করাচি হামলার দায় ভারতের ওপর চাপাতে গিয়ে দিল্লির কড়া জবাবে মুখ পুড়ল পাকিস্তানের

করাচি হামলার দায় ভারতের ওপর চাপাতে গিয়ে দিল্লির কড়া জবাবে মুখ পুড়ল পাকিস্তানের

India

-Ritesh Ghosh

করাচিতে জঙ্গি হামলার পিছনে ভারতের মদত রয়েছে বলে পাকিস্তানের তোলা অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সাফ জানিয়েছে, ইসলামাবাদ নিজেদের ত্রুটি ঢাকার জন্য ভারতের দিকে আঙুল তোলা বন্ধ করুক। এদিন রবিবার এক বিবৃতিতে ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে তাদের নিজেদের মাটিতে সক্রিয় জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিবেশীদের ওপর দোষ চাপানোর এই পুরোনো অভ্যাস পাকিস্তানের মজ্জাগত। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল পাকিস্তানের এই দাবিকে কড়া ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে করাচি হামলার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার কোনও ভিত্তি নেই। পাকিস্তানের উচিত অন্যের দিকে আঙুল না তুলে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটের দিকে নজর দেওয়া।

Indian Ministry of External Affairs spokesperson addressing Pakistan accusations

রণধীর জয়সওয়াল আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার করার যে প্রবণতা পাকিস্তানের রয়েছে, তা থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের ভূখণ্ডে ঘাঁটি গেড়ে থাকা জঙ্গি সংগঠনগুলিকে নির্মূল করার কাজে পাকিস্তানের সদিচ্ছা দেখানো উচিত। ভারতের এই কড়া প্রতিক্রিয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের ভিত্তিহীন অভিযোগের বিষয়টি আবারও প্রকাশ্যে এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শনিবার রাতে পাকিস্তানের বন্দর শহর করাচিতে পাকিস্তান রেঞ্জার্সের প্রাদেশিক সদর দফতরে আত্মঘাতী জঙ্গি হামলা ঘটে। বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি নিয়ে রেঞ্জার্সের সদর দফতরে সজোরে ধাক্কা মারে এক হামলাকারী। এর পরই শুরু হয় তুমুল গুলির লড়াই। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘর্ষের জেরে করাচির ওই এলাকা রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি সংঘর্ষে পাকিস্তানের আধাসামরিক বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা গুলিতে তিন জঙ্গি খতম হয়েছে। অভিযান চলাকালীন একজন আফগান নাগরিককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী, যাকে এই হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

এই হামলার পরপরই পাকিস্তানি তালিবানের একটি অংশ হিসেবে পরিচিত জঙ্গি গোষ্ঠী ‘জামাত-উল-আহরার’ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং সেদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি কোনও প্রমাণ ছাড়াই পুরো ঘটনার দায় ভারতের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন। পাকিস্তানি প্রশাসনের দাবি, এই হামলাটি আসলে ভারতের মদতপুষ্ট গোষ্ঠীর কাজ।

পাকিস্তান সরকারের এই অভিযোগকে তীব্রভাবে নাকচ করে দিয়েছেন ভারতীয় কূটনীতিবিদরা। নয়াদিল্লির বক্তব্য, কোনও প্রমাণ ছাড়া এভাবে ভারতের দিকে আঙুল তোলা পাকিস্তানের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনারই প্রকাশ। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে নিজেদের দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা ঢাকতে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ইসলামাবাদ একই ধরনের মিথ্যা ও কাল্পনিক অভিযোগ এনেছে, যা বরাবরই খারিজ হয়েছে।

উল্লেখ্য, জামাত-উল-আহরার নামের যে জঙ্গি সংগঠনটি করাচি হামলার দায় স্বীকার করেছে, সেটি মূলত তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপির একটি বিচ্ছিন্ন অংশ। বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নাশকতা চালানোর পিছনে এই গোষ্ঠীটির সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। নিজেদের ঘরের এই চরমপন্থী শত্রুদের দমন করতে না পেরে উল্টো দিল্লির দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা পাকিস্তানের চিরাচরিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, করাচির এই ঘটনা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থাকেই প্রমাণ করে। দেশটির অভ্যন্তরে সক্রিয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো যেভাবে একের পর এক সেনাঘাঁটি ও সরকারি দফতরে আঘাত হানছে, তা দমন করতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন। নিজেদের এই ব্যর্থতা থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতেই পাকিস্তানের সেনা ও স্বরাষ্ট্র দফতর ভারতের জুজু দেখানোর চেষ্টা করছে বলে মত কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।

ভারত বারবারই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লির অবস্থান অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন। জম্মু-কাশ্মীর থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদের পেছনে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদতের প্রমাণ একাধিকবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছে ভারত। এই অবস্থায় পাকিস্তানের নিজেদের ছড়ানো সন্ত্রাসের আগুনে নিজেরাই দগ্ধ হওয়ার ঘটনাকে ভারতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া এক ধরনের পরিহাস মাত্র।

সব মিলিয়ে, করাচির জঙ্গি হামলার ঘটনা এবং তাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন রাজনৈতিক চাপানউতোর ওয়াঘা সীমান্তের দুই পারের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও শীতল করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। নিজেদের ভূখণ্ডে লালিত-পালিত সন্ত্রাসবাদকে সমূলে উৎপাটন না করলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না, আন্তর্জাতিক মহলের এই বাস্তবাতাই যেন ভারতের এই কড়া জবাবে ফুটে উঠেছে।

Post Comment

You May Have Missed