রাম মন্দিরের অনুদান তছরুপ! অভিযুক্তদের হয়ে আইনি লড়াই লড়তে নারাজ অযোধ্যার আইনজীবীরা

রাম মন্দিরের অনুদান তছরুপ! অভিযুক্তদের হয়ে আইনি লড়াই লড়তে নারাজ অযোধ্যার আইনজীবীরা

India

-Ritesh Ghosh

অযোধ্যার রাম মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া দানের টাকা বা অনুদান আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া আট অভিযুক্তের পক্ষে আইনি লড়াই লড়তে নারাজ স্থানীয় আইনজীবীরা। ধর্মানুভূতিতে আঘাত এবং তীব্র ক্ষোভের কারণে অযোধ্যার আইনি মহল সম্মিলিতভাবে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। এর ফলে এই দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্তরা স্থানীয় স্তরে কোনও আইনি ডিফেন্স বা নির্ভরযোগ্য আইনজীবী পাবেন না বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই সিদ্ধান্তের ওপর আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দিতে সোমবার ফৈজাবাদ বার অ্যাসোসিয়েশনের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ সভা ডাকা হয়েছে। সেখানেই সদস্যদের মতামত নিয়ে অভিযুক্তদের আইনি সহায়তা না দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হবে। এই অভূতপূর্ব পদক্ষেপের কারণে রাম মন্দিরের অর্থ তছরুপ মামলার অভিযুক্তরা আইনি দিক থেকে চরম বিপদের মুখে পড়তে চলেছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় মহলের একাংশ।

Ayodhya lawyers boycott legal defense for donation scam accused

ফৈজাবাদ বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কালিকা মিশ্র জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের হয়ে কোনও আইনজীবী যাতে ফৈজাবাদ বা অযোধ্যা আদালতে ওকালতনামা পেশ না করেন, সেই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সভায় পেশ করা হবে। সোমবারের এই বৈঠকেই স্থির হবে তাদের পরবর্তী আইনি রণকৌশল। আইনজীবীদের অধিকাংশের দাবি, রাম মন্দিরের নামে আসা অনুদানের টাকা চুরি করা কেবল একটি সাধারণ অপরাধমূলক কাজ নয়, এটি সরাসরি কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের ওপর বড়সড় কুঠারাঘাত।

বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শৈলেন্দ্র জয়সওয়ালও আইনজীবীদের এই সম্মিলিত ক্ষোভের কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রাম লালার জন্য নিবেদিত পবিত্র সম্পদের ওপর এই ধরনের জঘন্য অপরাধমূলক হাত বাড়ানো অত্যন্ত গর্হিত কাজ। মন্দিরের দানবাক্স থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাতের এই ঘটনায় আইনজীবীদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় ভাবাবেগ গভীরভাবে ব্যাহত হয়েছে। তাই তারা প্রাথমিকভাবে ধৃত আট অভিযুক্তের পক্ষে না দাঁড়ানোর পক্ষপাতী।

যেহেতু রাম মন্দিরের নবনির্মিত রূপ এবং তার প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, তাই এই মন্দিরের তহবিলের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মন্দির ট্রাস্টের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নজরও এই হাই-প্রোফাইল মামলার গতিপ্রকৃতির ওপর রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় আইনজীবীদের এই সরাসরি অসহযোগিতার ডাক অভিযুক্তদের জন্য আইনি লড়াইকে অত্যন্ত বৈরী ও কঠিন করে তুলবে।

অযোধ্যার আইনি ইতিহাসে অবশ্য এই ধরনের সম্মিলিত বয়কটের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ নতুন নয়। এর আগে ২০০৫ সালে যখন অযোধ্যার বিতর্কিত রাম জন্মভূমি কমপ্লেক্সে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছিল, তখনও ফৈজাবাদের আইনজীবীরা একই ধরনের অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই সময়ে জঙ্গি হামলায় জড়িত অভিযুক্তদের পক্ষে কোনো স্থানীয় আইনজীবী মামলা লড়তে রাজি হননি। ফলে বছরের পর বছর ধরে চলা সেই মামলার প্রতিরক্ষায় অভিযুক্তদের বাইরে থেকে আইনজীবী নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। এবারও রাম ভক্তদের আবেগের কথা মাথায় রেখে একই পথ বেছে নিচ্ছে বার অ্যাসোসিয়েশন।

আইনজীবীদের একাংশের ক্ষোভ এতটাই তীব্র যে তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন কঠোর শাস্তির দাবি তুলতে শুরু করেছেন। বর্ষীয়ান আইনজীবী রাজেন্দ্র চৌধুরী এই প্রসঙ্গে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছেন, কিছু লোভী মানুষের অনৈতিক স্বভাবের কারণে গোটা বিশ্বে অযোধ্যার বাসিন্দাদের সুনাম ও ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত হচ্ছে। এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তে উত্তরপ্রদেশ সরকারের সুপরিচিত ‘বুলডোজার নীতি’ কার্যকর করার পক্ষেও সওয়াল করেছেন তিনি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধের দুঃসাহস না দেখায়।

অন্য এক সমাজসচেতন আইনজীবী বিবেক কুমার সিং এই অপরাধীদের কড়া পুলিশি ঘেরাটোপে আদালতে পেশ করার পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, এই সমাজবিরোধীদের শুধু আদালতে পেশ করাই যথেষ্ট নয়, অপরাধের গভীরতা বিবেচনা করে তাদের সামাজিকভাবেও চিরতরে বয়কট করা উচিত। তবে এই পরিস্থিতি অভিযুক্তদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা, তা নিয়েও আইনজীবীদের অভ্যন্তরে আইনি মহলে মৃদু চর্চা শুরু হয়েছে।

রাম মন্দিরের জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেক অনুষ্ঠানের পর থেকেই দেশের প্রতিটি কোণ থেকে ভক্তরা দৈনিক বিপুল পরিমাণ অনুদান ট্রাস্টের ফান্ডে জমা দিচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হিন্দুদের কাছে এই উৎসর্গীকৃত তহবিলের মর্যাদা অনন্য। ফলে এই মন্দির তহবিলে লক্ষ লক্ষ টাকার অনিয়মের খবর ভক্তদের বিশ্বাসে এবং মনস্তত্ত্বে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ফৈজাবাদ বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ আইনজীবীদের মতে, রাম লালার সম্পদ ও মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থেই তাঁরা এই দৃশ্যত কঠোর নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

রাম মন্দিরের টাকা সরানোর এই চুরির চক্র ফাঁস হওয়ার পর থেকেই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই মামলায় প্রধান অভিযুক্ত লবকুশ মিশ্র, অবিনাশ শুক্লা এবং রামশঙ্কর যাদব সহ মোট আটজনকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত ধৃত আট অভিযুক্তকে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল। মেয়াদ শেষে সোমবার তাদের ফের আদালতে পেশ করা হবে এবং পুলিশ তাদের নতুন করে রিমান্ডে নেওয়ার জন্য সওয়াল করবে বলে সূত্রের খবর।

তদন্ত প্রক্রিয়া জোরদার করতে পুলিশ রবিবার দিনভর ধৃতদের অযোধ্যা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন আস্তানায় এবং বসতবাড়িতে একযোগে তল্লাশি অভিযান চালায়। স্থানীয় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিতিতে চলে এই হাই-প্রোফাইল সার্চ অপারেশন। তল্লাশিতে অভিযুক্তদের বাড়ি থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বা আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার হয়েছে কিনা, তা অবশ্য তদন্তের স্বার্থে এখনও খোলসা করেনি জেলা পুলিশ প্রশাসন।

আইনজীবী মহলের একাংশ মনে করছেন, স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনের এই কড়া অবস্থান অভিযুক্তদের ওপর এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে। আইনজীবীদের সম্পূর্ণ বয়কটের মুখে পড়লে অভিযুক্তদের শেষ পর্যন্ত জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ বা অন্য জেলা থেকে আইনি সহায়তার আবেদন জানাতে হবে। অযোধ্যার রাম মন্দিরের সম্পত্তি তছরুপের এই স্পর্শকাতর মামলাটি যে আগামী দিনে ভারতের জাতীয় স্তরে আরও বড় আইনি ও সামাজিক আলোচনার রূপ নিতে চলেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

Previous post

Swapan Dasgupta: UCC-র পরে এবার কি ‘one nation, one vote’? যা জানালেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত

Next post

Annapurna Yojana: ১ জুলাই আপনি পাবেন ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ৩০০০ টাকা? খুব সহজ নতুন ‘এই’ পদ্ধতি, ১ মিনিটে জানুন স্ট্যাটাস

Post Comment

You May Have Missed