হোয়াটসঅ্যাপের ‘ইউজারনেম’ ফিচার সুরক্ষা ও গোপনীয়তায় কত বড় চ্যালেঞ্জ?
Business
-Ritesh Ghosh
হোয়াটসঅ্যাপে অবশেষে আসতে চলেছে অন্যতম বহুল প্রতীক্ষিত ‘ইউজারনেম’ ফিচার। এতদিন পর্যন্ত এই চ্যাটিং অ্যাপে কারও সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে বা গ্রুপে যুক্ত হতে ফোন নম্বর শেয়ার করা ছাড়া কোনও দ্বিতীয় পথ ছিল না। মেটার মালিকানাধীন এই অ্যাপের নয়া সিদ্ধান্তের ফলে এখন ব্যবহারকারীরা নিজেদের ফোন নম্বর গোপন রেখেই কেবল নাম দিয়ে একে অপরের সঙ্গে চ্যাট করতে পারবেন।
তবে এই নতুন পরিবর্তনটি বাজারে আসার ঘোষণার পরেই প্রযুক্তি জগতে এক বড়সড় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের মতো দেশে, যেখানে হোয়াটসঅ্যাপ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে এই ফিচারের কার্যকারিতা এবং সুরক্ষা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা খতিয়ে দেখছেন, ফোন নম্বরের তুলনায় এই ইউজারনেম আইডি কতটা নিরাপদ ও কার্যকর হতে পারে।

আমাদের দেশে একটি মোবাইল নম্বর কেবল পরিচিতির মাধ্যম নয়, এর সঙ্গে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সংবেদনশীল ডেটা যুক্ত রয়েছে। ফোন নম্বর সরাসরি লিঙ্ক থাকে সরকারি আধার কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ইউপিআই পেমেন্ট অ্যাপ এবং নানা সরকারি সুযোগ-সুবিধার পোর্টালের সঙ্গে। ফলে যেকোনও অপরিচিতের কাছে নিজের নম্বর প্রকাশ করার অর্থ হল নিজের গোপন ডিজিটাল চাবিকাঠি হস্তান্তর করা।
প্রতিদিনের জীবনে আমাদের এমন অনেক পরিস্থিতিতে পড়তে হয় যেখানে বাধ্য হয়েই অপরিচিত মানুষদের সঙ্গে চ্যাট করতে হয়। যেমন—সন্তানের স্কুলের অভিভাবক গ্রুপ, পাড়ার আবাসন সমিতি, সাময়িক কোনও দরকারি কাজ বা অফিশিয়াল নেটওয়ার্কিং মিটিং। এতদিন এই সব ক্ষেত্রে ফোন নম্বর শেয়ার করতে হতো। কিন্তু ইউজারনেম এলে এই জটিলতা অনেকটাই কমবে এবং সাধারণের কন্টাক্ট ডিটেলস সুরক্ষিত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই উদ্যোগের ফলে ছোট ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার বা গিগ কর্মীদের সবচেয়ে বেশি সুবিধা হতে পারে। কাজের সূত্রেই তাদের রোজ বহু অপরিচিত মানুষের সঙ্গে চ্যাট বা লেনদেন সারতে হয়। এতদিন কাজের নম্বর ও ব্যক্তিগত নম্বর আলাদা রাখতে তাদের দুটি ফোন বা সিমের খরচ বহন করতে হতো। এবার একটিমাত্র হোয়াটসঅ্যাপে ইউজারনেম দিয়েই তারা নিজেদের পেশাদার ও ব্যক্তিগত জীবন সহজে আলাদা রাখতে পারবেন।
ভারতের সাইবার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হল ‘সিম সোয়াপ’ বা সিম কার্ড ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে জালিয়াতি। প্রতারকেরা বিভিন্ন উপায়ে মোবাইল অপারেটরদের বিভ্রান্ত করে অনায়াসে ভিকটিমের নম্বরের ডুপ্লিকেট সিম তৈরি করে নেয়। এরপর ওই সুনির্দিষ্ট নম্বরে আসা ওটিপির মাধ্যমে সহজেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খালি করে দেওয়া হয়। এই হামলার মূল সূত্রই হল ব্যবহারকারীর ফোন নম্বর জেনে ফেলা।
নতুন এই আপডেটের পর ব্যবহারকারীরা যদি ঢালাওভাবে নম্বর ছড়ানো বন্ধ করে দিয়ে প্রধান পরিচয় হিসেবে ইউজারনেম ব্যবহার শুরু করেন, তবে প্রতারকদের কাজ কঠিন হয়ে যাবে। ফোন নম্বর গোপন থাকলে সাইবার অপরাধীরা সেটিকে সহজে জালিয়াতির জন্য নিশানা করতে পারবে না। ইউজারনেম সরাসরি আপনার ফোন নম্বরের নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেবে না ঠিকই, তবে নম্বর বাইরে ছড়িয়ে যাওয়া রুখতে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়বে।
কিন্তু এই ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু অন্ধকারের চিত্রও সামনে চলে আসছে। ইউজার আইডি ব্যবহারে পরিচয় গোপন করা অত্যন্ত সহজ হওয়ায় স্ক্যামার বা ভুয়ো অ্যাকাউন্টধারীদের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ভুয়ো নাম নিয়ে অন্যের পরিচয় ভাঙিয়ে পরিচিত কাউকে মেসেজ পাঠিয়ে টাকা দাবি করার মতো ঘটনা সাইবার ক্রাইম জগতে নতুন কিছু নয়। এই সমস্যার দিকে গভীরভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এই নিরাপত্তার ঝুঁকিটি মাথায় রেখেই ভারতীয় প্রশাসনিক মহল ইতিমধ্যে বেশ সতর্ক ভূমিকা নেওয়ার সঙ্কেত দিয়েছে। নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্রের খবর অনুযায়ী, ভারতে এই ফিচারটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার সময়ে বা ঠিক তার আগে কেন্দ্র সরকার এটি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখতে পারে। সাইবার অপরাধীরা যাতে এই আইডি সিস্টেমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, তার পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ মেটা দিতে পারছে কি না—তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
যদি সরকারি পরীক্ষার সময় প্রযুক্তিগত সুরক্ষায় কোনও গুরুতর সমস্যা বা গাফিলতি ধরা পড়ে, তবে মেটা কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে কৈফিয়ত চেয়ে কারণ দর্শানোর বা প্রয়োজনীয় সংশোধন করার জন্য নির্দেশ জারি হতে পারে। মেটা অবশ্য দাবি করেছে যে, সুরক্ষায় জোর দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থায় অপরিচিত কারও ইউজারনেম সহজে খোঁজার কোনো উপায় থাকবে না এবং সঠিক ইউজারনেম না জানলে চ্যাটও শুরু করা যাবে না।
একটি বিষয় স্পষ্ট যে, টেকসই সুরক্ষার প্রথম ধাপ হল ব্যবহারকারীদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনো ফিচার তখনই সফল হয় যখন সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে বিপুল মাত্রায় তা ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু ভারতে যেখানে গ্রামের প্রান্তিক মানুষ থেকে শহরের অফিসকর্মী, সবাই দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল নম্বরের মাধ্যমেই হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারে অভ্যস্ত, সেখানে এই নতুন সংস্কৃতি রাতারাতি কতটা জনপ্রিয়তা পাবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে এই সুরক্ষার পদ্ধতিটি সমাজকর্মী, সাংবাদিক, নারী ব্যবহারকারী বা অতিমাত্রায় গোপনীয়তা সচেতন গ্রাহকদের মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। পরবর্তী সময়ে এই ফিচারের সরলতা এবং সহজলভ্যতা নিশ্চিত হলে সময়ের সাথে সাথে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে এটি ডিজিটাল ভারতের অনলাইন ডেটা নিরাপত্তায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ এক পদক্ষেপ হতে চলেছে।


Post Comment