নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নয়! এসআইআর ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির দ্বারস্থ দেশের ২৩টি বড় বিরোধী রাজনৈতিক দল
India
-Ritesh Ghosh
ভোটার তালিকা সংশোধনে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলল দেশের ২৩টি প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল। তাঁরা একযোগে ভারতের প্রধান বিচারপতির কাছে একটি বিশেষ আবেদনপত্র পাঠিয়েছেন। বিরোধীদের মূল অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ আচরণ করছে এবং এই বিশেষ সংক্ষিপ্ত ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে শাসকদল বিজেপিকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বাড়তি সুবিধা করে দিচ্ছে।
এই রাজনৈতিক পদক্ষেপটিকে কোনও রুটিন প্রতিবাদ হিসেবে দেখতে নারাজ রাজনৈতিক বিশারদেরা। কারণ এটি কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মতো একাধিক বৈচিত্র্যময় আঞ্চলিক ও জাতীয় শক্তিকে একাসনে এনে দাঁড় করিয়েছে। ভারতের গণতান্ত্রিক মূল কাঠামো ও মানুষের ভোটাধিকার হরণের যে চেষ্টা চলছে, তার বিরুদ্ধেই এই সম্মিলিত প্রতিরোধ বলে চিঠিতে অত্যন্ত জোরদারভাবে সওয়াল করা হয়েছে।

আসন্ন সংসদীয় বাদল অধিবেশন শুরুর ঠিক প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো এই যৌথ চিঠির পিছনে এক গভীর রণকৌশল রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের কাজে দেশের এক বিশাল বড় অংশের রাজনৈতিক শক্তির অনাস্থা প্রকাশ করা অত্যন্ত নজিরবিহীন ঘটনা। এই চিঠি স্বাভাবিকভাবেই ভারতের আইনসভা, শাসনবিভাগ এবং বিচার বিভাগের পারস্পরিক সম্পর্কের ভারসাম্যকে বর্তমান সময়ে আরও এক নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের ঘূর্ণাবর্তে টেনে এনেছে।
বিরোধীদের এই সম্মিলিত প্রতিবাদের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এমন কিছু বিরোধী শক্তিও এই চিঠিতে একাত্ম হয়েছে যারা সরাসরি ‘ইন্ডিয়া’ মহাজোটের অংশ নয়। তামিলনাড়ুর ডিএমকে এবং দিল্লির আম আদমি পার্টি গত ৮ জুনের প্রস্তুতিমূলক বৈঠকে অংশ না নিলেও, পরবর্তীতে এই যৌথ চিঠিতে সই করেছে। এই ঘটনা দেশে বিজেপি-বিরোধী আন্দোলনের ঐক্যকে আরও বেশি চাঙ্গা ও সুদৃঢ় করেছে।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ তাঁর অফিশিয়াল সামাজিক মাধ্যম হ্যান্ডেল ‘এক্স’-এ এক পোস্টে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, দেশের অন্যতম ২৩টি প্রধান রাজনৈতিক দল ছাড়াও একজন বিশিষ্ট নির্দল সাংসদ এতে সরাসরি সই করেছেন। বিচার ব্যবস্থার বিবেকের কাছে সরাসরি আবেদন করে বিরোধীরা প্রকারান্তরে এ দেশে অবাধ নির্বাচন আয়োজনের শেষ পথটি খোলা রাখতে চেয়েছেন।
চিঠিতে সই করা রাজনৈতিক নেতাদের তালিকাটি দেখলেই এর গুরুত্ব আঁচ করা সম্ভব। এর শুরুতেই রয়েছে সর্বভারতীয় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও প্রবীণ নেতা রাহুল গান্ধীর নাম। তালিকায় পরবর্তী স্থানেই স্বাক্ষর করেছেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সমাজবাদী পার্টির সর্বাধিনায়ক অখিলেশ যাদব, বিহারের প্রধান বিরোধী কণ্ঠস্বর তেজস্বী যাদব এবং ঝাড়খণ্ডের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের মতো জাতীয় ও রাজ্য স্তরের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ।
এদের পাশাপাশি জম্মু ও কাশ্মীরের প্রবীণ নেতা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এবং বামপন্থী শিবিরের একাধিক বর্ষীয়ান ব্যক্তিত্বও এতে সই করে কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। অপরদিকে বিশিষ্ট আইনজীবী এবং নির্দল সাংসদ কপিল সিব্বলের স্বাক্ষর সইসাবুদ পর্বে এই অভিযোগপত্রকে একটি মজবুত আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি প্রদান করেছে। কমিশন যেভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তা দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
যেকোনও উদার ও স্বাধীন গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল সৌন্দর্য হলো একটি ত্রুটিহীন এবং সম্পূর্ণ নির্ভুল ভোটার তালিকা। অথচ সেই ‘স্পেশাল সামারি রিভিশন’ বা বিশেষ সংক্ষিপ্ত ভোটার তালিকা সংশোধনের মূল কাজ নিয়েই নির্বাচন কমিশনের উদাসীনতা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। পক্ষপাতমূলক সংশোধনী ঘটিয়ে বহু যোগ্য ও আদি ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার এক মারাত্মক চক্রান্ত চলছে বলে তারা আশঙ্কা করছে।
এই অস্বচ্ছ ভোটার তালিকা প্রক্রিয়ার উদাহরণ দিতে গিয়ে বিরোধী শিবির বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বেশ কয়েকটি বিরোধী শাসিত রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছে। তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রে মৃত মানুষের নাম ভোটার তালিকায় বছরের পর বছর থেকে যাচ্ছে অথচ প্রকৃত ভোটারদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। ভোটার সংশোধনের নামে বুথ স্তরে একপেশে কাজ চালিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ছক তৈরি করা হয়েছে।
ভৌগোলিক পার্থক্য বা রাজ্যের গুরুত্ব অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দ্বিমুখী নীতি ও পক্ষপাত নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কোনো একক ও সংগতিপূর্ণ নিয়ম ছাড়া এই সংশোধনী চালানোর চরম অভিযোগ আনা হয়েছে বিরোধী চিঠিতে। বিহার এবং তামিলনাড়ুর মতো বৃহৎ রাজ্যগুলিতে এই সংশোধনের কাজ করার জন্য যে আকাশ-পাতাল ভিন্ন সময়সীমা ঠিক করা হয়েছে, তা চূড়ান্ত পক্ষপাত ও স্বেচ্ছাচারিতারই ইঙ্গিত বলে বিরোধীরা সোচ্চার হয়েছে।
কেবল বিরোধিতাই নয়, বরং বিচার ব্যবস্থার কাছে এক বাস্তবমুখী ও গঠনমূলক সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন এই ২৩টি দলের সম্মিলিত নেতৃবৃন্দ। তাঁদের সুস্পষ্ট আবেদন, প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপে নির্বাচন কমিশনকে এমন নির্দেশ দেওয়া হোক যাতে তারা দেশজুড়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং সুনির্ধারিত একটি জাতীয় নির্বাচনী ক্যালেন্ডার মেনে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে। এতে গোটা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং সমতা পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং তাঁর অধীনস্থ শীর্ষ আধিকারিকদের নিরপেক্ষতা ও তাদের কাজকর্মের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই আবার তুঙ্গে উঠল। এই স্পর্শকাতর আবেদনের পরিপেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আসন্ন দিনগুলিতে কোনও বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন কি না, তার ওপরেই নির্ভর করছে ভারতের নির্বাচনী সংস্কারের গতিপথ। রাজনীতির গতিপ্রকৃতি দেখে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্দোলনের এই উত্তাপ আগামী দিনেও বজায় থাকবে।


Post Comment