রেল স্টেশনের হকার উচ্ছেদে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ কলকাতা হাইকোর্টের
West Bengal
-Ritesh Ghosh
কলকাতা হাইকোর্টের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশে মহকুমা ও শহরতলি এলাকার রেল হকারদের আইনি লড়াইয়ে বড় জয় এল। রেল কর্তৃপক্ষের জারি করা উচ্ছেদ নোটিসের ওপরে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করল উচ্চ আদালত। বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্য এদিন নির্দেশ দিয়েছেন, বালিগঞ্জ, যাদবপুর, বারুইপুর, ডানকুনি, বনগাঁ এবং গুমার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলিতে জুন মাস পর্যন্ত রেলের তরফে যে সমস্ত উচ্ছেদ নোটিস দেওয়া হয়েছিল, তার কোনওটিই আপাতত কার্যকর করা যাবে না।
এই স্থগিতাদেশের ফলে রাজ্যের কয়েক হাজার হকার ও তাঁদের পরিবারের রুটিরুজির অধিকার আপাতত সুরক্ষিত হল। আকস্মিক উচ্ছেদের আশঙ্কায় ভুগতে থাকা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত এক বিরাট স্বস্তি। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, জীবিকার অধিকার মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার এবং আইনি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না করে কাউকেই উচ্ছেদ করা যাবে না। বিশেষত বৈধ নথিপত্র থাকা হকারদের ক্ষেত্রে রেলকে সংবেদনশীল হতেই হবে।

মামলাকারীদের পক্ষে বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আদালতে অত্যন্ত জোরালো সওয়াল করেন। তিনি সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে জীবনের অধিকার এবং জীবিকা অর্জনের অধিকারের বিষয়টিকে আদালতের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভারত সরকার বা রাজ্য সরকার কেউই এই অতি প্রয়োজনীয় অধিকারকে সাধারণ নাগরিকের জীবন থেকে কেড়ে নিতে পারে না। সমাজের সবথেকে অনগ্রসর ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের মৌলিক অধিকারকে অযৌক্তিক কারণে কখনওই খর্ব করা যায় না।
আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য আরও যুক্তি দেন যে, স্বাধীন রাষ্ট্র কখনই নিজের দেশের নাগরিকদের সঙ্গে শত্রুতামূলক আচরণ করতে পারে না। ঠেলা গাড়ি চালিয়ে বা স্টেশনে সামান্য ছোট দোকান দিয়ে যাঁরা সংসার চালান, তাঁদের ওপর চরম প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা কোনও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না। কোনও নোটিস ছাড়াই হঠাৎ করে বুলডোজার পাঠিয়ে দরিদ্র হকারদের দোকানপাট ভেঙে ফেলা মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।
রেলের জমি খালি করার প্রক্রিয়াটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট কিছু রায়ের প্রসঙ্গও আদালতে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কেউ যদি দশকের পর দশক ধরে কোনো জায়গায় বসবাস করেন বা ব্যবসা চালান, তবে তাঁদের রাতারাতি তাড়িয়ে দেওয়া বেআইনি। রাজ্য পুলিশের সংগঠন তৈরি সংক্রান্ত অতীতে ঘটে যাওয়া একটি পুরোনো মামলার রায়ের যুক্তিও তিনি এই হকারদের মামলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করেন।
আদালতে অন্য মামলাকারীদের পক্ষে সওয়ালরত আইনজীবী ফিরদৌস শামিমও একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যাত্রী সুরক্ষার কথা সামনে এনে রেল বহু পুরোনো লাইসেন্সধারী হকারদের বেআইনিভাবে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বারুইপুর স্টেশনের ১৯৯৫ সাল থেকে লাইসেন্স থাকা ৪০টি পরিবারকে সম্প্রতি পুনর্বাসন ছাড়াই উচ্ছেদের নোটিস ধরানো হয়েছে। ডানকুনির ৩২টি পরিবারকে যে নোটিস দেওয়া হয়েছে, তাতে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর পর্যন্ত ছিল না।
অপরদিকে, রেলের পক্ষে আদালতে উপস্থিত আইনজীবী ধীরাজ ত্রিবেদী হকার উচ্ছেদকে আইনসম্মত ও জনস্বার্থের প্রয়োজনে করা হচ্ছে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম এবং মূল রেললাইন লাগোয়া এলাকায় হকারদের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে নিত্যযাত্রীদের নিরাপত্তা চরম বিঘ্নিত হচ্ছে। প্ল্যাটফর্ম দখল করে দোকানদারির ফলে যাতায়াতের পথ রুদ্ধ হচ্ছে। প্রাচীন কিছু জমি অধিগ্রহণ নিয়মের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় বকেয়া মেটানোর সুযোগ দিলেও তা করা হয়নি।
উভয় পক্ষের যুক্তি শুনে বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্য পুরো পরিস্থিতি বিশদ পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বলেন, রেলের স্টেশনে যাতে যাত্রীদের অসুবিধা না হয়, তা দেখার দায়িত্ব অবশ্যই রেলের। রেলের সম্পত্তি জবরদখল মুক্ত করার এক্তিয়ার রেলের আছে, কিন্তু বৈধ হকারদের জোর করে সরিয়ে দেওয়া যায় না। যদি কোনও হকারকে রেল নিজে থেকেই স্টলের বরাদ্দ করে থাকে, তবে তাঁদের তো আর এভাবে বেআইনি নোটিস দিয়ে উচ্ছেদ করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
আইনি প্রক্রিয়া ও মানবিক দৃষ্টিকোণ খতিয়ে দেখে হাইকোর্ট শেষ পর্যন্ত রেলের উচ্ছেদ অভিযানের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করার পাশাপাশি রেল কর্তৃপক্ষের কাছে এই নিয়ে সামগ্রিক রিপোর্ট তলব করেছে। বিচারপতি নির্দেশ দিয়েছেন, কোন এলাকায় ঠিক কতজন লাইসেন্সধারী এবং বৈধ হকার রয়েছেন, তাঁদের সঠিক পরিসংখ্যান আদালতে জমা দিতে হবে। রেলের তরফে বৈধ ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন দিতে তাদের কোনও বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে কিনা, তা রিপোর্টে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।



Post Comment