কার্বন নিঃসরণ কমাতে অম্বুজা সিমেন্টসের যুগান্তকারী পদক্ষেপ! ভারতের সিমেন্ট শিল্পে বৈপ্লবিক মাইলফলক!
India
-Ritesh Ghosh
ভারতের সিমেন্ট শিল্পকে পরিবেশবান্ধব ও পরিবেশ-উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করল আদানি গোষ্ঠীর মালিকানাধীন নামী সংস্থা অম্বুজা সিমেন্টস। গুজরাতের কচ্ছ জেলায় অবস্থিত তাদের সঙ্ঘীপুরম সিমেন্ট প্ল্যান্টে কম-কার্বন ও নবীকরণযোগ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যে ব্রিটেনের অগ্রণী ক্লিন-টেক সংস্থা লিলাক লিমিটেডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন তাঁরা। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে ভারতীয় সিমেন্ট শিল্পে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।
গুজরাতের এই সঙ্ঘীপুরম প্ল্যান্টের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৬৬ লক্ষ টন। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল সিমেন্ট তৈরির পর্যায়গুলিতে কার্বন ক্যাপচার এবং হাইব্রিড ইলেকট্রিক হিটিং পদ্ধতির কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা। এই প্রযুক্তির মেলবন্ধনে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি কারখানায় পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ শক্তির উপযোগিতা বাড়িয়ে তোলা হবে। একইসঙ্গে সিমেন্ট উৎপাদনের ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতেও বৈপ্লবিক বদল আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, সিমেন্ট তৈরিতে সাধারণত প্রচুর পরিমাণে খনিজ এবং উন্নতমানের জ্বালানি পোড়ানো হয়, যা বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত কার্বন নির্গত করে। এই ধরনের প্রক্রিয়াগত নির্গমন রোধ করা সাধারণ ফিল্টার বা পদ্ধতি দ্বারা বেশ কঠিন। লিলাক সংস্থার উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এই নির্গমনের উৎস থেকেই সরাসরি কার্বন অপসারণ করতে সক্ষম, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একটি আধুনিক আবিষ্কার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
সিমেন্ট উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হল কয়লার বিপুল ব্যবহার। নতুন এই চুক্তির অধীনে সঙ্ঘীপুরমে যে বাণিজ্যিক ট্রায়াল শুরু হবে, তাতে বিকল্প এবং সবুজ জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোরালো জোর দেওয়া হয়েছে। যদি এই নতুন পদ্ধতি সফলভাবে কাজ করে, তবে সিমেন্ট উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে কয়লার ব্যবহার পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন প্রযুক্তিবিদেরা।
প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে প্রকল্পটির আয়তন আরও অনেক গুণ বাড়ানোর কথা মাথায় রেখেছে দুই সংস্থা। তারা জানিয়েছে, এই পরীক্ষামূলক প্ল্যান্টটির সক্ষমতা প্রায় সাত থেকে আট গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। যার ফলে ভবিষ্যতে প্রতি বছর অন্তত ১০ লক্ষ টনেরও বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস বাতাসে মেশার আগেই ধরে রাখা যাবে, যা বিশ্ব জলবায়ুর সুরক্ষায় বড় অবদান রাখবে।
আদানি গোষ্ঠীর অম্বুজা সিমেন্টস কর্তৃপক্ষ মনে করছে, সঙ্ঘীপুরমের এই প্রকল্প যদি সফল হয়, তবে এটি সারা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শিল্প-স্তরের কম-কার্বন এবং টেকসই সিমেন্ট কারখানায় পরিণত হতে পারে। এই বিষয়ে নিজের মতামত জানিয়ে অম্বুজা সিমেন্টসের ডিরেক্টর করণ আদানি জানান, সিমেন্ট শিল্পে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ ও বহুযোগিতার পথ উন্মুক্ত করা জরুরি।
করণ আদানি আরও যোগ করেন যে, লিলাক লিমিটেডের সঙ্গে এই চুক্তি তাদের উন্নত গ্রিন-টেক পদ্ধতি পরীক্ষা করার সদিচ্ছাকে প্রমাণ করে। এটি পরিবেশ বিপর্যয় রুখে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাহায্য করবে। বর্তমানে অম্বুজা সিমেন্টস ২০৫০ সালের মধ্যে নিজেদের নেট-জিরো বা শূন্য কার্বন নির্গমনের লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে। তাদের এই সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনাটি বিজ্ঞানভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা বা সায়েন্স বেসড টার্গেটস ইনিশিয়েটিভ দ্বারা স্বীকৃত ও প্রশংসিত।
অম্বুজা সিমেন্টস শুধু কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি উন্নত করতেই জোর দিচ্ছে না, তারা নিজেদের সবুজ চালিকাশক্তি বাড়াতে ইতিমধ্যেই ১ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ওপরেও কাজ করছে। সঙ্ঘীপুরমে কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তির এই পরীক্ষা সফল হলে তা ভারতের সমগ্র সিমেন্ট শিল্পের বাণিজ্যিক উপযোগিতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে এবং বড় আকারের প্রযুক্তি প্রয়োগের পথ আরও সহজ করে দেবে।
যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তি অংশীদার লিলাক লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড্যানিয়েল রেনি এই যৌথ প্রকল্প সম্পর্কে তাঁর গভীর উত্তেজনা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, অম্বুজা সিমেন্টসের মতো শক্তিশালী ও বিশ্বমানের নেটওয়ার্কের সাথে গাঁটছড়া অত্যন্ত গর্বের। তিনি বিশ্বাস করেন, যৌথ গবেষণার দ্বারা তাঁরা আন্তর্জাতিক সিমেন্ট শিল্পের কার্বন সংকট সমাধানে একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সাশ্রয়ী বিকল্প সারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারবেন।
লিলাক লিমিটেডের মূল অংশীদার হল অস্ট্রেলিয়ার সুপরিচিত টেকসই পরিবেশ প্রযুক্তি সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান ক্যালিক্স লিমিটেড। অত্যন্ত দূষণকারী ও ডিকার্বনাইজেশন করা কঠিন এমন ভারী শিল্প ক্ষেত্রগুলিতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই সংস্থা আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের নামী শিল্প গোষ্ঠী এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
ভারতে অম্বুজা সিমেন্টসের ব্যবসায়িক পরিধি ও পরিকাঠামো বিপুল বিস্তৃত। বর্তমানে দেশজোড়া নেটওয়ার্কের আওতায় তাদের মোট ২৪টি সমন্বিত উৎপাদন কেন্দ্র এবং ২২টি গ্রাইন্ডিং ইউনিট দিনরাত কাজ করছে। সামগ্রিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের চাহিদার যোগান মেটাতে তাদের বার্ষিক উৎপাদনের ক্ষমতা প্রায় ১০ কোটি ৯০ লক্ষ টন। দূষণ রুখতে বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার মতো একাধিক পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রকল্প বাড়াচ্ছে সংস্থাটি।
ভারতের দ্রুত পরিকাঠামো উন্নয়নের গতি সচল রেখে পরিবেশের ক্ষতি ন্যূনতম করা একটি অন্যতম প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার। এই পরিস্থিতিতে সঙ্ঘীপুরমের পরীক্ষাটি আগামী দিনের ভারতীয় ভারী শিল্প ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পরিবেশ সুরক্ষার এই সহাবস্থান আগামী দিনে ভারতের সিমেন্ট সেক্টরকে দূষণমুক্ত করার লড়াইয়ে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে এবং বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।


Post Comment