অন্যদিকে, বাজেট পেশের আগে রাজ্য সরকারের আর্থিক পরিকল্পনা ও জনমোহিনী নীতির পাশাপাশি আইনসভার ভেতরে ক্ষমতার এই ঐতিহাসিক দ্বৈরথ রাজ্য রাজনীতিকে এক নতুন সমীকরণের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।

Post Comment

You May Have Missed