প্রেসক্রিপশন ছাড়া আর মিলবে না কাশির সিরাপ! ওষুধ কেনার নিয়মে বড় বদল আনল কেন্দ্র
India
-Ritesh Ghosh
সারাদেশে ওষুধ বিক্রির নিয়মে এক বড়সড় বদল আনল কেন্দ্রীয় সরকার। এবার থেকে আর সহজে সাধারণ সর্দি-কাশির সিরাপও ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধের দোকান থেকে কেনা যাবে না। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের এক বিশেষ নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সব ধরনের তরল ওষুধ বা সিরাপই এখন থেকে শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শপত্র বা প্রেসক্রিপশন থাকলেই ফার্মেসি থেকে কিনতে পারা যাবে।
এই নতুন নিয়মটি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে সাধারণ মানুষের ওটিসি বা ‘ওভার দ্য কাউন্টার’ ওষুধ কেনার দীর্ঘদিনের অভ্যাসে অত্যন্ত বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। এতদিন পর্যন্ত কোনো রকম চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই দেশের যেকোনো ছোট-বড় ওষুধের দোকান থেকে কাশির সিরাপ বা অন্য কোনো তরল জাতীয় ওষুধ খুব সহজেই কিনে নেওয়া যেত। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী ক্রেতাদের এখন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের বৈধ প্রেসক্রিপশন ফার্মেসিতে জমা দিতে হবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই নয়া নীতিটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে এবং দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ওষুধের দোকানগুলিতে এই নিয়ম মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই কড়া পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হল শিশুদের ক্ষেত্রে কাশির সিরাপের অতিরিক্ত সেবন রোধ করা এবং অ্যান্টিবায়োটিক বা ড্রাগ-যুক্ত সিরাপের অপব্যবহার কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করা।
সরকারি বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা গেছে, এই সিদ্ধান্তটি ‘ড্রাগস (পঞ্চম সংশোধন) নিয়ম, ২০২৬’-এর আওতায় নেওয়া হয়েছে, যা চলতি বছরের ৯ জুন তারিখে দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক দ্বারা জারি করা হয়েছিল। এই নতুন আইনটি ভারতের অফিশিয়াল গেজেটে প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথেই দেশজুড়ে বলবৎ হয়েছে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার ড্রাগস আইন, ১৯৪৫-এর ‘তফসিল কে’ (Schedule K) থেকে ‘সিরাপ’ (Syrups) শব্দটিকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আমাদের দেশের ড্রাগস আইনের তফসিল কে-তে মূলত এমন কিছু নির্দিষ্ট বিভাগের ওষুধের তালিকা থাকে, যেগুলি বিক্রয় এবং বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারের সাধারণ কঠিন নিয়মকানুন ও শর্ত থেকে কিছু ছাড় পেয়ে থাকে। এই তালিকার ১৩ নম্বর সিরিয়ালের অধীনে ৭ নম্বর আইটেমে এতদিন ‘সিরাপ’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখান থেকে শব্দটি বাদ পড়ায়, এখন প্রেসক্রিপশন-নির্ভর অন্যান্য কড়া ওষুধের সমতুল্য হয়ে গেল সমস্ত সিরাপ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রক সূত্রে জানা গেছে, এই বড় সিদ্ধান্তটি রাতারাতি নেওয়া হয়নি। বেশ কিছুদিন আগে থেকেই এই নিয়ে আলোচনা চলছিল এবং গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এই সংক্রান্ত খসড়া প্রস্তাবটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই খসড়া প্রস্তাবের ওপরে সাধারণ নাগরিক, চিকিৎসা ক্ষেত্রে যুক্ত বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার তরফ থেকে আসা মতামত, আপত্তি এবং পরামর্শ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেই এই চূড়ান্ত নীতি রূপায়ণ করা হল।
ভারতে দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই সাধারণ সর্দি-কাশি, জ্বর বা পেটের ব্যথার জন্য ওষুধ দোকানে গিয়ে সরাসরি নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ কিনে নেওয়ার এক মারাত্মক প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে শিশু কিংবা বয়স্কদের সামান্য ঠান্ডা লাগলেই পরিবার থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে সিরাপ কিনে খাওয়ানো হয়। এর ফলে ওষুধের ভুল প্রয়োগ, অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন এবং ড্রাগের আসক্তি তৈরি হওয়ার মতো গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল প্রতিনিয়ত।
চিকিৎসকদের মতে, যথেচ্ছ সিরাপ পানের কারণে অনেক সময় মানুষের লিভার ও কিডনিরও মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার খবর সামনে এসেছে। মূলত এই স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলি রুখে দিয়ে রোগীদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এই আইন সংশোধনের প্রধান উদ্দেশ্য। এখন থেকে সিরাপ কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের প্রেসক্রিপশন দেখাতে বাধ্য করার মাধ্যমে এই অনিয়ন্ত্রিত ওষুধের ব্যবহার এবং ওটিসি বিক্রির কুফল অনেকটাই রোধ করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করছে কেন্দ্র।
এই নতুন নিয়মটি তৈরির ক্ষেত্রে ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিকস অ্যাক্ট, ১৯৪০-এর ১২ এবং ৩৩ নম্বর ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই ওষুধ নীতি কঠোর করতে দেশের চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ মান্য কমিটি ও কেন্দ্রীয় ড্রাগস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি বোর্ড বা ডিটিএবি-র সাথে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পরামর্শের পরেই এই আইন চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে।
নতুন এই আইন শতভাগ কার্যকর করার ক্ষেত্রে দেশের ছোট-বড় সব ফার্মেসি এবং ওষুধের রিটেইল দোকানগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। এখন থেকে দোকানের ক্রেতার কাছে প্রেসক্রিপশন না থাকলে কোনো অবস্থাতেই সিরাপ বিক্রি করা যাবে না। নিয়ম অমান্য করে কোনো ফার্মেসি প্রেসক্রিপশন ছাড়া সিরাপ বিক্রি করলে ড্রাগ ইন্সপেক্টরের তদারকিতে তাদের লাইসেন্স সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বাতিল করার মতো শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
অন্যদিকে, সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের ক্ষেত্রে সামান্য সর্দি-কাশির সমস্যাতেও এবার থেকে স্থানীয় ক্লিনিকে গিয়ে ডাক্তারের ফি দিয়ে প্রেসক্রিপশন আনিয়ে তরল ওষুধ কিনতে হবে, যা সাময়িকভাবে পকেটে টান ফেলতে পারে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের মতে, নামমাত্র খরচের চেয়ে সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শ এবং রোগ অনুযায়ী ওষুধের সঠিক ডোজ ও মাত্রা জানা অনেক বেশি সুরক্ষাদায়ক এবং সুরক্ষিত জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি।
আন্তর্জাতিক স্তরেও কাশির সিরাপের গুণমান ও অতিরিক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে একাধিকবার বড় আকারের বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ভারত সরকারের এই নতুন উদ্যোগ বহির্বিশ্বের বাজারেও দেশের রপ্তানি করা সিরাপের গুণগত মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বাড়িয়ে দেবে। কঠোর নজরদারি এবং প্রেসক্রিপশনের বাধ্যবাধকতা দেশে কোনো অস্বাস্থ্যকর সিরাপের কারবার বা যথেচ্ছ ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করবে এবং আগামী দিনে একটি সুস্থ সবল জনসমাজ গড়ে তুলতে অবদান রাখবে।



Post Comment