বিশ্বকাপে টানা সাত ম্যাচে গোল! জর্ডানের বিপক্ষে ফ্রি-কিকে ইতিহাস মেসির
Football
-Ritesh Ghosh
বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি আরও একবার ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে নিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে টানা সাতটি ম্যাচে গোল করার এক অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়লেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের নজর কেড়ে নেওয়া এই জাদুকরী পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতা অর্জন করলেন, যা এর আগে কোনও ফুটবলার ছুঁতে পারেননি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস স্টেডিয়ামে চলমান ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের খেলায় জর্ডানের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। গ্রুপ ‘জে’-র এই ম্যাচে বিপক্ষ দলকে ৩-১ ব্যবধানে পরাজিত করে নিজেদের জয়ের ধারা সগৌরবে বজায় রেখেছে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। এই কাঙ্ক্ষিত জয়ের অন্যতম মূল নায়ক হিসেবে বিশ্বমঞ্চের স্পটলাইট আবারও সম্পূর্ণ নিজের দিকে কেড়ে নিলেন দলের মহাতারকা লিওনেল মেসি।

খেলার প্রথমার্ধে সাইডলাইনে থাকলেও, দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে সরাসরি ইতিহাসের পাতায় প্রবেশ করেন মেসি। ম্যাচের ৬০ মিনিটের মাথায় অতিরিক্ত খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন বার্সেলোনার প্রাক্তন এই তারকা। জর্ডানের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখে ম্যাচের ৮০ মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে থেকে একটি জাদুকরী ও নিচু ফ্রি-কিক নেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। প্রতিপক্ষের রক্ষণ দেয়াল ভেদ করে বলটি পোস্টের কোণ দিয়ে সরাসরি জালে জড়িয়ে যায়।
এই গোলটির মাধ্যমে বিশ্বকাপে টানা সাতটি ম্যাচে গোল করার অভূতপূর্ব রেকর্ডটি নিজের করে নিলেন লিওনেল মেসি। এর মাধ্যমে তিনি ফরাসি কিংবদন্তি জাস্ট ফন্তেইন এবং ব্রাজিলের কিংবদন্তি খেলোয়াড় জাইরজিনহোকে এককভাবে ছাড়িয়ে গেলেন। জাস্ট ফন্তেইন ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে টানা ছয়টি ম্যাচে গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিখ্যাত সাম্বা জাদুকর জাইরজিনহোও ঠিক একই গৌরব অর্জন করেছিলেন।
দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অক্ষত থাকা এই বিশাল রেকর্ডটিকে ভেঙে দিয়ে মেসি যেন আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলা হয়। বয়সকে পুরোপুরি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উনচল্লিশ বছর বয়সেও যেভাবে তিনি জাতীয় দলের জয়ের পথ সুগম করছেন এবং আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তা সত্যিই পুরো ফুটবল বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়।
লিওনেল মেসির এই অবিশ্বাস্য গোল করার ধারাবাহিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের ঐতিহাসিক কাতার বিশ্বকাপে। সেই আসরে নকআউট পর্বের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ২-১ ব্যবধানে জয়ের মাধ্যমে এই রেকর্ডের সূচনা ঘটেছিল। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডস এবং সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতেও তার পা থেকে গোল এসেছিল। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ম্যাচে জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন তিনি।
চলতি ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপেও যেন সেই কাতার বিশ্বকাপের একই বিধ্বংসী ফর্মে দেখা যাচ্ছে আটবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী এই জাদুকরকে। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই তিনি প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছেন। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে অসাধারণ এক হ্যাটট্রিক করে নিজের লক্ষ্যের কথা জানান দেন মেসি। এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচেও তার পা থেকে আসে দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি দর্শনীয় গোল।
জর্ডানের বিরুদ্ধে পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে করা জাদুকরী গোলটির মাধ্যমে বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির মোট গোল সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ১৯-এ। এর সাথে সাথে বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও উঁচুতে নিয়ে গেলেন তিনি। মেসির এই রেকর্ড ভাঙার খেলা কেবল আর্জেন্টিনা দলের আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে দিচ্ছে না, বরং টুর্নামেন্টের পরবর্তী প্রতিপক্ষ দলগুলোর ওপর এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছে।
দলের কোচ লিওনেল স্কালোনির নতুন রণকৌশলে মেসিকে যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বিশ্বজুড়ে ফুটবল বিশ্লেষকদের বেশ প্রশংসা কুড়াচ্ছে। নকআউটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে দলের প্রধান শক্তিকে অতিমাত্রায় ক্লান্ত না করে সতেজ রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। জর্ডান ম্যাচে মেসিকে পুরো সময় না খেলিয়ে দ্বিতীয়ার্ধে নামানোর সিদ্ধান্তটি বেশ ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে এবং এটি আগামী দিনগুলোতে দলের জন্য বড় সুবিধা নিয়ে আসবে।
জর্ডানের বিরুদ্ধে জয়ের ফলে গ্রুপ ‘জে’ এর পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি নকআউট পর্বের টিকিট প্রায় নিশ্চিত করে ফেলল আলবিসেলেস্তেরা। মাঠের ভেতরে এবং বাইরে মেসির মতো কিংবদন্তির উপস্থিতি দলের তরুণ খেলোয়াড়দের প্রতিনিয়ত দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করছে। হুলিয়ান আলভারেজ এবং এনজো ফার্নান্দেজের মতো একঝাঁক দুর্দান্ত তরুণ ফুটবলাররা মেসির পাশে খেলে নিজেদের খেলার মানকে প্রতিদিন অনন্য মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছেন。
লিওনেল মেসির এই নতুন কীর্তি ফুটবল বিশ্বের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি যেভাবে প্রায় একা হাতে যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ পরিবর্তন করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, তা বিশ্বজুড়ে তরুণ ফুটবলারদের উদীপ্ত করছে। জর্ডানের বিপক্ষে করা এই গোলটি কেবল একটি সাধারণ রেকর্ড নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের কঠোর অনুশীলন, নিবেদন এবং ফুটবলের প্রতি অدم্য ভালোবাসার এক বাস্তব প্রতিফলন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির এই দুর্দান্ত সফর আগামী ম্যাচগুলোতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশাবলী সমর্থকেরা। গ্রুপ পর্বের চমৎকার পারফরম্যান্সের পর নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার মূল লক্ষ্য এখন শিরোপা নিজেদের কাছে ধরে রাখা। বর্তমান অসাধারণ ফর্ম এবং দলগত সংহতি বজায় রেখে অধিনায়ক মেসি তার দলকে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে যেতে পারেন কি না, এখন ফুটবল বিশ্বের সামনে সেটাই সবচেয়ে বড় দেখার বিষয়।



Post Comment