আরজি কর কাণ্ডের তদন্তে পানিহাটি শ্মশানে সিবিআই, কোন তথ্য হাতে পেলেন গোয়েন্দারা?

আরজি কর কাণ্ডের তদন্তে পানিহাটি শ্মশানে সিবিআই, কোন তথ্য হাতে পেলেন গোয়েন্দারা?

West Bengal

-Ritesh Ghosh

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্তে নতুন করে গতি এনেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (সিবিআই)। ২০২৪ সালের সেই অভিশপ্ত ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে এবার তদন্তকারীরা পৌঁছে গেলেন উত্তর চব্বিশ পরগনার পানিহাটি শ্মশানঘাটে। সিবিআই-এর একটি বিশেষ দল সেখানে গিয়ে ঘটনার রাতের নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান খতিয়ে দেখে।

২০২৪ সালের ৯ অগাস্ট রাতে নির্যাতিতার মরদেহ পানিহাটি শ্মশানেই দাহ করা হয়েছিল। ঘটনার পর থেকেই মৃতার পরিবারের অভিযোগ ছিল, অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছিল। সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল এবং সৎকারের প্রক্রিয়ায় কোনও অস্বাভাবিকতা বা নিয়মের ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতেই এই পদক্ষেপ সিবিআইয়ের।

CBI officials inspecting document records at Panihati burning ghat

সিবিআই গোয়েন্দারা পানিহাটি শ্মশানের অফিসে গিয়ে অনেকক্ষণ অনুসন্ধান চালান। ঘটনার দিনের রেজিস্টার খাতা ও শ্মশানের নথিপত্র পরীক্ষা করার পাশাপাশি সেদিনের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গোয়েন্দারা মূলত জানার চেষ্টা করেছেন, মৃতদেহ দ্রুত দাহ করার জন্য কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের পক্ষ থেকে কোনও চাপ বা নির্দেশিকা ছিল কিনা।

আরজি কর মামলার তদন্ত নতুন করে শুরু হতেই একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতে শুরু করেছে। রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেই আরজি কর কাণ্ডের পুরনো ফাইল আবার খুলেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, এই জঘন্য কাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্তের খাতা খোলা হবেই এবং তারই ফলস্বরূপ রাজ্য পুলিশ ও সিবিআই আরও সক্রিয় হয়েছে।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত তথ্যপ্রমাণ লোপাট এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ইতিমধ্যেই রাজ্য পুলিশের তিন উচ্চপদস্থ আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। সিবিআই-এর বিশেষ তদন্তকারী দল এখন খতিয়ে দেখছে যে, ঘটনার আদি পর্বে কারা তদন্তের দিক ভুল চালিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এর পিছনে কোনও বড় চক্র কাজ করছিল কিনা, তা চিহ্নিত করাই এখন মূল লক্ষ্য।

সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশের পর আবারও নতুন করে তদন্তে ঝাঁপিয়েছে সিবিআই। গত সোমবার সিবিআই-এর পূর্বাঞ্চলীয় যুগ্ম অধিকর্তা রাজেশ প্রধানের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি শক্তিশালী তদন্তকারী দল সরাসরি আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে যান। তাঁরা সেখানে গিয়ে ঘটনার দিন ও রাতের আগের নানা নথি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মীর সঙ্গে কথা বলেন।

হাসপাতালের তদন্তের পরদিনই পানিহাটি শ্মশানঘাটে সিবিআই-এর হানা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কলকাতার তদন্তকারী মহল। নির্যাতিতার পরিবার শুরু থেকেই অভিযোগ তুলে আসছে যে, ঘটনার দিন রাতে তাঁদের না জানিয়ে এবং চরম তাড়াহুড়ো করে মেয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করানো হয়েছিল। এমনকী মেয়ের নিথর দেহটি ভালো করে দেখার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি বলে তাঁদের দাবি ছিল।

অভয়ার মা তথা পানিহাটির বিজেপি বিধায়িকা রত্না দেবনাথের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন তাঁরা যখন আরজি করের চারতলায় সেমিনার রুমে পৌঁছেছিলেন, তখন সেখানে কোনও অপরাধের প্রত্যক্ষ চিহ্ন মেলা কঠিন ছিল। এই দাবিতে সায় দিচ্ছে খোদ সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি বা সিএফএসএল-এর রিপোর্টও।

পরিবারের লোকজনের দাবি, সিএফএসএল রিপোর্ট স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করেছে যে সেমিনার রুমে আসল অপরাধটি ঘটেইনি। তাঁদের অনুমান, তরুণী চিকিৎসককে হাসপাতালের অন্য কোনও নির্জন জায়গায় আগে খুন করা হয়েছিল। তারপর অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় তাঁর নিথর দেহটিকে এনে চারতলার সেমিনার রুমে ফেলে রাখা হয়, যাতে মূল অপরাধের জায়গাটিকে চিহ্নিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

রত্না দেবনাথ ক্ষোভের সঙ্গে আরও জানান যে, যখন তাঁরা মৃতদেহটি প্রথম দেখেন, তখন চিকিৎসকের মুখে একাধিক ভারী আঘাতের ক্ষত ছিল এবং গলায় স্পষ্ট আঙুলের চাপের দাগ ছিল। অথচ, সেসময় যাঁরা ময়নাতদন্তের দায়িত্ব সামলেছিলেন, তাঁরা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক চিহ্নগুলিকে কেন এড়িয়ে গেলেন এবং কেন সেগুলিকে তদন্তের আওতায় আনা হয়নি, তা নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ পরিবার।

এই সমস্ত ধোঁয়াশা ও সন্দেহের উত্তর খুঁজতে পানিহাটি শ্মশানের ভূমিকা সিবিআই-এর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গোয়েন্দারা জানতে চাইছেন, সৎকারের সময় শ্মশানের কর্মীরা মৃতদেহের গায়ে বা মুখে কোনও অস্বাভাবিক ক্ষত দেখতে পেয়েছিলেন কিনা। কে বা কারা সেদিন সৎকারের দায়িত্বে ছিলেন এবং সৎকার সম্পন্ন করার জন্য কাগজে সই কে করেছিলেন, সেটাও তদন্ত করা হচ্ছে নতুনভাবে।

ইতিমধ্যেই সিবিআই শ্মশানের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিস্তারিত জবানবন্দি নথিভুক্ত করেছে। সেই রাতের সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল টাওয়ার লোকেশন খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে। কে বা কারা সেদিন সৎকার তাড়াতাড়ি করার জন্য শ্মশান অফিসে সরাসরি বা ফোনে প্রভাব খাটিয়েছিলেন, সিবিআই সেই কল লিস্ট ও কথোপকথনের রেকর্ড সংগ্রহের চেষ্টা করছে। সিবিআই মনে করছে, নতুন করে তদন্তে নতুন তথ্য উন্মোচিত হবে।

Post Comment

You May Have Missed