অযোধ্যার রাম মন্দিরে অনুদান চুরিতে অভিযুক্তরা প্রায় সকলেই প্রতিবেশী! চাঞ্চল্যকর এল তথ্য পুলিশের হাতে
India
-Ritesh Ghosh
অযোধ্যার রাম মন্দিরের বহুচর্চিত অনুদান চুরির মামলার তদন্তে একের পর এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। এই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া আটজন অভিযুক্তের মধ্যে পাঁচজনেরই পারস্পরিক গভীর পারিবারিক সম্পর্ক এবং কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করার বিষয়টি এখন পুলিশের তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন যে, এই গোটা অপরাধটি একটি সুপরিকল্পিত উপায়ে সংগঠিত হয়েছিল কিনা।
পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, অভিযুক্তদের মধ্যে পাঁচজন অযোধ্যার কলোনি অঞ্চলের মাত্র ১০০ থেকে ২০০ মিটারের ছোট এলাকার মধ্যে বসবাস করেন অথবা তারা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এই ভৌগোলিক নৈকট্য অপরাধের নীল নকশা তৈরি করার ক্ষেত্রে এবং তা বাস্তবায়নে কোনও সরাসরি ও বড় ভূমিকা পালন করেছিল কিনা, তা এখন প্রশাসনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

অভিযুক্তদের বাসস্থানের বিবরণ ঘেঁটে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, লব কুশ মিশ্র, অবিনাশ শুক্লা এবং অনুকূল মিশ্র একই কলোনির বাসিন্দা। অবিনাশ শুক্লার বাড়িটি লব কুশ মিশ্রের বাড়ির ঠিক পিছনেই অবস্থিত। অন্যদিকে, অনুকূল মিশ্রের বাড়িটি সেখান থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে অবস্থিত, যা তিনি প্রায় দুই বছর আগে কিনেছিলেন।
একই রকমভাবে, মামলার অন্য দুই অভিযুক্ত মণীশ যাদব এবং তিন্নু যাদবের বাড়িও একে অপরের একেবারে সংলগ্ন। এই ধরনের বসবাসের নৈকট্য এবং পারস্পরিক সম্পর্ক তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অভিযুক্তরা সম্ভবত আগে থেকেই একে অপরের সাথে ভীষণভাবে পরিচিত ছিলেন এবং সেই পরিচয়ের সূত্রেই অনুদান সরানোর চক্র তৈরি হয়েছিল।
তদন্তের গতি বাড়াতে অযোধ্যা পুলিশ সম্প্রতি সমস্ত আট অভিযুক্তের বাড়িতে একযোগে এক বড় তল্লাশি অভিযান চালায়। স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটদের ব্যক্তিগত উপস্থিতিতে পুলিশ দল লব কুশ মিশ্র, অবিনাশ শুক্লা এবং রমাশঙ্কর যাদবের মতো অভিযুক্তদের বাড়িতে দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি চালায়। এই আচমকা অভিযানে বিভিন্ন নথিপত্র এবং প্রমাণ সংগ্রহের কাজ করা হয়েছে।
আদালত এই আট অভিযুক্তকে আগামী ২৯ জুন পর্যন্ত বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। পুলিশ সূত্রে খবর পাওয়া গেছে, এবার আসামিদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে আবেদন জানানো হতে পারে। এই মামলার জটিলতা কাটাতে অভিযুক্তদের মুখোমুখি বসিয়ে জেরার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
ঘটনাটি রাজ্যজুড়ে শোরগোল সৃষ্টি করার পর উত্তরপ্রদেশ সরকার ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ (SIT) গঠন করেছে। শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের বিশেষ অনুরোধের পরেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এই সিট চুরির উৎসের সন্ধান করার পাশাপাশি এই চক্রের শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে।
এই সম্পূর্ণ মামলায় অযোধ্যার রাম মন্দির ট্রাস্টের নিজস্ব ভূমিকা নিয়েও ইতিমধ্যে একাধিক অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক কিছু দাবির পর জানা গেছে, পুরো চুরির বিষয়টি সাধারণের গোচরে আসার বেশ কয়েকদিন আগেই ট্রাস্টের নীতিনির্ধারক কর্তারা সম্ভবত এই ধরণের দুর্নীতির ইঙ্গিত বা খবর পেয়েছিলেন।
দাবিমতো, ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ের নির্দেশে গত ৫ জুন ট্রাস্টের প্রতিনিধিরা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে অন্যতম অভিযুক্ত অবিনাশ শুক্লার কলোনির ঠিকানায় আকস্মিক হানা দেন। সেই তল্লাশিতে কিছু পরিমাণ নগদ টাকাও উদ্ধার করা হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে, যা থেকে বোঝা যায় যে চুরির বিষয়টি অত্যন্ত গোপনে তখনই সনাক্ত করা হচ্ছিল।
তবে চরম প্রশ্ন উঠেছে ট্রাস্টের তৎপরতা নিয়ে। ৫ জুনের সেই তল্লাশি অভিযানের পরেও ট্রাস্টের তরফ থেকে পুলিশের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ বা এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়নি। কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই সেদিন তল্লাশি চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে ৭ জুন বিষয়টির খবর বাইরে আসার পরই আইনি তৎপরতা শুরু করা হয়।
রাম মন্দিরের পবিত্র অনুদান নিয়ে দুর্নীতির এই খবর প্রকাশিত হতেই উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সমাজবাদী পার্টির সর্বভারতীয় প্রধান অখিলেশ যাদব গত ৭ জুন সোশাল মিডিয়ায় একটি পোস্টের মাধ্যমে এই দুর্নীতির সরাসরি অভিযোগ আনেন। তিনি কোটি কোটি টাকার অনুদান অপচয় এবং নয়ছয় হওয়ার দাবি তুলে বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান।
এর প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) আন্তর্জাতিক সভাপতি আলোক কুমার এই অভিযোগকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে জানান যে বিরোধী দলগুলি অযথা রাজনীতি করছে। তাঁর মতে, আগামী ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যেই কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টি একযোগে রাম মন্দিরের ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করতে চাইছে।
যদিও সমাজবাদী পার্টির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা পবন পাণ্ডে এই দাবি নস্যাৎ করে দিয়ে বলেছেন যে অখিলেশ যাদব অত্যন্ত দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন। তিনি জনসমক্ষে মুখ খোলার আগে দলের স্থানীয় সোর্সদের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে নিয়েছিলেন। মন্দিরের ভাবমূর্তি যাতে সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করাই ছিল এই সমাজবাদী পার্টির আসল লক্ষ্য।
পবন পাণ্ডে ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন যে, মন্দির চুরির মতো এত স্পর্শকাতর বিষয়টি কেন ট্রাস্ট প্রথম দিকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখল। তিনি গোটা ঘটনায় ক্ষুব্ধ ভক্তদের অসন্তোষকে তুলে ধরে বলেন যে, অযোধ্যার গৌরবময় ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে কড়া দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া খুবই প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবার নজর রয়েছে আদালতের আগামী শুনানির দিকে। রাম মন্দিরের অনুদান দুর্নীতির এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত শেষপর্যন্ত কী মোড় নেয় এবং সিটের রিপোর্টে আরও কোনো নতুন রাঘববোয়ালের নাম উঠে আসে কি না, তা নিয়ে গোটা দেশের নজর রয়েছে।



Post Comment