বেলা ২টো থেকে শুরু হয় গরু ছোটানো…! বিজয়া দশমীতে নিরল গ্রামের বিরল প্রথা কী জানেন? শুনলেই চমকে উঠবেন!

Last Updated:

কোন গরু কত জোরে ছোটে? ৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য! পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের নিরল গ্রামে প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য মেনে বিজয়া দশমীর বিকেলে আয়োজিত হল গরু ছোটানো। কৃষিজীবী গ্রামের অতীত ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই প্রথা।

বেলা ২টো থেকে শুরু হয় গরু ছোটানো
বেলা ২টো থেকে শুরু হয় গরু ছোটানো

কেতুগ্রাম, পূর্ব বর্ধমান, বনোয়ারীলাল চৌধুরী: আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলেছে গ্রামের চেহারা, কংক্রিটের রাস্তা এসেছে, কমেছে বাড়িতে গরু-মোষ পালনের চল। তবুও মুছে যায়নি প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য। বিজয়া দশমীর বিকেলে পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের নিরল গ্রামে আজও আয়োজিত হয় গরু ছোটানো। শুধু উৎসব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিজীবী গ্রামের অতীত, পশুর শক্তি প্রদর্শন এবং ঠাকুর বিসর্জনের পথ শুদ্ধ করার লোকবিশ্বাস।

স্থানীয় বাসিন্দা রতন চক্রবর্তী জানান, দীর্ঘদিন ধরেই নিরল গ্রামে এই রীতি চলে আসছে। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর বেলা ২টো থেকে শুরু হয় গরু ছোটানো। গ্রামের যাঁদের বাড়িতে গরু, ষাঁড় বা মোষ রয়েছে, তাঁরাই এই আয়োজনে অংশ নেন। বর্তমানে গরুর সংখ্যা কমলেও এখনও ৫০টির বেশি গরু-মোষ অংশ নেয়। সংখ্যাটি ১০০-র কাছাকাছি পৌঁছয় বলেও জানান তিনি।

রতন চক্রবর্তীর বক্তব্য,“আগে নিরল গ্রাম ছিল কৃষিপ্রধান। অনেক বাড়িতেই চাষের কাজে ব্যবহারের জন্য ষাঁড়, গরু ও মোষ পোষা হত। গরু ছোটানোর মধ্যে দিয়ে কোন পশু কত দ্রুত ছুটতে পারে, কার পশুর শক্তি কতটা, তারও একটা প্রদর্শনী হত। এভাবেই ধীরে ধীরে এই রীতি প্রতিযোগিতার রূপ নেয়।” এই প্রথার পিছনে রয়েছে আরও একটি লোকবিশ্বাস। রতন চক্রবর্তীর কথায়, ঠাকুর বিসর্জনের রাস্তা দিয়ে গরু ছোটানোর সময় পশুর গোবর পড়ত। পরে সেই রাস্তা পরিষ্কার করা হত। গোবরের মাধ্যমে রাস্তা শুদ্ধ হয়ে যায়,এমন ধারণা থেকেই নাকি এই প্রথার প্রচলন। যদিও এর সঠিক ঐতিহাসিক উৎস নিয়ে একাধিক মত রয়েছে।

নিরল গ্রামের বাসিন্দা অর্ণব মুখোপাধ্যায়ও গরু ছোটানোর কৃষিভিত্তিক তাৎপর্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, “চাষের কাজে কোন গরু বা মোষ কতটা ভাল, তাদের শক্তি ও সক্ষমতা কেমন, তা প্রদর্শন করাই এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। যে রাস্তা দিয়ে ঠাকুর বিসর্জন হয়, সেই রাস্তা দিয়েই গরু ছোটানো হয়। গোবরের মাধ্যমে রাস্তা শুদ্ধ হয় বলেও লোকবিশ্বাস রয়েছে।”গরু ছোটানোর পর হয় ‘সং’ স্থানীয় ভাষায় পরিচিত হাস্যরসাত্মক পথনাটিকা। এরপর প্রতিমা বিসর্জনের পালা। অর্থাৎ, গরু ছোটানো, সং এবং বিসর্জন এই তিন পর্বকে ঘিরেই দশমীর দিন নিরল গ্রামে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।

তবে সময়ের সঙ্গে এই ঐতিহ্যের সামনে এসেছে নানা বাধা। পাকা ও কংক্রিটের রাস্তা এবং গবাদি পশুর সংখ্যা কমে যাওয়ায় আগের তুলনায় আয়োজনের পরিসরও সংকুচিত হয়েছে। তবুও বন্ধ হয়নি প্রায় তিন শতাব্দী ধরে চলে আসা এই রীতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লোকাচারকে বাঁচিয়ে রেখেছেন গ্রামের বাসিন্দারা। আধুনিকতার ভিড়ে নিরলের এই গরু ছোটানো তাই শুধু একটি উৎসব নয়, কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জীবনের ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতিরও এক জীবন্ত নিদর্শন।

Post Comment

You May Have Missed