প্রকাশিত রাজ্য জয়েন্ট ২০২৬ এর ফলাফল, জানুন মেধাতালিকায় কে এগিয়ে?
West Bengal
-Ritesh Ghosh
পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র ২৫ দিনের মাথায় অবশেষে প্রকাশিত হল চলতি বছরের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য জয়েন্ট এন্ট্রান্স বা ডব্লিউবিজেইই পরীক্ষার ফলাফল। রেকর্ড সময়ে এই বছরের ফলাফল প্রকাশ করল পশ্চিমবঙ্গ জয়েন্ট এন্ট্রান্স এগজামিনেশন বোর্ড। বোর্ডের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মেনেই বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এই বছর মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে সল্টলেকের বাসিন্দা তথা নালন্দা অ্যাকাডেমির ছাত্র শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন।
বিস্ময়কর বিষয় হল, কড়া নিরাপত্তা এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে দিয়ে গত ২৪ মে রাজ্য জুড়ে এই প্রবেশিকা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যাচ্ছে, কলকাতার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের একাধিক দূরবর্তী ভিনজেলা থেকেও পড়ুয়ারা প্রথম দশের মেধাতালিকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে।

ডব্লিউবিজেইই ২০২৪ এর প্রথম দশের মেধা তালিকা
| স্থান | পরীক্ষার্থীর নাম | অঞ্চল/শহর | বিদ্যালয়/শিক্ষা প্রতিষ্ঠান |
|---|---|---|---|
| প্রথম | শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় | সল্টলেক | নালন্দা অ্যাকাডেমি |
| দ্বিতীয় | সৌঋদ্ধ মণ্ডল | বিষ্ণুপুর | বিবেকানন্দ মিশন স্কুল, জোকা |
| তৃতীয় | উমঙ্গ ভুট | রানিগঞ্জ | পূর্ব ইন্টারন্যাশনাল স্কুল |
| চতুর্থ | রাহুল কোনার | নিউটাউন | দিল্লি পাবলিক স্কুল |
| পঞ্চম | সর্বান ভট্টাচার্য | বীজপুর | গার্ডেন হাই স্কুল |
| ষষ্ঠ | আরহা ভট্টাচার্য | চন্দ্রকোনা | চন্দ্রকোনা জিরাট হাইস্কুল |
| সপ্তম | সৃজন শুর | শিবপুর | সাউথ পয়েন্ট হাইস্কুল |
| অষ্টম | মণীশ সেনাপতি | কোতয়ালি, পশ্চিম মেদিনীপুর | মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল |
| নবম | সব্যসাচী লস্কর | সোনারপুর | বিডিএম ইন্টারন্যাশনাল |
| দশম | দেবজিৎ পাল | বালিগঞ্জ | সাউথ পয়েন্ট হাইস্কুল |
বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, সফল পরীক্ষার্থীরা এদিন বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টে থেকে নিজেদের ব্যক্তিগত ব়্যাঙ্ক কার্ড ডাউনলোড করার সুযোগ পাবেন। পশ্চিমবঙ্গ জয়েন্ট এন্ট্রান্স বোর্ডের দুটি নির্দিষ্ট এবং নির্ভরযোগ্য সরকারি ওয়েবসাইট— www.wbjeeb.nic.in এবং www.wbjeeb.in এর মাধ্যমে সরাসরি এই ফল জানতে পারবেন তারা। প্রতিটি পরীক্ষার্থীকে সতর্কতার সঙ্গে তাদের নিজস্ব রোল নম্বর এবং জন্মতারিখ ব্যবহার করে লগ ইন করে এই ডিজিটাল কার্ড সংগ্রহ করে নিজেদের কাছে রেখে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মেধাতালিকা ও ব়্যাঙ্ক কার্ডের এই আনুষ্ঠানিক প্রকাশের পর এখন পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের নজর রয়েছে আগামী ভর্তি পরিক্রমা ও কাউন্সেলিং পর্বের উপর। পর্ষদ সূত্রের বিশেষ খবর, আগামী শিক্ষাবর্ষের জটিলতা এড়াতে এবং নির্দিষ্ট সময়ে পঠনপাঠন শুরু করার লক্ষ্যে চলতি জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই শুরু হয়ে যেতে পারে ইন্টারঅ্যাক্টিভ কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া। অনলাইনে কয়েকটি ধাপে আয়োজিত এই কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা তাদের ব়্যাঙ্ক অনুযায়ী কলেজ ও বিষয় নির্বাচন করতে পারবেন।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রতি বছর রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি এবং অনুদানপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্নাতক স্তরে ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনোলজি, ফার্মাসি এবং আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশোনা করার প্রবেশদ্বার খুলে যায়। রাজ্য জুড়ে থাকা উচ্চমানের কারিগরি শিক্ষার আসনগুলিতে মেধাবী প্রার্থীদের যোগ্যতা অনুযায়ী ভর্তি করার ক্ষেত্রে এই বোর্ডের মূল্যায়নের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
এই বছরের পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বোর্ড যে তথ্য সাজিয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে বিজ্ঞান বিভাগের কারিগরি পড়াশোনায় পড়ুয়াদের আগ্রহ কতটা জোরালো। পরিসংখ্যানে প্রকাশ, এ বারের পরীক্ষায় নথিভুক্ত বা রেজিস্ট্রেশন করান মোট ১ লক্ষ ২০ হাজার ৮৫৬ জন পড়ুয়া। চরম প্রতিযোগিতামূলক এই আবহে সারা রাজ্যের পরীক্ষা কেন্দ্রগুলিতে স্বশরীরে প্রবেশ করে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন ৯৪ হাজার ৯০১ জন ছাত্রছাত্রী।
লিঙ্গভিত্তিক অংশগ্রহণের দিকে তাকালে দেখা যায়, মোট পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রের সংখ্যা ছিল ৬৭ হাজার ৩৭৮ জন এবং ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ৫২১ জন। এ ছাড়া এ বারের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ২ জন তৃতীয় লিঙ্গের পরীক্ষার্থীও। মোট ৯২ হাজার ৭৩ জন পরীক্ষার্থীকে র্যাঙ্ক কার্ড দিয়ে মেধাতালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে, যা তাঁদের স্বপ্নের কেরিয়ার গড়ার পথকে আরও এক ধাপ সুগম করবে।
পরীক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে নির্বিঘ্ন করতে এ বছর মোট ২৬৭টি কেন্দ্র তৈরি করেছিল পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা বোর্ড। ভৌগোলিক পরিবেশ বিবেচনা করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ২৬৪টি কেন্দ্র পরিচালনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ত্রিপুরার আগরতলায় ২টি কেন্দ্র এবং অসমের গুয়াহাটিতে ১টি বিশেষ পরীক্ষা কেন্দ্র খোলা ছিল। ভিনরাজ্যের এই তিনটি কেন্দ্র থেকেও বহিরাগত পড়ুয়ারা সুষ্ঠুভাবে বঙ্গীয় জয়েন্টে অংশ নিতে পেরেছেন।
চলতি বছরের রাজ্য জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সততা এবং প্রশাসনিক জিরো-টলারেন্স নীতি বজায় রাখতে নজিরবিহীন কড়া নিরাপত্তা বলয় প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল ফোন, ক্যালকুলেটর, অত্যাধুনিক স্মার্ট ওয়াচ বা ব্লুটুথ ডিভাইসের মতো যে কোনো প্রকারের ছোট বা বড় ইলেকট্রনিক গ্যাজেট সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছিল। প্রতিটি কেন্দ্রে বিশেষ তল্লাশি ও কঠোর নজরদারি চালানো হয়, যার সুফল মিলেছে প্রশ্ন ফাঁসের আশঙ্কা এড়ানোর ক্ষেত্রে।
শুধুমাত্র শারীরিক প্রতিরক্ষায় নয়, পরীক্ষা পরিচালন সংক্রান্ত পদ্ধতিতে এ বছর প্রথমবার যুক্ত হয়েছে মাল্টিপল ওএমআর শিট ব্যবস্থা। প্রযুক্তি ও খাতার নিখুঁত মূল্যায়নের কাজে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে পরীক্ষার্থীদের ওএমআর শিট মূল্যায়ন করা গেছে দ্রুততম সময়ে। এছাড়া ছাত্রছাত্রীদের উদ্বেগের কথা ভেবে বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রভিশনাল অ্যানসার কি বা প্রাথমিক খসড়া উত্তরপত্র আপলোড করার অভিনব পদক্ষেপও দারুণ প্রশংসিত হয়েছে শিক্ষা মহলে।
প্রাথমিক উত্তরপত্রের ভিত্তিতে যেকোনো ছাত্র বা ছাত্রী চাইলে তাদের আপত্তি ও পুনর্বিবেচনার দাবি অনলাইনের মাধ্যমে বোর্ডে নথিভুক্ত করতে পেরেছিলেন। পড়ুয়াদের সেই সমস্ত ধোঁয়াশা এবং তোলা আপত্তি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনার পরেই বোর্ডের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ও নির্ভুল ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। বোর্ডের এই গতিশীল ও নিখুঁত মূল্যায়ন নীতি ছাত্র সমাজের আস্থা ও বোর্ডের প্রতি সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
মাত্র ২৫ দিনের রেকর্ড সময়ের মাথায় ফলাফল প্রকাশ করায় স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবককেরা। শিক্ষাবিদদের মতে, সময়ের পূর্বে এই মেধার মূল্যায়ন সামগ্রিকভাবে সেশন জট বা শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ইতি টানবে। ফলে এবার স্নাতক স্তরে কারিগরি এবং প্রযুক্তির উচ্চশিক্ষায় রাজ্যে নতুন কর্মসংস্থান এবং প্রতিভার সঠিক বিকাশ বহুলাংশে সহজতর হবে বলেই আশা করছে অভিজ্ঞ শিক্ষামহল।



Post Comment