শুভেন্দু সরকারের বড় পদক্ষেপ! অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে আসছে ‘গুন্ডাদমন বিল ২০২৬’
West Bengal
-Ritesh Ghosh
পশ্চিমবঙ্গে অপরাধ দমন এবং অপরাধমূলক উপায়ে উপার্জিত অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে এক নজিরবিহীন আইনি পদক্ষেপ করতে চলেছে রাজ্য সরকার। এদিন সোমবারই বিধানসভায় পেশ হতে চলেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুচর্চিত ‘পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’। এই প্রস্তাবিত নতুন খসড়া আইনটি ‘গুন্ডাদমন বিল’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এই বিলের মাধ্যমে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তৃণমূল জমানায় রাজ্যে সিন্ডিকেট রাজ, তোলাবাজি এবং বেআইনি খনি বা বালি পাচারের মতো বহু অভিযোগ বারবার প্রকাশ্যে আসছিল। এমনকী বিভিন্ন মাঝারি ও বড় নেতার বাড়ির আলমারি থেকে কোটি কোটি টাকা এবং বিপুল স্থাবর সম্পত্তির হদিস পেয়েছিল আইনি তদন্তকারী সংস্থাগুলি। সেই প্রেক্ষাপটেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার এবার কড়া আইনি দাওয়াই প্রয়োগ করতে বদ্ধপরিকর। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বেআইনি পথে উপার্জিত জনগণের কোনও অর্থ ও সম্পত্তি অপরাধীদের ভোগ করতে দেওয়া হবে না।

প্রস্তাবিত এই বিলের প্রধান লক্ষ্য হল অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত যে কোনও ধরনের সম্পত্তি সরাসরি বাজেয়াপ্ত করা। বিধানসভা সূত্রের খবর, নতুন আইন কার্যকর হলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কারচুপি বা অবৈধভাবে গড়ে তোলা সম্পত্তি সরকার নিজের অধীনে নিয়ে নিতে পারবে। এর জন্য প্রশাসনের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও পুলিশকে বিশেষ কর্তৃত্ব দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে আদালতে মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার আগেই দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
খয়ক্ষতির সুরাহা করতে খসড়া বিলে বলা হয়েছে যে, বিশেষ কমিশন চাইলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ ‘দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ’ বা জরিমানা ধার্য করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হল রাজনৈতিক বা সামাজিক অপরাধীদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করা। এতদিন সাধারণ আইনের কিছু ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীরা অনায়াসে পালিয়ে যেত, কিন্তু নতুন বিলে পুলিশ প্রশাসনকে প্রভূত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যাতে অপরাধের টাকা উদ্ধার করা নিশ্চিত করা যায়।
বিশেষত বেআইনি অর্থ লোপাট ও স্থাবর সম্পত্তিতে রূপান্তর করার যে হিড়িক দেখা গিয়েছিল, তা রুখতে এটি কার্যকরী পদক্ষেপ হতে পারে। অতীতে দেখা গিয়েছে যে, তোলা ও ঘুষের টাকা দিয়ে বিশাল অট্টালিকা ও বেনামি সম্পত্তি কেনা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের চোখে চরম ক্ষোভ তৈরি করেছিল। এই আইনের সাহায্যে সেইসমস্ত বিলাসবহুল সম্পত্তি সমাজের উন্নয়নে ব্যবহার করার ব্যাপারেও ভাবছে প্রস্তাবিত কমিশন, যা সরকারের অন্যতম বড় লক্ষ্য।
এই বিলের খসড়ায় অসামাজিক কাজ এবং ‘গুন্ডা’ শব্দের পরিধি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও আধুনিকীকৃত করা হয়েছে। কোনও ব্যক্তি যদি নিজে এককভাবে অথবা কোনও দল, অসংগঠিত গ্যাং বা পেশাদার সিন্ডিকেটের সদস্য বা নেতা হিসেবে অভ্যাসগতভাবে সমাজবিরোধী কাজের সাথে যুক্ত থাকেন, তবে তাকে এই নতুন আইনের অধীনে সরাসরি ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, অনৈতিক পাচার প্রতিরোধ এবং বিস্ফোরক আইনের গুরুতর মামলার অভিযুক্তরা এই তালিকায় আসবে।
কেবল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, বরং অপরাধের পূর্বাভাস পেয়ে আগাম প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতাও পুলিশকে দিচ্ছে প্রস্তাবিত আইনটি। সাধারণ মানুষের মনে সামান্যতম আতঙ্ক তৈরি করতে পারে বা এলাকায় নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ছড়াতে পারে, এমন যে কোনও সন্দেহজনক আচরণকেই অসামাজিক কাজের সংজ্ঞায় ফেলা যাবে। এর ফলে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে স্বাধীন হতে পারবে।
আইনজীবীদের একাংশ মনে করছেন, অপরাধের প্রমাণ জোগাড়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার আগেই এই আইন কার্যকর প্রয়োগ করা যাবে। অতীতে অপরাধীরা অনেক সময় আইনের দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ উপভোগ করত এবং মামলা চলাকালীনও এলাকায় পুনরায় ভীতি সৃষ্টি করত। নতুন আইনে জেলা স্তরেও বিশেষ অনুসন্ধান কমিটি গড়ার সুযোগ থাকছে, যারা এই ধরনের সমাজবিরোধী এবং এলাকার গ্যাং লিডারদের গতিবিধির ওপর ২৪ ঘণ্টা কড়া নজর রাখার ক্ষমতা অর্জন করবে।
নতুন এই খসড়া আইনের পরিধি কেবল রাজনৈতিক হিংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। এর আওতায় মূলত সিন্ডিকেট রাজ, তোলাবাজি, জোরপূর্বক জমি দখল, এবং নদী ও খনি থেকে বেআইনি বালি বা পাথর পাচারের মতো মাফিয়া কার্যকলাপ রোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সাথে সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর ও আইনসম্মত ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করাকেও অপরাধের তালিকাভুক্ত করে কড়া জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে。
এছাড়াও খনি অঞ্চল ও বনাঞ্চল ধ্বংস করে অবৈধভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সংস্থান দেওয়া হয়েছে বিলে। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করা ও রাজ্যের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া অপরাধীদের এই আইনের জেরে সরাসরি আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই সমান্তরাল বেআইনি অর্থনীতি ভেঙে দেওয়াও সরকারের তরফ থেকে এই বিলের বড় উদ্দেশ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।



Post Comment