বর্ষসেরা আম্পায়ার বাছা নিয়ে বেনজির সংঘাত সিএবি-তে, নাম ঘোষণা করেও বাতিল! আসরে সৌরভ
সন্দীপ সরকার, কলকাতা: আগামী ৭ সেপ্টেম্বর সিএবির (CAB) জমকালো বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মঞ্চে যখন বর্ষসেরা আম্পায়ারের নাম ঘোষণা করা হবে, তখন কি ধনধান্য অডিটোরিয়াম কিছুক্ষণের জন্য হলেও টানটান নাটক দেখার অপেক্ষায় স্তব্ধ হয়ে যাবে?
সিএবি-র বর্ষসেরা আম্পায়ার বাছাই করা নিয়ে যা হচ্ছে, তাকে নাটক বললেও হয়তো কম বলা হয়। বরং বলা উচিত থ্রিলার। যেখানে বৈঠক করে মোট পাঁচটি বিভাগের জন্য় সেরা আম্পায়ার নির্বাচন করা হয়। কিন্তু পরে সিএবি-র একাংশের তীব্র প্রতিবাদে সেই সিদ্ধান্তই বদলে যাওয়ার পথে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। সিএবির সদ্য প্রাক্তন এক কর্তা কাঠগড়ায় তুলছেন আম্পায়ার কমিটির চেয়ারম্য়ানকে। সেই কর্তার বিরুদ্ধে পাল্টা দুর্নীতি করার বোমা ফাটাচ্ছেন আম্পায়ার কমিটির প্রধান।
ঠিক কী হয়েছে?
দিনকয়েক আগে সিএবি-তে একটি বৈঠক হয়। আলোচ্যসূচিতে ছিল, বর্ষসেরা আম্পায়ার নির্বাচন। সেই বৈঠকে ছিলেন সিএবি ভাইস প্রেসিডেন্ট নীতীশরঞ্জন (অনু) দত্ত, সচিব বাবলু কোলে, কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাস, আম্পায়ার কমিটির চেয়ারম্য়ান প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (বালু) ও তাঁর সাব কমিটির কয়েকজন সদস্য। সেই বৈঠকে ঠিক হয়, বিসিসিআই বিভাগে বর্ষসেরা আম্পায়ার হবেন কৃষ্ণেন্দু পাল। গ্রেড ওয়ান বিভাগে সেরা আম্পায়ার হিসাবে যুগ্মভাবে সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় ও অদীপ্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম ঠিক হয়। এছাড়া গ্রেড টু বিভাগে সুজয় দাস, গ্রেড পি বিভাগে অনিমেষ পাল ও সেরা প্রতিশ্রুতিমান আম্পায়ার হিসাবে স্বর্ণেন্দু পালের নাম চূড়ান্ত হয়। সিএবি-র আম্পায়ারদের গ্রুপে সেই তালিকা পোস্টও হয়ে যায় (যে পোস্টের স্ক্রিনশট রয়েছে এবিপি লাইভ বাংলার হাতে)।
গোলমালের শুরু এরপরেই। সেই তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর সিএবি-র সদ্যপ্রাক্তন যুগ্মসচিব মদনমোহন ঘোষ প্রশ্ন তোলেন। সন্দেহ প্রকাশ করে বলতে থাকেন, এই তালিকা পক্ষপাতদুষ্ট। বিশেষ করে গ্রেড ওয়ান বিভাগের সেরা আম্পায়ার বাছাইয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে জোরাল প্রশ্ন তোলেন তিনি। সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ও সচিব বাবলু কোলেকে সরাসরি অভিযোগ করেন। পাশাপাশি প্রশ্ন করেন, কীভাবে দুজন সেরার পুরস্কার পান! তারপরই হস্তক্ষেপ করেন সৌরভ। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, সৌরভ আপাতত বর্ষসেরা আম্পায়ার নির্বাচন স্থগিত রাখতে বলেছেন। কয়েকদিনের মধ্যে তিনি নিজে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলেছেন।
কিন্তু তাতে বিতর্ক থামছে না। বরং বেনজির সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে। যেখানে একে অপরের বিরুদ্ধে তোপ দাগছেন মদন ও প্রসেনজিৎ। মদন পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপোষণের অভিযোগ তুলছেন প্রসেনজিতের বিরুদ্ধে। প্রসেনজিৎ পাল্টা মদনের মাটি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার প্রসঙ্গ তুলে তাঁর ভাবমূর্তিকেই কাঠগড়ায় তুলছেন।
গোটা ঘটনা নিয়ে সিএবি-র সদ্যপ্রাক্তন যুগ্মসচিব মদন ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। লোঢা কমিটির সুপারিশ মেনে বয়স সত্তর পেরিয়ে যাওয়ায় যিনি পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। মদন এবিপি লাইভ বাংলাকে বললেন, ‘আমি এখন পদে নেই। তাই বেশি কিছু বলতে চাই না। শুধু এটুকুই বলব যে, সেরা আম্পায়ার করা হচ্ছিল এমন একজনকে, যে সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভুরি ভুরি অভিযোগ। যুগ্মসচিব থাকাকালীন আমি আম্পায়ার পোস্টিং করতাম। ওঁর বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ ছিল। সম্প্রতি যত বিতর্কিত ম্যাচ হয়েছে ময়দানে, তার বেশিরভাগই খেলিয়েছেন সুবীর। এমনই পরিস্থিতি হয় যে, গত মরশুমে রেলিগেশন ও চ্যাম্পিয়নশিপের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্ব পরিচালনা করার জন্য ২০ জন আম্পায়ারের একটি পুল তৈরি করেন সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। সেখানে সুবীরের নাম ছিল না। এরকম একজন কী করে সর্বোচ্চ নম্বর পেতে পারে! প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় আগেও এই আম্পায়ারকে নিয়ে গলা ফাটিয়েছেন। প্রসেনজিতের বিরুদ্ধেও অনেক ক্লাবের অভিযোগ রয়েছে। আমি নিজের খটকা সিএবি প্রেসিডেন্ট ও সচিবকে জানাই।’
মদনের অভিযোগ, ‘সুবীর ৯৩.১০ নম্বর পেয়েছিলেন। অদীপ্ত সেখানে ৯৩ পান। তা জানতে পেরেই আমার সন্দেহ হয়। সুবীরের মতো কেউ কী করে এত কম ম্যাচ খেলিয়ে আর এত বিতর্ক নিয়ে এত নম্বর পেতে পারেন! সিএবি পদাধিকারীরা রিভিউ করে দেখেন, অনেক কম নম্বর পেয়েছেন সুবীর। আমার তো মনে হয় প্রসেনজিৎ পক্ষপাতিত্ব করেছেন।’
মদন পদে থাকাকালীনও আম্পায়ার পোস্টিং নিয়ে প্রসেনজিতের সঙ্গে অশান্তি হয়েছিল। এমনকী শোনা যায়, প্রসেনজিৎকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন মদন। অপসারিত যুগ্মসচিব রাখঢাক না করেই বলছেন, ‘ময়দানের সকলেই ওঁর কীর্তির কথা জানেন। আমিও ওঁকে সেই কারণেই পছন্দ করি না।’ কোনও কোনও শিবির থেকে এমনও ভাসিয়ে দেওয়া হয় যে, সেরা আম্পায়ার নির্বাচন নিয়ে কোনও লেনদেন হয়নি তো? আম্পায়ারদের গ্রেডেশনেও কারচুপির অভিযোগ তুলছেন কেউ কেউ।
অভিযোগ শুনে প্রসেনজিৎ কার্যত ফেটে পড়লেন। এবিপি লাইভ বাংলাকে বললেন, ‘প্রথমত, সেরা আম্পায়ার কে হবেন, সেটা তো আনুষ্ঠানিক বৈঠকে ঠিক হয়েছে। যে বৈঠকে সিএবি ভাইস প্রেসিডেন্ট, সচিব, কোষাধ্যক্ষরা ছিলেন। সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আমার সিদ্ধান্ত ছিল না। দ্বিতীয়ত, আম্পায়ারদের নম্বর তো কম্পিটারাইজ়ড। সিএবি-র আইটি টিমের দেওয়া ডেটা হাতে নিয়েই আমরা আলোচনা করেছিলাম। নম্বরে গরমিল থাকলে তো বলতে হয় সিএবি-র কম্পিউটার সিস্টেমটাই ভুল। আর তাই যদি হয়, তা হলে একজনের জন্যই শুধু ভুল করবে সিস্টেম?’
প্রসেনজিৎ সুর চড়িয়ে বললেন, ‘মদন ঘোষ কয়েকজন আম্পায়ারকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করতেন না। তাঁদের ম্যাচ পোস্টিং দিতে চাইতেন না। ওঁর ব্যক্তিগত রাগের কারণে এসব করছেন। তাছাড়া উনি এখন অপসারিত। লোঢা কমিটির নিয়মে বাতিল। আমি তো শুনেছি ওঁকে যাতে সমস্ত ডেটা দেওয়া হয়, তার জন্য মদন ঘোষ সিএবির ডেটা টিমকে হুমকি দিয়েছেন। অপসারিত হয়েও সত্তোরোর্ধ্ব মদন ঘোষ কী করে এসব করতে পারেন?’
এখানেই শেষ নয়। প্রসেনজিৎ আরও বললেন, ‘যে সুবীরকে নিয়ে এত কথা বলা হচ্ছে, তাঁকে তাহলে বেঙ্গল টি-২০ লিগের ম্যাচ দেওয়া হয়েছিল কেন? আর সেই পোস্টিং দিয়েছিলেন স্বয়ং মদন ঘোষ। আর লেনদেনের কথা বলা হচ্ছে। জীবনে কারও থেকে টাকা নিয়ে এক কাপ চা পর্যন্ত খাইনি। মদন ঘোষের বিরুদ্ধে তো মাটি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। দরকার হলে সেগুলো সামনে আনব। আমি আর যাই হই মাটি চোর নই।’
মদনও ছাড়ার পাত্র নন। পাল্টা বললেন, ‘আমি যদি মাটি নিয়ে দুর্নীতি করে থাকি, তাহলে উনি সেটা প্রমাণ করুন। আর প্রসেনজিৎ একজন আম্পায়ারকে দিয়ে আমাকে হেনস্থা করার চেষ্টা করেছিলেন। পরে সেই আম্পায়ার আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে চিঠিও দেন।তাছাড়া আমি ডেটার জন্য কাউকে হুমকি দিইনি। আমার পদের মেয়াদ শেষ। আমি অভিযোগ সিএবি পদাধিকারীদের জানিয়েছিলাম। তাঁরাই ব্যবস্থা করেছেন।’
সিএবি সচিব বাবলু কোলেকে এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে বললেন, ‘বর্ষসেরা আম্পায়ার সব বিভাগে একজন করেই হবেন। প্রেসিডেন্ট নিজে এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। দু-একদিনের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে।’
সব মিলিয়ে ম্যাচ পরিচালনা করা যাঁদের দায়িত্ব, সেই আম্পায়ারদের মধ্যে সেরা কে তা বাছা নিয়ে বেনজির সংকটে সিএবি।
Post Comment