মাঠ নয় যেন রণক্ষেত্র, মারামারি করে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও লালকার্ড দেখলেন আর্জেন্টিনার ফুটবলার!

মাঠ নয় যেন রণক্ষেত্র, মারামারি করে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও লালকার্ড দেখলেন আর্জেন্টিনার ফুটবলার!

Football

-Ritesh Ghosh

ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠ জুড়ে তৈরি হয়েছিল এক উৎসবমুখর পরিবেশ। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের করা ঐতিহাসিক গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বজয়ের মুকুট নিজেদের মাথায় তুলেছে স্পেন। তবে মহাকাব্যিক এই ফাইনালের শেষটা যে কলঙ্কিত এবং হিংসাত্মক রূপ নেবে, তা হয়তো ফুটবলপ্রেমীরা ভাবেননি। ম্যাচ শেষের ঠিক পরপরই মাঠের মধ্যে চরম হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন দুই দলের ফুটবলাররা, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম কুৎসিততম অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।

ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস। স্পেনের জয়োৎসবের মাঝেই চরম মেজাজ হারিয়ে তিনি স্প্যানিশ ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়ার ওপর চড়াও হন। গার্সিয়া যখন মাঠে শিরোপা জয়ের আনন্দে মেতেছিলেন, ঠিক তখনই পারেদেস ছুটে এসে তাঁকে সজোরে আঘাত করেন। এই ঘটনাটি ক্যামেরায় ধরা পড়ার পর মুহূর্তের মধ্যে মাঠের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় ফুটবলারদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও চড়-থাপ্পড় মারার ঘটনা।

Post-match brawl erupts after Spain wins World Cup

খেলার মাঠ পরিণত হল রণক্ষেত্রে: পারেদেস-গাভির ধুন্ধুমার হাতাহাতি

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ম্যাচ শেষ হতেই লিয়ান্দ্রো পারেদেস সটান এগিয়ে যান এরিক গার্সিয়ার দিকে। গার্সিয়াকে তিনি পরপর দুটি ঘুষি মারেন। সতীর্থকে এভাবে আক্রান্ত হতে দেখে বার্সেলোনার তরুণ ফুটবলার গাভি পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং দুজনকে আলাদা করতে ছুটে আসেন। কিন্তু গাভিকে দেখামাত্রই পারেদেসের ক্ষোভের আগুন আরও দ্বিগুণ হয়ে যায়। তিনি গাভির দিকেও হাত তোলেন এবং আক্রমণাত্মক ভঙ্গি প্রদর্শন করেন।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার থিয়াগো আলমাদা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি গাভিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও পারেদেসের একটি সজোর চড় গাভির মুখে গিয়ে লাগে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি নিজে মাঠে নেমে পড়েন। তিনি ক্ষুব্ধ আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের টেনে সরিয়ে নেন। এই চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য ম্যাচ শেষ হওয়ার পর পারেদেসকে লাল কার্ড দেখানো হয়।

ফেরান তোরেসের সোনার গোল এবং স্পেনের ইতিহাস তৈরি

মাঠের মধ্যকার এই বিশৃঙ্খলা বাদ দিলে, পুরো ১২০ মিনিট জুড়েই ফাইনাল ম্যাচটি ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরপুর। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় দুদলের রক্ষণভাগের অনবদ্য পারফরম্যান্সের কারণে কোনও গোল হয়নি। ফলে খেতাবি লড়াই গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে স্পেনের পরিবর্ত খেলোয়াড় ফেরান তোরেস এক দুর্দান্ত রিবাউন্ড থেকে বল আর্জেন্টিনার জালে জড়িয়ে দেন। গোলরক্ষককে পরাস্ত করে করা এই একটি গোলই স্পেনকে বিশ্বমঞ্চে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা এনে দেয়।

স্পেনের ফুটবলের এই সাফল্য ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় আন্দ্রে ইনিয়েস্তার করা সেই ঐতিহাসিক গোলের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্প্যানিশ দল পুরো টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে। তারা পুরো আসরে মাত্র একটি গোল হজম করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এক নতুন রেকর্ড গড়েছে। একই সঙ্গে ইউরো কাপ ও বিশ্বকাপ পরপর জেতার বিরল কীর্তিও স্পেন ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো নিজেদের করে নিল।

গোটা ম্যাচ জুড়েই স্পেন নিজেদের চিরচেনা আধিপত্য বজায় রেখে খেলেছে। স্পেন ম্যাচে মোট ২০ বার আর্জেন্টিনার গোলমুখে শট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। বিপরীতে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ অতিরিক্ত সময়ের শেষ ভাগের আগে তেমন সুবিধা করতে পারেনি। তার ওপর নির্ধারিত ৯০ মিনিটের শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হয়। ফলে শেষ দিকে এসে ম্যাচ বাঁচানো আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ম্যাচে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করে দলকে খেলায় টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের গতিময় ফুটবলের সামনে নীল-সাদা শিবিরের রক্ষণ ভেঙে পড়ে। মধ্যমাঠের লড়াইয়ে স্পেনের ফুটবলাররা শারীরিকভাবে এবং পাসিং ফুটবলে আর্জেন্টিনার তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁত ছিলেন। এই জয় কেবল স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপাই নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলে তাদের পুনরায় আধিপত্য বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।

মেসির স্বপ্নভঙ্গ এবং আর্জেন্টিনার এক সোনালী যুগের অবসান

এই হৃদয়বিদারক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনার ফুটবলের এক অবিশ্বাস্য ও গৌরবময় জয়যাত্রার অবসান ঘটল। ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয় এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর এই প্রথম তারা কোনও বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে এসে হারের মুখ দেখল। অধিনায়ক হিসেবে মেসি পুরো টুর্নামেন্টে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে নিজের সর্বস্ব দিয়ে লড়াই করেছিলেন, কিন্তু ফাইনালে স্পেনের জমাট রক্ষণভাগে ফাটল ধরাতে সফল হননি।

স্পেনের তারুণ্যের শক্তির সামনে আর্জেন্টিনার রক্ষণাত্মক কৌশল শেষ পর্যন্ত পরাজিত হল। ট্রফি ধরে রাখার স্বপ্নের এমন নাটকীয় ও বেদনাদায়ক পরিণতি আর্জেন্টাইন সমর্থকদের অত্যন্ত হতাশ করেছে। ম্যাচ শেষে মাঠের সংঘর্ষের ঘটনাটি পরাজিত দলের মানসিক হতাশারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বকাপ জয়ের সোনালী ট্রফিটি স্পেনের যুবরাজদের হাতে ওঠার মধ্য দিয়ে বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন শক্তির উত্থান নিশ্চিত হলো।

Post Comment

You May Have Missed