তারাতলায় গোডাউন বিপর্যয়ে বাড়ল মৃতের সংখ্যা, উদ্ধারকার্যে নামল ভারতীয় রেলও
Kolkata
-Ritesh Ghosh
তারাতলায় নির্মীয়মাণ গোডাউনের শেড ভেঙে পড়ার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫। এই ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখন পর্যন্ত ৩১ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গত বুধবারের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর থেকেই এলাকা জুড়ে চরম আতঙ্ক ও ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সেনা জওয়ান, এনডিআরএফ, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, কলকাতা পুলিশ এবং দমকল কর্মীরা যৌথভাবে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। এদিন তাতে যোগ দিয়েছে ভারতীয় রেলও।
যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চালানো এই উদ্ধার অভিযানে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার হওয়া সমস্ত শ্রমিককে এমার্জেন্সি গ্রিন করিডোর করে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে আহতদের জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে উদ্ধারকারীদের ভয়, ধ্বংসস্তূপের গভীরে এখনও অনেকে দমবন্ধ অবস্থায় থাকতে পারেন।

বুধবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া এই উদ্ধারকাজ সারারাত ধরে বিরামহীনভাবে চলেছে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, বিশাল লোহার কাঠামো ও ভারী শেডের নিচে আটকে পড়াদের অবস্থান চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে সেনাবাহিনী অত্যাধুনিক লাইফ ডিটেক্টর ও শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে কাজ করা বিশেষ ট্র্যাকিং যন্ত্র ব্যবহার করছে। এর ফলে কংক্রিট ও লোহার নিচে হৃদস্পন্দন থাকলে তা সহজে ধরা পড়ছে।
ঘটনাস্থলে মোতায়েন রয়েছে একাধিক ক্রেন, কাটার এবং হাইড্রোলিক জ্যাক। দমকল বাহিনী ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর জওয়ানরা খুব সতর্কতার সাথে লোহার অ্যাঙ্গেলগুলো কেটে আটকে থাকা শ্রমিকদের বের করে নিয়ে আসছেন। বিপর্যয়ের খবর পেয়েই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান পদস্থ পুলিশ আধিকারিক ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিরা। প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে শেষ ব্যক্তিকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত এই যৌথ অভিযান বন্ধ হবে না।
এই ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে কলকাতা পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে। তদন্তে জানা গিয়েছে, কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের মালিকানাধীন এই বিশাল জমিটি শম্ভুনাথ বেহেরা নামে এক ব্যবসায়ী গোডাউন বানানোর উদ্দেশ্যে লিজ নিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার পরেই বিপর্যয় মোকাবিলা আইনে মামলা রুজু করে মূল অভিযুক্ত শম্ভুনাথকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি ওই বেআইনি নির্মাণ কাজের সাথে যুক্ত আরও চার কর্মচারীকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে।
তদন্তকারীরা জানান, এই বিশাল বাণিজ্যিক গোডাউনটি তৈরির মূল বরাত পেয়েছিলেন ঠিকাদার অসগর হুসেন। বুধবারের দুর্ঘটনার পর থেকেই পরিবার এবং পুলিশের সাথে তাঁর কোনো যোগাযোগ ছিল না। অবশেষে বৃহস্পতিবার সকালে সেনা জওয়ানরা অত্যাধুনিক সেন্সর ব্যবহার করে লোহার ভারী গার্ডারের নিচ থেকে অসগরের মৃতদেহটি উদ্ধার করেন। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করায়, নির্মাণের কারিগরি ক্রুটি সংক্রান্ত অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পথ কঠিন হয়ে পড়েছে।
মৃতদের তালিকায় থাকা সদস্যদের পারিবারিক পরিচয় সামনে আসতেই এলাকায় শোকের ছায়া আরও ঘনীভূত হয়েছে। ১৭ বছর বয়সী কিশোর সাহিল সর্দারের গল্পটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আদতে ওই নির্মাণস্থলে কাজ করত না দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপের বাসিন্দা সাহিল। সেখানে কর্মরত তাঁর মামাতো ভাইয়ের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে বুধবারই সে প্রথমবার কলকাতা শহরে এসেছিল। কিন্তু নতুন শহর দেখার আনন্দ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চরম ট্র্যাজেডিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল।
অন্যদিকে, রুজিরুটির টানে গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় আসা পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার গাজীপুর এলাকার কুড়ি বছরের যুবক রোহিত চৌধুরীও এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। মাত্র দেড় মাস আগে একটি ঠিকাদার সংস্থার অধীনে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন রোহিত। বাড়ির বড় ছেলের আকস্মিক মৃত্যুর খবর পৌঁছতেই কান্নায় ভেঙে পড়েছে গোটা গাজীপুর গ্রাম। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রোহিতের বাবা-মা।
স্থানীয় মানুষ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এই গুদামটি তৈরির সময় কোনও ধরনের নিয়ম নীতি বা সুরক্ষা বিধির তোয়াক্কা করা হয়নি। নির্মাণকাজে যুক্ত থাকা শ্রমিকদের জন্য কোনো হেলমেট, সেফটি বেল্ট কিংবা উপযুক্ত পরিকাঠামো ছিল না। বড় মাপের শেড ধরে রাখার জন্য যে পরিমাণ শক্তিশালী পিলারের প্রয়োজন ছিল, তা হয়তো দেওয়া হয়নি। কলকাতা পুরসভা এবং পোর্ট ট্রাস্টের পক্ষ থেকেও নির্মাণ কাজের অনুমতিপত্র পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে বড় লোহার শেড তৈরির ক্ষেত্রে মাটির সহনশীলতা এবং পিলারের গভীরতা মাপা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তারাতলার এই ক্ষেত্রে সেই সমস্ত ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়মাবলীর চরম অবহেলা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। স্থানীয় দমকল কর্তাদের দাবি, নির্মাণের নকশাটি কোনো অনুমোদিত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা পরীক্ষিত ছিল না, যা দুর্ঘটনার প্রধান অনুঘটক হতে পারে।



Post Comment