ওমানের সমুদ্রে মৃত ভারতীয় নাবিকের দেহ উদ্ধারে হাহাকার, করুণ আর্তি, কেন্দ্রের সমালোচনায় কংগ্রেস
International
-Ritesh Ghosh
ওমানের দুকম বন্দরের কাছে সমুদ্রবক্ষে আটকে থাকা একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে এক ভারতীয় নাবিকের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত নাবিকের নাম নিশান্ত উর্থনাথন এবং তিনি তামিলনাড়ুর বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ‘এমটি সেলেস্টিয়াল’ নামক জাহাজে সেকেন্ড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ১১ জুন আকস্মিক শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওই জাহাজের কেবিনেই তাঁর মৃত্যু ঘটে বলে খবর মিলেছে।
বিপত্তি ঘটেছে মৃত্যুর পর নাবিকের মৃতদেহ সংরক্ষণ করা নিয়ে। বর্তমানে ওমান উপকূলের কাছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আটকে রয়েছে ওই নির্দিষ্ট জাহাজটি। সেখানে প্রয়োজনীয় কোনো বরফ বা কোল্ড স্টোরেজের সুবিধা নেই। অগত্যা নিশান্তর মৃতদেহ পচন থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা করতে ওই জাহাজের অন্যান্য ক্রু সদস্যরা প্রতিনিয়ত বোতলজাত ঠান্ডা জল ব্যবহার করে চলেছেন। মৃতদেহটি এভাবে নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর শেষ মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন তাঁরা।

ওই জাহাজের ক্যাপ্টেন একটি মর্মস্পর্শী ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে সাহায্যের হাত বাড়ানোর কাতর আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর অভাবে তাঁরা চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। মৃত সহকর্মীর প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শনের স্বার্থে দ্রুত এই মৃতদেহটি উদ্ধার করা প্রয়োজন। যদি দ্রুত কোনো সমাধান না মেলে, তবে দেহটি পচে যেতে শুরু করবে, যা জাহাজের অন্যান্য বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের পক্ষেও মারাত্মক হতে পারে।
বিরোধী কংগ্রেসও এই নিয়ে এক্স পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। অযোগ্য প্রধানমন্ত্রী মোদীর চেয়ারে থাকার মূল্য চোকাচ্ছেন ভারতবাসীরা। এমনই বলেছে কংগ্রেস।
এই কঠিন পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে ভারতীয় কূটনৈতিক মহল নড়েচড়ে বসেছে। ওমানের মাস্কাটে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস এই পুরো বিষয়টি গভীরভাবে তদারকি করছে। ওমানি দূতাবাস জানিয়েছে, মৃত নিশান্তের দেহটি যাতে দ্রুততম উপায়ে এবং কোনো জটিলতা ছাড়াই সরাসরি ভারতে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো যায়, তার জন্য কূটনৈতিক স্তরে সব রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তাঁরা মৃতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সম্পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছেন।
ओमान में फंसे जहाज पर 11 जून को भारतीय सेकंड ऑफिसर निशांत उर्थनाथन की मौत हो गई।
पिछले 2-3 दिनों से उनका पार्थिव शरीर हिंदुस्तान आने की राह देख रहा है, लेकिन मोदी सरकार की तरफ से कोई मदद नहीं की जा रही।
उनका शव सड़ रहा है, जिसे बचाने के लिए उनके साथी पानी की ठंडी बोतलों का… pic.twitter.com/7mHYbXlFGB
— Congress (@INCIndia) June 14, 2026
দূতাবাসের এক পদস্থ মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, তাঁরা বর্তমানে সেই কোম্পানির সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ রাখছেন যারা এই বিশিষ্ট সামুদ্রিক জাহাজটি পরিচালনা করে থাকে। এই মানবিক সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য সমস্ত অংশীদারদের সঙ্গে একযোগে সমন্বয় সাধন করা হচ্ছে। লাল ফিতের ফাঁস এড়িয়ে মৃতদেহটি দেশে পাঠানোর চূড়ান্ত অনুমতির জন্য ওমান সরকারের প্রশাসনিক ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও বিশেষ স্তরে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
বাস্তবিক অর্থে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং সামরিক সংঘাতের খেসারত দিতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক জাহাজে কর্মরত হাজার হাজার ভারতীয় নাবিককে। এই সামুদ্রিক কর্মীরা কোনো রকম যুদ্ধ বা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চরম বিপদের মুখে পড়ছেন। হরমুজ প্রণালী ও তার সংলগ্ন আরব সাগর উপত্যকায় এই মুহূর্তে প্রায় ২০ থেকে ২৩ হাজার সামুদ্রিক কর্মী ভয়াবহ জীবন সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আটকে পড়া নাবিকদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ ভারতীয় নাগরিক হওয়ায় নয়াদিল্লির ওপর চাপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওই অঞ্চলে নোঙর করে থাকা শত শত মালবাহী জাহাজ ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার কারণে মাসের পর মাস এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ কিছু জাহাজের ওপর ইতিমধ্যে প্রাণঘাতী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও চালানো হয়েছে। এই অনিশ্চয়তার জেরে নাবিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সংস্থান প্রবলভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ইরানের ওপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপানোর পরেই মূলত আরব সাগরের বুকে সামরিক উত্তেজনা বহুগুণ বেড়ে যায়। কিছুদিন আগে আমেরিকা ও ইজরায়েলি বাহিনীর নানা আগ্রাসী অভিযানের প্রতিবাদ হিসেবে ইরান প্রশাসন হড়মুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। দুই দেশের মধ্যকার শান্তি আলোচনা সম্পূর্ণভাবে ভেস্তে যাওয়ার পরেই এই জলপথ মারাত্মক রূপ ধারণ করে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই নির্দিষ্ট সামুদ্রিক অঞ্চলে তাদের রণতরী মোতায়েন রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমেরিকার এই কঠোর নৌ-অবরোধের কারণে সামুদ্রিক পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সমগ্র বিশ্ববাজারে যেমন পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটেছে, তেমনই তা সাধারণ নাবিকদের জন্য চরম সংকটের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণেই ওমান সীমান্তে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় জাহাজ দীর্ঘদিন ধরে নোঙর করতে বাধ্য হচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করে যখন বিশ্বস্ত সূত্রের খবর আসে যে, মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ অভিযানের সময় এই সপ্তাহে সরাসরি তিনটি ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজকে নিশানা করা হয়েছিল। এই অনভিপ্রেত ও আকস্মিক হামলার ফলে আরও তিনজন কর্মরত ভারতীয় নাবিক নির্মমভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। এই আন্তর্জাতিক নৌপথে ঘন ঘন সংঘর্ষ এবং সামরিক উপস্থিতির কারণে বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলি চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের কাজ পরিচালনা করছে।
জাহাজে আটকে পড়া অন্যান্য ক্রু সদস্যদের অবিলম্বে উদ্ধার করতে এবং মৃত নৌসেনাদের দেশে ফেরাতে রাষ্ট্রপুঞ্জের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন অনেকে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলিও এই এলাকায় সৃষ্টি হওয়া চরম মানবিক সংকট দূরীকরণের জন্য বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলির কাছে যুদ্ধবিরতি ও নিরাপদ করিডোর প্রদানের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। ওমানের দুকম বন্দরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে সমস্যা আরও বড় আকারে ধারণ করতে পারে।
ওমান উপকূলে ঘটে যাওয়া এই বেদনাদায়ক ঘটনা এবং সহকর্মীদের বাঁচানোর করুণ আর্তি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের নজর কেড়েছে। তামিলনাড়ুর বাসিন্দা নিশান্ত উর্থনাথনের অকাল মৃত্যু এবং তাঁর মরদেহ ফিরিয়ে আনার এই লড়াই বর্তমান আন্তর্জাতিক সংঘাতের রুক্ষ বাস্তবকে সকলের সামনে তুলে ধরেছে। এখন ভারত সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং কূটনৈতিক উদ্যোগই পারে নিষ্পাপ ভারতীয়দের এই বন্দিদশা থেকে রেহাই দিয়ে স্বদেশে সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে।



Post Comment