গোল্ডেন বুট থেকে গ্লাভ – ফিফা বিশ্বকাপে কে পেলেন কোন পুরস্কার? একনজরে সম্পূর্ণ তালিকা

Football

-Ritesh Ghosh

নিউ ইয়র্কের নিউ জের্সি স্টেডিয়ামে বসেছিল ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনালের মহারণের আসর। সেখানেই ফুটবল বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের নতুন মুকুট উঠল স্পেনের মাথায়। ফাইনালে শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে মাত্র ১-০ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সোনালী ট্রফি ঘরে তুলল লা রোহারা। বিদায়ী বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির স্বপ্নভঙ্গ করে স্প্যানিশদের এই জয় ফুটবল ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় যোগ করল।

২০১০ সালের পর এটি স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়। এবারের আসরে পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করে নতুন এক ফুটবল দৃষ্টান্ত তৈরি করল কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। অন্যদিকে শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নামা লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ট্রফির খুব কাছাকাছি এসেও রানার্স-আপ হয়েই মাঠ ছাড়ল।

Spain team celebrating 2026 World Cup victory

বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার ঐতিহাসিক মুহূর্ত উদযাপনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের জন্য সেরা পুরস্কারগুলিও বগলদাবা করেছেন স্পেনের ফুটবলাররা। মাঝমাঠ থেকে শুরু করে রক্ষণভাগ ও গোলপোস্টের নিচে স্প্যানিশ প্রাচীর তৈরি করা প্রতিটি ফুটবলারই এই জয়ের আসল কারিগর ছিলেন। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে লা রোহাদের এমন নজরকাড়া শক্তি প্রদর্শন বিশ্ব ফুটবল ভক্তদের অনেক দিন মনে থাকবে।

স্প্যানিশ মাঝমাঠের জাদুকর ও সেরা গোলরক্ষকের কৃতিত্ব

পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে স্পেনের মাঝমাঠকে দারুণভাবে পরিচালনা করেছেন অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার রদ্রি। ফাইনালেও মাঝমাঠে চমৎকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের সম্মানজনক ‘গোল্ডেন বল’ নিজের করে নেন এই তারকা। ১৬ নম্বর জার্সিধারী রদ্রির ঠাণ্ডা মাথার নিখুঁত পাস এবং কার্যকর নেতৃত্বই মূলত স্পেনকে দ্বিতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বের চূড়ায় নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

স্পেনের গোলপোস্ট অবিচল রাখার পিছনে আসল ভূমিকা ছিল গোলরক্ষক উনাই সিমোনের। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে বিপক্ষ দলের একের পর এক আক্রমণ নস্যাৎ করে তিনি জিতেছেন ‘গোল্ডেন গ্লাভ’ পুরস্কার। ২৩ নম্বর জার্সিধারী এই তারকা গোলরক্ষক গোটা টুর্নামেন্টে বিপক্ষ দলকে কোনও সুযোগ দেননি এবং টানা ৬৫০ মিনিট কোনও গোল না হজম করার এক অনন্য বিশ্বকাপ রেকর্ড গড়েছেন।

স্পেনের এই অপরাজেয় রক্ষণভাগের কেন্দ্রে থেকে বাজিমাত করেছেন অনূর্ধ্ব-২০ বয়সী তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সি। আসরের ‘সেরা তরুণ খেলোয়াড়’ নির্বাচিত হয়েছেন ২২ নম্বর জার্সি পরা এই খেলোয়াড়। কিশোর বয়সেই বিশ্বকাপের ফাইনালে পরিণত ফুটবলের যে অসাধারণ নিদর্শন তিনি দেখিয়েছেন, তা ভবিষ্যতের বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক নক্ষত্রের ইঙ্গিত দেয়।

কিলিয়ান এমবাপের ঝুলিতে নজিরবিহীন গোল্ডেন বুট রেকর্ড

যদিও ফ্রান্স ফাইনালে পৌঁছতে পারেনি এবং চতুর্থ স্থানে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে, তবুও ফরাসি স্ট্রাইকার কিলিয়ান এমবাপের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য সকলকে চমকে দিয়েছে। মোট ৮টি ম্যাচে দুর্দান্ত ১০টি গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব ‘গোল্ডেন বুট’ অর্জন করেন তিনি। ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতার অসাধারণ গৌরব এখন এমবাপের সঙ্গী।

এই অবিশ্বাস্য প্রদর্শনের সুবাদে এমবাপে বিশ্বকাপে নিজের কেরিয়ার গোলসংখ্যা বাড়িয়ে ২২-এ নিয়ে গেলেন, যা পুরুষ বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বাধিক গোলের রেকর্ড। অন্যদিকে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফ্রান্সের লড়াইটি ফুটবল ভক্তদের জন্য ছিল এক চিরস্মরণীয় ম্যাচ। ১০ গোলের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ফরাসিদের ৬-৪ গোলে হারিয়ে ব্রোঞ্জ পদক নিজেদের ঝুলিতে পুরে নেয় থ্রি লায়ন্সরা।

টুর্নামেন্ট জুড়ে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল ফুটবল উপহার দেওয়ায় দলগতভাবে অনন্য সম্মাননা পেয়েছে নেদারল্যান্ডস দল। কোনও প্রকার শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করে এবং সুন্দর খেলার পরিবেশ ভালো রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের হাতে উঠেছে ‘ফিফা ফেয়ার প্লে’ ট্রফি। গোটা আসরে ডাচ দের চমৎকার খেলা বিশ্বের কোটি ভক্তের মন ছুঁয়ে গিয়েছে। একনজরে পুরো পুরস্কারের তালিকা।

পুরস্কারের নাম বিজয়ী খেলোয়াড় বা দল দেশ
চ্যাম্পিয়ন স্পেন ফুটবল দল স্পেন
রানার্স-আপ আর্জেন্টিনা ফুটবল দল আর্জেন্টিনা
তৃতীয় স্থান ইংল্যান্ড ফুটবল দল ইংল্যান্ড
গোল্ডেন বল (সেরা খেলোয়াড়) রদ্রি স্পেন
গোল্ডেন বুট (সেরা গোলদাতা) কিলিয়ান এমবাপে ফ্রান্স
গোল্ডেন গ্লাভ (সেরা গোলরক্ষক) উনাই সিমোন স্পেন
সেরা তরুণ খেলোয়াড় পাউ কুবার্সি স্পেন
ফিফা ফেয়ার প্লে অ্যাওয়ার্ড নেদারল্যান্ডস জাতীয় দল নেদারল্যান্ডস

২০২৬ সালের এই ফিফা বিশ্বকাপ নতুন যুগ এবং পুরনো নক্ষত্রের বিদায়ের এক অবিস্মরণীয় সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একদিকে যেমন বহু যুগের সোনালী প্রজন্মের বিদায়ী অশ্রু ঝরেছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের ফুটবলীয় উত্থানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে বিশ্বমঞ্চে। বিশেষ করে স্পেনের এই জয় প্রমাণ করে যে রক্ষণ এবং মধ্যমাঠের সামঞ্জস্যই আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

লুইস দে লা ফুয়েন্তের কোচিংয়ে স্পেন এক অপ্রতিরোধ্য ডিফেন্সিভ দল গড়ে তুলেছিল, যা হয়তো আগামী বহু বছরের ফুটবলের রণকৌশলে বড় প্রভাব ফেলবে। ফাইনালে আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলের সব রকমের আক্রমণভাগ যেভাবে স্প্যানিশরা আটকে দিয়েছে, তা যেকোনও নতুন খেলোয়াড়দের জন্য দারুণ শিক্ষণীয় হতে পারে।

স্পেনের দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের মাধ্যমে শেষ হল ২০২৬-এর বিশ্বকাপ ফুটবল আসর। ট্রফি জয়ের পর যখন স্পেনের খেলোয়াড়েরা যৌথভাবে মঞ্চে উল্লাস করছিলেন, তখন তা কেবল ট্রফি জেতার আনন্দ ছিল না, বরং আধুনিক ফুটবলে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করার নতুন প্রতিশ্রুতি ছিল। এই সোনালী প্রজন্ম আগামীতেও ফুটবল বিশ্বে নিজেদের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

Post Comment

You May Have Missed