মিড-ডে মিলে থেকে ডিম বাদ! নিরামিষ খাইয়ে কি তবে বদলানোর প্রচেষ্টা বাংলার সংস্কৃতিকে?
West Bengal
-Ritesh Ghosh
পশ্চিমবঙ্গে স্কুলপড়ুয়াদের মিড-ডে মিলের মেনু থেকে ডিম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। কলকাতা পুরসভা এলাকার বিদ্যালয়গুলিতে পাইলট প্রকল্পের আওতায় রান্না করা মিড-ডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসকনকে। যেহেতু ইসকন সম্পূর্ণ নিরামিষ আহারের নীতি মেনে চলে, তাই তাদের পরিবেশিত মেনুতে ডিমের আর কোনও জায়গা থাকছে না। তার বদলে পড়ুয়াদের দেওয়া হবে পনির, রাজমা, সয়াবিন এবং দুগ্ধজাত খাবারের মতো নিরামিষ প্রোটিন বিকল্প। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই রাজ্য জুড়ে বাদানুবাদ তুঙ্গে উঠেছে।
রাজ্যে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত এই সিদ্ধান্তের রূপরেখা স্পষ্ট করেন। তিনি ঘোষণা করেন, প্রাথমিক স্কুলের মিড-ডে মিলের জন্য বরাদ্দ ছাত্রপিছু ৬.৭৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হচ্ছে। বরাদ্দ বৃদ্ধির এই পদক্ষেপ সব মহলে প্রশংসিত হলেও বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে মধ্যাহ্নভোজের খাদ্য তালিকা। বিশেষ করে কলকাতা পুরসভা এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ইসকনকে এই রান্নার গুরুদায়িত্ব দেওয়ায় ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে বিরোধী শিবিরে। বাঙালি সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ডিম বা অন্য কোনো প্রাণিজ প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এই নীতি অনেককেই আশাহত করেছে।

রাজনীতির এই উত্তপ্ত বাদানুবাদের মাঝে দাঁড়িয়ে পুষ্টিবিদেরা বলছেন, বিতর্কটি হওয়া উচিত শিশুদের পুষ্টির প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে, কোনো রাজনৈতিক প্রচারের নিরিখে নয়। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শিশুদের সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির জন্য ডিম অত্যন্ত চমৎকার একটি খাদ্য। ডিমে রয়েছে সহজে হজমযোগ্য প্রোটিন, ভিটামিন বি১২, কোলিন, ভিটামিন ডি এবং প্রচুর পরিমাণে আয়রন। এই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলি বাড়ন্ত বয়সের শিশুদের সার্বিক বিকাশে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে।
পুষ্টিবিদেরা বিকল্পের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট আলোকপাত করেছেন। পুষ্টিবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী, সয়াবিন বা টফুকে ডিমের সবচেয়ে কাছাকাছি বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, কারণ এগুলিও সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস। অন্যদিকে, পনির ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিনের অত্যন্ত চমৎকার মাধ্যম। সবুজ শাকসবজি থেকে শরীরে মেলে দরকারি ভিটামিন, খনিজ, ফাইবার এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। তবে কোনো সবুজ সবজিই ডিম বা সয়াবিনের মতো মূল প্রোটিন উৎসের পুরোপুরি বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিশুদের স্বাস্থ্যের বিষয়টিকেই সবার ওপরে রাখা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের অভিমত, ডিমে যে ধরনের সম্পূর্ণ অ্যামাইনো অ্যাসিডের বিন্যাস থাকে, তা নিরামিষ খাবারে মেলা কঠিন। তবে চাল, ডাল ও ডালজাতীয় খাবারের মিশ্রণ ঠিকভাবে প্রস্তুত করলে প্রোটিনের ঘাটতি অনেকটাই মেলানো সম্ভব। সয়াবিন বা রাজমার মাধ্যমে পুষ্টির জোগান দেওয়ার ভাবনায় কোনো ত্রুটি নেই, তবে তার সঠিক রন্ধনপ্রণালী ও গুণমান বজায় রাখা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পাইলট প্রকল্পের এই নিরামিষ খাদ্য তালিকা গ্রামীণ বা শহুরে দরিদ্র শিশুদের স্বাভাবিক বাড়বাড়ন্ত কতখানি মসৃণ রাখবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই চুলচেরা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সংবেদনশীলতা অনেক পুরনো। বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকেই এই লড়াই ভিন্ন রূপ নিয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেস বারবার অভিযোগ করে এসেছে যে, রাজ্যে ক্ষমতা দখল করতে পারলে গেরুয়া শিবির স্থানীয় সংস্কৃতিতে নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস জোর করে চাপাবে। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মাছ খাওয়ার অভ্যাসকে রক্ষা করার ডাক দেওয়া হয়েছিল সেই সময়। তৎকালীন বিজেপি নেতারা সেই অভিযোগ খারিজ করতে প্রকাশ্যে মাছ ভক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে এই পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ডিম বাদ দেওয়ায় সেই পুরোনো বিতর্ক আবার জোরদার হল।
রাজ্যে প্রধান বিরোধী দলনেতা তথা বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাংলার আবহমান এবং চিরাচরিত খাদ্য ঐতিহ্যে পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা চলছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্পষ্ট কথা, বাংলার বহু প্রজন্মের শিশুরা প্রাণিজ প্রোটিনের মাধ্যমেই সুস্থ ও পুষ্ট হয়ে বড় হয়েছে। সুতরাং স্কুলপর্যায়ের পুষ্টি প্রকল্পগুলিতে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘকালীন স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের প্রতিফলন থাকা দরকার, তা কোনোভাবেই কৃত্রিমভাবে বদলে দেওয়া উচিত নয়।
তৃণমূল কংগ্রেসের বিশিষ্ট নেতা ও রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এটিকে রাজনৈতিক অভিসন্ধি হিসেবেই দেখছেন। সরকারকে আক্রমণ করে তিনি অভিযোগ করেছেন, জনকল্যাণমূলক একটি কর্মসূচিকে আদর্শের স্বার্থ চরিতার্থ করার চক্রান্তে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এভাবে ঘুরপথে নিরামিষ অ্যাজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বাংলার মানুষ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। একই প্রসঙ্গে দলের সাংসদ মহুয়া মৈত্রও তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং জানতে চেয়েছেন, সাধারণ বাঙালি মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র শিশুরা রাজমার মতো অপরিচিত খাবারের পুষ্টিগুণ আদৌ নিতে পারবে কিনা।
তবে প্রশাসনের তরফ থেকে সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন সরকারের শীর্ষ মহলের দাবি, এই সিদ্ধান্ত কেবল কলকাতা শহরের নির্দিষ্ট কিছু স্কুলকে ঘিরে একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষামূলক উদ্যোগ মাত্র। কোনোভাবেই রাজ্যজুড়ে নিরামিষ নীতি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না। তাছাড়া বরাদ্দ বাড়ানোর মাধ্যমে পরিবেশিত খাবারের মানোন্নয়নের দিকেই মূল নজর দেওয়া হয়েছে এবং ডিমের উপযুক্ত প্রতিস্থাপক হিসেবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পুষ্টিকর খাদ্য উপাদানই রাখা হয়েছে যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে শিশুদের বিকাশ ঘটাবে।
খাদ্যের রাজনীতি ও আদর্শিক সংঘাতের সমান্তরালে দিনশেষে প্রধান বিবেচ্য দেশের ভবিষ্যৎ অর্থাৎ শিশুরা। ইসকনের পাইলট প্রকল্প কতখানি সফল হয় বা প্রোটিনের ঘাটতি মেটাতে নিরামিষ আহার কতটা সুষম আহার প্রদান করতে সফল হয়, তা দেখার জন্য আগামী সময়ের অপেক্ষা করতে হবে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে পুষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাই সব পক্ষের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।



Post Comment