পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমাল এই সংস্থা! লিটারে কত কমল দাম?

পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমাল এই সংস্থা! লিটারে কত কমল দাম?

Business

-Ritesh Ghosh

দেশের সাধারণ জ্বালানি গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এল দেশের বৃহত্তম বেসরকারি তেল বিক্রেতা সংস্থা নায়ারা এনার্জি। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত খনিজ তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার সুফল সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবার দেশজুড়ে নিজেদের পাম্পগুলিতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম এক ধাক্কায় বেশ কিছুটা কমিয়ে দিল এই শক্তিশালী বেসরকারি সংস্থাটি। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ৫ টাকা এবং প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৩ টাকা কমছে।

খুচরো জ্বালানির বাজারে গত দুই বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথম কোনও তেল বিপণনকারী সংস্থা গ্রাহকদের জন্য দাম কমানোর মতো সাহসী পদক্ষেপ নিল। এর আগে বিশ্বজুড়ে নানাবিধ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই মূল্যহ্রাস সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ঘটনাচক্রে, চলতি বছরের মার্চ মাসেই বিশ্ববাজারের টানাপোড়েনের অজুহাতে নায়ারা পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়েছিল। তখন তারা লিটারে যথাক্রমে ৫ টাকা ও ৩ টাকা দাম বৃদ্ধি করেছিল, যা এবার পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হল।

Nayara Energy fuel station price reduction sign

জানা গিয়েছে, নায়ারা এনার্জির এই সংশোধিত এবং হ্রাসকৃত নতুন মূল্য দেশজুড়ে থাকা তাদের ৭ হাজারেরও বেশি জ্বালানি বিক্রয় কেন্দ্রে কার্যকর করা হয়েছে। তবে পাম্প স্তরে পেট্রোল ও ডিজেলের চূড়ান্ত বিক্রয় মূল্য সমস্ত রাজ্যে এক নাও হতে পারে। বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব শুল্ক কাঠামো, ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) এবং স্থানীয় পরিবহণ খরচের পার্থক্যের কারণে গ্রাহকদের হয়তো সামান্য ভিন্ন দামে জ্বালানি কিনতে হতে পারে। তা সত্ত্বেও এই মূল্যহ্রাস দেশের বাজারকে নতুন করে সচল করবে।

বেসরকারি ক্ষেত্রে এমন স্বস্তিদায়ক ঘোষণা এলেও দেশের সরকারি তথা রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলির দামের সারণীতে কোনও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। ভারতের খুচরো জ্বালানি বাজারের ৯০ শতাংশেরও বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (আইওসি), ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (বিপিসিএল) এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (এইচপিসিএল)। এই তিনটি বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এখনও পর্যন্ত পেট্রোল বা ডিজেলের খুচরো বাজারে কোনও মূল্য পরিশোধনের ঘোষণা করেনি। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাম্পের গ্রাহকদের এখনও পুরনো দামেই জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।

বিজনেস প্রোফাইল অনুযায়ী, নায়ারা এনার্জির মালিকানায় রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা রোজনেফটের বিশাল অংশীদারিত্ব রয়েছে। এই বহুজাতিক সংস্থাটি গুজরাটের ভাদিনারে অবস্থিত বার্ষিক ২০ মিলিয়ন টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ভারতের অন্যতম প্রধান তেল শোধনাগারটি পরিচালনা করে। সম্প্রতি শোধনাগারের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ হওয়ার পর সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে যে, গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে তাদের শোধন প্রক্রিয়া ও পরিবাহন নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

নায়ারা এনার্জির এই আকস্মিক মূল্যহ্রাসের নেপথ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের নাটকীয় পরিবর্তন। চলতি বছরের প্রথমার্ধে যখন পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছিল, তখন আন্তর্জাতিক মহলে খনিজ তেলের জোগান নিয়ে প্রবল সংশয় তৈরি হয়। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় সংকীর্ণ হরমূজ প্রণালী দিয়ে। সেই সময়ে ওই অঞ্চল দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছিল এবং তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে।

বর্তমানে হরমূজ প্রণালী এলাকায় উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ায় সমুদ্রপথে অপরিশোধিত খনিজ তেলের জোগান আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ওপেক ক্রুডের দামও স্থিতিশীল অবস্থায় নেমে এসেছে। সেই সুবাদেই নায়ারা তাদের ভাদিনার রিফাইনারি থেকে পরিশোধিত তেলের খরচে সাশ্রয় করার সুযোগ পেয়েছে এবং সেই লভ্যাংশের সুফল খুচরো বাজারে স্থানান্তরিত করতে সমর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে বিশ্ব বাজারের সরবরাহ স্থিতি দেশের সাধারণ জ্বালানি বাজারে কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে।

নরমপন্থী মনোভাবের জেরে আন্তর্জাতিক পরিবেশ শান্ত হতেই ভারত সরকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির উপর আরোপিত জ্বালানি বিক্রির বিশেষ কড়াকড়ি সম্পূর্ণরূপে তুলে নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে, বাল্ক বা পাইকারি গ্রাহকদের কাছে ডিজেল বিক্রির উপর যে নিয়ন্ত্রণ ছিল তা আর থাকছে না। একই সঙ্গে গাড়িপিছু দৈনিক সর্বাধিক ২০০ লিটার ডিজেল বিক্রির যে আইনিসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তাও বাতিল করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ১২ জুন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার পর দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার যাতে অরক্ষিত না হয়ে পড়ে, তার জন্য সাময়িকভাবে এই বিধিনিষেধ জারি করেছিল কেন্দ্র। এই অস্থায়ী ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল খুচরো গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষা করা এবং বাজারে ডিজেলের ঘাটতি প্রতিরোধ করা। তবে বর্তমানে হরমূজ জলপথের সংকট কেটে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন নিশ্চিত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকার আগামী মাস থেকে মুক্ত বাজার নীতিতে ফিরে যাওয়ার এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বর্তমানে হায়দরাবাদ বা দেশের নানা মহানগরে জ্বালানির উচ্চ মূল্য সাধারণ নাগরিক এবং পণ্য পরিবহণ ক্ষেত্রে বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। এই আবহেই নায়ারার এই মূল্যহ্রাস বেসরকারি ক্ষেত্রে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বিশ্ববাজারে এই স্থিতিশীলতা স্থায়ী হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশের বড় তিনটি সরকারি সংস্থাও পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমাতে বাধ্য হতে পারে, যা সার্বিকভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভারতকে এক অভূতপূর্ব স্বস্তি দেবে।

Previous post

নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নয়! এসআইআর ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির দ্বারস্থ দেশের ২৩টি বড় বিরোধী রাজনৈতিক দল

Next post

North Bengal Weather Update: ২৪ ঘণ্টায় ভাসবে উত্তরবঙ্গ! দার্জিলিং-জলপাইগুড়িতে অতি ভারী বৃষ্টির লাল সতর্কতা, কেমন থাকবে বাকি সব জেলা?

Post Comment

You May Have Missed