ফিরলেন নেইমার, দুর্ষর্ধ ভিনি, স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে নকআউটে পৌঁছল ব্রাজিল
Football
-Ritesh Ghosh
লড়াইটা শুধু ছিল গ্রুপ পর্ব টপকানোর নয়, লড়াইটা ছিল নিজেদের হারিয়ে যাওয়া রাজকীয় ছন্দ খুঁজে পাওয়ার। বুধবার মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে সেই চেনা ছন্দেই ধরা দিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। এই দাপুটে জয়ের হাত ধরে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে চলতি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের জায়গা পাকা করে নিল হলুদ জার্সি। মাঠজুড়ে যখন সাম্বার ঝড় বইছিল, তখন গ্যালারিতে কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল একজনেরই নাম— নেইমার জুনিয়র।
ম্যাচের প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই স্কটিশ রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল ব্রাজিলের আক্রমণভাগ। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের জোড়া গোল ও প্রথমার্ধেই ব্রাজিলের দাপুটে ফুটবল ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাথিউস কুনিয়ার চমৎকার ফিনিশিংয়ে সহজ জয় তুলে নেয় ব্রাজিল। স্কটল্যান্ড গোল পরিশোধের জন্য কিছু আক্রমণ করলেও সেলেসাওদের জমাট রক্ষণের সামনে তা ভেস্তে যায়।

এই ম্যাচে ব্রাজিলের দর্শকদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দের মুহূর্ত ছিল দলের প্রাণভোমরা নেইমার জুনিয়রের মাঠে ফেরা। দীর্ঘ ৯৮১ দিন পর আবারও ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচে পা রাখলেন এই তারকা ফরোয়ার্ড। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে চোটের কারণে জাতীয় দল থেকে ছিটকে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ডান পায়ের কাফ ইনজুরির কারণে চলতি বিশ্বকাপের প্রথম দুটি ম্যাচেও ডাগআউটে বসে কাটাতে হয়েছে নেইমারকে।
ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে যখন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেইমার মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার সমর্থক উল্লাসে ফেটে পড়েন। মাঠের সাইডলাইনে তাঁর ওয়ার্ম-আপ করার দৃশ্য দেখেই শুরু হয়েছিল গ্যালারির গর্জন। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সাথে সাথেই মাঠের মাঝেই কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় নেইমারকে। চোখের এই জল কেবল বিজয়ের আনন্দ ছিল না, তা ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের আবেগ।
ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ইতিমধ্যেই নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়েছেন নেইমার। ১৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে বর্তমানে তাঁর গোলসংখ্যা ৭৯। এর আগে তিনটি ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ৮টি গোল করেছেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফুটবলার। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন নকআউট পর্বের কঠিন লড়াইয়ের ঠিক আগে ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নেইমারের প্রত্যাবর্তনের রাতে মাঠের ভিতরে মূল আলো কেড়ে নিয়েছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। ম্যাচের মাত্র সপ্তম মিনিটে দুর্দান্ত এক শটে স্কটল্যান্ডের জাল কাঁপিয়ে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন তিনি। এরপর প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে ব্যক্তিগত দ্বিতীয় গোলটি করে ম্যাচ থেকে প্রতিপক্ষকে ছিটকে দেন। চলতি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই গোলের দেখা পেলেন এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।
এই জোড়া গোলের সুবাদে টুর্নামেন্টে নিজের গোলসংখ্যা চারে নিয়ে গেলেন ভিনি। এর মাধ্যমে তিনি গোলদাতার তালিকায় নরওয়ের আর্লিং হালান্দ এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের পাশে বসলেন। তাদের সামনে এখন কেবল রয়েছেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, যিনি পাঁচটি গোল নিয়ে গোলদাতার তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন। ভিনির এই বিধ্বংসী ফর্ম ব্রাজিলের সমর্থকদের মনে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন আরও জোরালো করছে।
স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপে এক অনন্য ধারাবাহিকতার ইতিহাস স্পর্শ করল ব্রাজিল। টানা ১৫ বারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিল লাতিন আমেরিকার এই ফুটবল পরাশক্তি। গ্রুপ ‘সি’ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ব্রাজিল পরের পর্বে গেলেও এই গ্রুপ থেকে রানার্সআপ হিসেবে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে আফ্রিকান জায়ান্ট মরক্কো। গ্রুপের শেষ ম্যাচে তারা হাইতির বিরুদ্ধে ৪-২ ব্যবধানে রোমাঞ্চকর জয় তুলে নিয়েছে।
দীর্ঘ ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল স্কটল্যান্ড। মাঠের পারফরম্যান্সে বিদায়ঘণ্টা বাজলেও পুরো টুর্নামেন্টে স্কটিশ সমর্থকরা ফুটবল বিশ্বের নজর কেড়েছেন। ‘ট্যাটার্ন আর্মি’ নামে পরিচিত স্কটিশ সমর্থকরা বোস্টন ও মায়ামির রাজপথ থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের চারপাশ উৎসবের আঙিনায় পরিণত করেছিলেন। দল হারলেও তাদের এই চোখধাঁধানো উপস্থিতি টুর্নামেন্টে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেছে।
তবে ফুটবলের মাঠের বাস্তবতার কাছে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আবারও হার মানতে হয়েছে স্কটিশদের। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মোট নয়বার অংশ নিলেও একবারও গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারল না স্কটল্যান্ড। প্রতিটি বৈশ্বিক আসরেই প্রথম পর্ব থেকে বিদায়ের একরাশ হতাশা নিয়ে তাদের ফিরে যেতে হয়েছে। ব্রাজিলের আক্রমণভাগের শক্তির সামনে শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয় ইউরোপের এই দেশটি।
স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ পর্বের মিশন দারুণভাবে শেষ করল ব্রাজিল ফুটবল দল। তবে আসল পরীক্ষা শুরু হচ্ছে এখন থেকেই, কারণ নকআউট পর্বে একটি ছোট ভুলও টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিতে পারে যেকোনো দলকে। নেইমারের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারের দলে ফেরা এবং ভিনিসিয়াসের অসামান্য ফর্ম শেষ ষোলোের লড়াইয়ের আগে সেলেসাওদের অনেক বেশি স্বস্তিতে রাখবে। পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর এখন থাকবে ব্রাজিলের পরবর্তী ম্যাচের রণকৌশলের দিকে।


Post Comment