এবার মমতার হাত ছাড়লেন বিশ্বস্ত মদনও, দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে গেলেন ঋতব্রত শিবিরে

West Bengal

-Ritesh Ghosh

কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসে ফের এক বড়সড় ভাঙন। এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী মদন মিত্রও ‘কালীঘাট তৃণমূল’-এর সমস্ত দলীয় পদ ছেড়ে দিলেন। ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ ঠিক আগেই কামারহাটির বিধায়কের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

বুধবার বেলায় রাজ্য রাজনীতিতে এক নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। মদন মিত্র এদিন বিধানসভায় পৌঁছন। সেখানে পৌঁছে তিনি সোজা চলে যান বিদ্রোহী নতুন তৃণমূলের দলনায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করার পর মদন মিত্র আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন যে, তিনি কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় কমিটির চিফ হুইপ, ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এবং দলের সাধারণ সম্পাদকের মতো সমস্ত গুরুদায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন।

Madan Mitra announces resignation from Trinamool Congress party posts

এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত তৃণমূলের অন্দরে এক বড় ক্ষত তৈরি করল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক লড়াইয়ের একেবারে প্রথম দিন থেকে, বিশেষ করে তিনি যখন যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী ছিলেন, তখন থেকেই মদন মিত্র ছিলেন তাঁর অন্যতম প্রধান ছায়াসঙ্গী। তৃণমূল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলের বহু চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষী তিনি। এমনকী ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পরও যখন অনেকে বিদ্রোহী হয়ে উঠছিলেন, তখন মদন কিন্তু নেত্রীর পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন।

দলীয় পদ ছাড়ার পিছনে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মদন মিত্র পরোক্ষে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে তিনি অভিষেককে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বারবার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই আবেদনকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। নিজের আবেদনে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব সাড়া না দেওয়ার কারণেই তিনি ঋতব্রত শিবিরে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে মদন মিত্র বলেন, দুঃখের বিষয় যখন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়টি লেখা হবে, তখন স্পষ্ট ভাষায় লেখা থাকবে যে কীভাবে মাত্র একজন ব্যক্তির জেদ ও আধিপত্যের জন্য একটি গোটা রাজনৈতিক দল ধ্বংস হয়ে গেল, যে দল একদা ২১৩টি আসন নিয়ে বিপুল জনসমর্থন পেয়ে ক্ষমতায় এসেছিল।

মদন মিত্র অবশ্য এটিও জোর দিয়ে বলেছেন যে আদর্শগতভাবে তিনি এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের আদর্শেই বিশ্বাসী। এই দলবদলের চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এক চরম প্রতীকী রূপক ব্যবহার করেছেন। তাঁর কথায়, তিনি তৃণমূলেই ছিলেন এবং তৃণমূলেই থাকবেন। তিনি কেবল এক ঘর থেকে অন্য ঘরে চলে গেলেন। আগের ঘরে হয়তো এক সুখের সোনার পালঙ্ক ছিল, আর এই নতুন ঘরে সাধারণ দড়ির খাটিয়া রয়েছে; তিনি সেই খাটিয়ার কষ্টকর জীবনটাই বেছে নিয়েছেন।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দিয়ে মদন মিত্র বর্তমান শাসক শিবিরের বিরুদ্ধে এক বড় রাজনৈতিক ঝড়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কামারহাটির বিধায়ক জানান যে, এই মুহূর্তে তিনি কেবল তৃণমূলের বিধায়ক নন, তিনি আসলে সমগ্র বাংলার মানুষের বিধায়ক। বিধানসভায় যাওয়ার আগে মদন মিত্র রাজনীতিক সন্দীপন সাহার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। মদন মিত্রের এই দলবদল পশ্চিমবঙ্গে এক চরম রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর মতে, শীঘ্রই এক বড় ঝড় উঠতে চলেছে যা বর্তমান ব্যবস্থার পতন ঘটাবে এবং এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করবে।

এই নাটকীয় পদত্যাগের সমান্তরালেই রাজ্য রাজনীতিতে আরও একটি বিষয় নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় মদন মিত্রের স্ত্রী এবং তাঁর দুই ছেলেকে তলব করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। আগামী ২২ এবং ২৩ জুলাই তাঁদের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কলকাতার দফতরে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের প্রশ্ন, এই কেন্দ্রীয় তদন্তের চাপ এড়াতেই কি তিনি এই পথ বেছে নিলেন?

তবে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই এই যোগসূত্রটিকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছেন প্রবীণ এই নেতা। তিনি সাফ জানান যে ব্যক্তিগত জীবন এবং সক্রিয় রাজনীতি সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন কক্ষপথ। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির আইন অনুযায়ী যে কোনও ব্যক্তিকে তলব করার অধিকার রয়েছে এবং তাঁর পরিবার তদন্ত প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবে। ইডির এই তলবের সঙ্গে তাঁর দলীয় পদত্যাগের কোনও রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই।

Previous post

২১ জুলাইয়ের সভার জট কাটল হাইকোর্টে! প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনেই অনুমতি ‘কালীঘাট তৃণমূল’-কে, জারি একগুচ্ছ নির্দেশিকা

Next post

হাসিনাকে দেশে ফিরতে আহ্বান বাংলাদেশের, মৃত্যুদণ্ডের রায় কি বদলাবে? তারেকের উপদেষ্টা বললেন…

Post Comment

You May Have Missed