লোকসভায় ‘তৃণমূলী’ বিদ্রোহ! দিল্লিতে তলব অভিষেককে, কোন দিকে মোড় নিচ্ছে ঘাসফুলের কোন্দল?
India
-Ritesh Ghosh
লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ভাঙনের পরিস্থিতি এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। দলত্যাগী ২০ জন বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সাংসদের অন্য দলে যোগদানের আবহে তৎপরতা শুরু হয়েছে সংসদীয় অলিন্দে। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই-র সঙ্গে মিশে যাওয়ার আবেদন জানানোর পর, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন জোড়াফুল শিবিরকে নিজেদের বক্তব্য পেশ করার জন্য তলব করেছেন।
স্পিকারের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপটি মূলত দলটির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো একটি চিঠির প্রত্যুত্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ১০ জুন চিঠি লিখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভার স্পিকারের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছিলেন, যাতে কোনও অবস্থাতেই জোড়াফুল শিবিরের কোনো বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীকে আলাদা দল বা গোষ্ঠীর মর্যাদা দেওয়া না হয়। তাঁর মতে, দলের প্রতীকে জিতে আসা সাংসদরা মূল দলকে অস্বীকার করে মনগড়া কোনো গোষ্ঠী তৈরি করতে পারেন না।

গত ১৫ জুন লোকসভায় এই ক্ষমতার লড়াই যখন চরমে পৌঁছয়, তখন পর্দার আড়ালে তৈরি হয় এক দারুণ নাটকীয় পরিস্থিতি। তৃণমূলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্পিকারের দফতর থেকে সোমবার বেলা দুটো নাগাদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে একটি জরুরি বার্তা পাঠানো হয়। যেখানে ওই দিনই বিকেল চারটেয় স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সশরীরে দেখা করে তাঁদের দলের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তবে ঠিক একই সময়ে কলকাতার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে এক ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডির কার্যালয়ে তাঁকে জেরা করা হচ্ছিল। ফলে একদিকে যখন দিল্লিতে স্পিকারের জরুরি ইমেল পৌঁছায়, তখন কলকাতায় তদন্তকারীদের মুখোমুখি ছিলেন তিনি। এই চরম ব্যস্ততার মধ্যে তাঁর পক্ষে তৎক্ষণাৎ সশরীরে বা ইমেলের মাধ্যমে দিল্লিতে কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব ছিল না।
এই কঠিন পরিস্থিতিতে দলের প্রবীণ তথা দক্ষ লোকসভা সাংসদ কীর্তি আজাদ ময়দানে নামেন। তিনি অবিলম্বে দিল্লিতে লোকসভার স্পিকারের সচিবালয়ের সঙ্গে সর্বক্ষণ যোগাযোগ বজায় রাখেন। তিনি স্পিকারের দফতরকে স্পষ্ট জানান, ইডির জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার কারণে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে আপাতত নিজের ইমেল দেখার কোনো সুযোগ ছিল না। তদন্তকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শেষ হলেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠি ও তলবের বিষয়ে বিশদে জানানো হবে।
তবে কেবল চিঠি পাঠিয়েই নিজের দায়িত্ব ইতি করেননি কীর্তি আজাদ। দিল্লিতে দলীয় নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে তিনি নিজেই সরাসরি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সংসদে যান। সেখানে তিনি তৃণমূলের মূল নেতৃত্বের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং জানান যে, দল এই ধরনের কোনো বেআইনি ভাঙন বা অন্য দলের সঙ্গে সংযুক্তিকরণের প্রয়াসকে খতিয়ে দেখছে এবং সর্বশক্তি দিয়ে এর বিরোধিতা করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
এই পুরো হাইপ্রোফাইল বিতর্কের আইনি মূলে রয়েছে ভারতের সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ বিরোধী আইন। স্পিকারকে পাঠানো চিঠিতে তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতৃবৃন্দ এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জোর দিয়ে বলেছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস একটি একক এবং সম্পূর্ণরূপে অবিভাজ্য রাজনৈতিক দল। কোনো নির্বাচিত সাংসদ নিজের ইচ্ছামতো বুথ বা লোকসভা স্তরে কিছু সই সংগ্রহ করে নিজেদের মূল দল বা সংসদীয় দলের আইনি অংশীদার বা একমাত্র দাবিদার হিসেবে কখনো তুলে ধরতে পারেন না।
তৃণমূলের সংসদীয় নীতি অনুযায়ী, মূল দল থেকে লোকসভার অংশকে কোনোভাবেই আলাদা বা বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তাই কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন ২০ জন বিক্ষুব্ধ সাংসদের এই পদক্ষেপকে জোড়াফুল শিবিরের মূল অংশ পুরোপুরি অসাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে অবৈধ বলে চিহ্নিত করছে। তৃণমূল শিবিরের দাবি, সংসদীয় আইনকে পাশ কাটিয়ে কিছু বিদ্রোহী সদস্য নিজেদের খুশি মতো রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করে অন্য কোনো দলের সঙ্গে এভাবে সংযুক্ত হতে পারেন না।
অন্যদিকে, বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীটি ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন পার্টি অফ ইন্ডিয়া তথা এনসিপিআই-এর সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজেদের লোকসভার সদস্যপদ সুরক্ষিত রাখতে এবং নতুন রাজনৈতিক জমি তৈরি করতে সচেষ্ট হয়েছে। সাধারণ দলত্যাগ বিরোধী আইন অনুযায়ী, কোনো দলের দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ যদি অন্য দলে যোগ দেন তবেই সদস্যপদ রক্ষা করা সম্ভব। তবে তৃণমূলের আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, মূল সংগঠন বা মূল দলের অনুমতি ছাড়া কেবলমাত্র সংসদীয় দলের সংখ্যার জোরে এই দলবদল বৈধ হতে পারে না।
ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ক্ষমতার লড়াই বা দল ভাঙানোর খেলা একেবারেই নতুন নয়। তবে লোকসভা নির্বাচনের পর এভাবে একযোগে ২০ জন নির্বাচিত সাংসদের দলত্যাগের মরিয়া চেষ্টা তৃণমূলের মতো একটি শক্তিশালী দলকে আঞ্চলিক ও জাতীয় স্তরে বড়সড় ফাটলের সম্মুখীন করেছে। যদি শেষ পর্যন্ত স্পিকারের কার্যালয় থেকে এই বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর সংযুক্তিকরণের দাবি মেনে নেওয়া হয়, তবে জাতীয় স্তরে তথা লোকসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের শক্তি ও দর কষাকষির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
আপাতত এই জটিল আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের জল আগামী দিনে কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই গভীর নজর রয়েছে দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দলের। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা দুই শিবিরের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য ও প্রমাণ খতিয়ে দেখার পরেই এ নিয়ে তাঁর চূড়ান্ত রুলিং দিতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জল শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে গড়াতে পারে, যা আগামী দিনে দেশের দলত্যাগ বিরোধী আইনের ক্ষেত্রেও একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।


Post Comment