স্বাস্থ্য পরিষেবায় দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে আদানি গ্রুপের হাত ধরে আসছে ‘আদানি হেলথ সিটি’
India
-Ritesh Ghosh
ভারতের চিকিৎসাক্ষেত্র ও পরিকাঠামো উন্নয়নে এক নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছে আদানি গ্রুপ। আহমেদাবাদ এবং মুম্বইয়ে গড়ে উঠতে চলেছে বিশ্বের প্রথম সারির সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ‘আদানি হেলথ সিটি’। ১ হাজার শয্যার মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল, আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ, উন্নতমানের চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্র এবং ট্রানজিশনাল কেয়ার সুবিধা নিয়ে এই সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেশের স্বাস্থ্য মানচিত্রে এক বৈপ্লবিক বদল আনতে চলেছে।
২০২৬ সালের ২৪ জুন আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেডের বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছেন আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। তাঁর মতে, আহমেদাবাদ ও মুম্বইয়ে প্রস্তাবিত এই ক্যাম্পাসের উন্নয়ন ভারতীয়দের উন্নতমানের স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানের যাত্রায় একটি বড় মাইলফলক স্পর্শ করবে। এর লক্ষ্য একই ছাদের নীচে সর্বাধুনিক চিকিৎসা, আধুনিক গবেষণা ও প্রথম সারির শিক্ষা নিশ্চিত করা।

এই স্বাস্থ্যনগরীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর ‘ট্রানজিশনাল কেয়ার’ ব্যবস্থা। বড় কোনও অস্ত্রোপচার বা জটিল রোগের চিকিৎসার পর রোগীকে বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুত করার এই অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা ব্যবস্থা উন্নত দেশগুলিতে ব্যাপক প্রচলিত হলেও ভারতে এটি অত্যন্ত নতুন ধারণা। আদানি হেলথ সিটির হাত ধরে রোগীরা এখন থেকে এই আধুনিক পুনর্বাসনমূলক চিকিৎসার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।
আহমেদাবাদ ও মুম্বই ভারতের অগ্রগণ্য অর্থনৈতিক শহর হওয়া সত্ত্বেও এখানে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক রোগী উন্নত চিকিৎসার খোঁজে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন। এই দুই শহরে সমন্বিত পন্থায় আদানি হেলথ সিটির ক্যাম্পাসের বিকাশ ঘটানো তাই অত্যন্ত কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এর ফলে সাধারণ মানুষের উপর আর্থিক চাপ যেমন কমবে, তেমনই দেশের সর্বাধুনিক স্বাস্থ্য গবেষণার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠবে এই দুটি অঞ্চল।
আদানি গ্রুপের এই নতুন উদ্যোগ মূলত দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানবিক পরিকাঠামো বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতিরই অংশ। স্বাস্থ্যক্ষেত্রের এই অগ্রগতির পাশাপাশি শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মতো জরুরি সামাজিক সূচকগুলিতেও আর্থিক ও পরিকাঠামোগত বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এটি মূলত মানসম্মত পরিষেবার সুযোগ দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সমানভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করবে।
এই সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হল আদানি ফাউন্ডেশন, যা সম্প্রতি জনসেবামূলক কাজের অত্যন্ত গৌরবময় ৩০ বছরে পদার্পণ করেছে। ডঃ প্রীতি আদানির দক্ষ নেতৃত্বে এই ফাউন্ডেশনটি আজকের দিনে দেশের অন্যতম অগ্রগণ্য মানবকল্যাণমূলক সংস্থায় পরিণত হয়েছে। ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন প্রকল্পের সুফল পৌঁছে গিয়েছে ভারতের ২২টি রাজ্যের ৭ হাজারের বেশি গ্রামে প্রায় ১ কোটির বেশি সাধারণ মানুষের কাছে।
ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শুধু শহরাঞ্চলে নয়, বরং গ্রামীণ ভারতের একেবারে শেষ প্রান্তে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তারই নজির হিসেবে রূপায়িত হয়েছে বিহারের সমন্বিত গ্রামীণ চক্ষু চিকিৎসা মডেল। এই বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষ অত্যন্ত সুলভ মূল্যে উন্নত চোখের চিকিৎসা পাচ্ছেন, যা তাঁদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রসারেও সমান নজর দিয়েছে আদানি গ্রুপ। গুজরাতের ভূজে অবস্থিত ‘গুজরাত আদানি ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস’ (GAIMS) এবং ‘আদানি ইউনিভার্সিটি অফ হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’-এর মতো প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে তাঁরা ইতিমধ্যে সফলভাবে কাজ করে চলেছে। এই উচ্চমানের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষ শিক্ষকদের পরিষেবাকে কাজে লাগিয়েই এবার আহমেদাবাদ ও মুম্বইয়ের নতুন উদ্যোগে বড় মাত্রায় অগ্রগতি ঘটানো হবে।
বর্তমানে দেশের বৃহত্তম সম্পদ তরুণের কর্মক্ষমতা। ভারতের বিপুল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষে আদানি ফাউন্ডেশন তাদের মানবসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচির বিস্তার ঘটিয়েছে বহু দূর। দেশের গ্রামীণ এলাকার ১.২৫ লক্ষেরও বেশি তরুণ-তরুণীকে আধুনিক পেশাদার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া কাজের সুযোগ জোগাতে বিশেষ সহায়ক হয়েছে। এটি মূলত গ্রামীণ শ্রমশক্তিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বাজারের উপযুক্ত করে তোলার একটি প্রয়াস।
এই দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশেষ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে গুজরাতের কচ্ছ অঞ্চলে। সেখানকার বেশ কিছু সরকারি আইটিআই (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) দত্তক নিয়েছে আদানি ফাউন্ডেশন। এই দত্তক নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলির অধীনে ‘কর্ম উৎসব’ কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় যুবকদের নিয়ত আধুনিক কারিগরি দক্ষতা শেখানো হচ্ছে, যা স্থানীয় মেধার বিকাশ ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
এর আগে কচ্ছের ভূজে বিপর্যয় পরবর্তী সময়ে ‘গুজরাত আদানি ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস’ স্থাপন করে আদানি গ্রুপ কচ্ছ অঞ্চলের সম্পূর্ণ চিকিৎসা ও জনসেবা ব্যবস্থার রূপ বদলে দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও পরিকাঠামোকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হওয়া বড় এই স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলি আগামী দিনে সামগ্রিক ভারতীয় চিকিৎসা ও বিজ্ঞান ক্ষেত্রের উন্নয়নের ক্ষেত্রে দিকদর্শন হিসেবে বিবেচিত হবে।
কচ্ছ অঞ্চলের মতো ভৌগোলিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকায় স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির ফলে যুবকদের কাজের তাগিদে বড় শহরের দিকে চলে যাওয়ার হার অনেকটাই কমে এসেছে। নিজ জেলাতেই সম্মানজনক রোজগারের নির্ভরযোগ্য সুযোগ পাওয়ায় ওই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সার্বিক উন্নতি ঘটছে। এই সুসংহত কৌশলটি দেশের অন্যান্য পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের জন্যও একটি আদর্শ মানদণ্ড হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বর্তমান সময়ে কেবল চিকিৎসা বা দক্ষতা বৃদ্ধি একা একা উন্নয়ন ঘটাতে পারে না। মানবসম্পদকে সম্পূর্ণভাবে কার্যকরী করতে হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কর্মমুখী দক্ষতা এই তিনটির একত্র সমন্বয় প্রয়োজন। আদানি গ্রুপ একযোগে এই তিনটি ক্ষেত্রকেই অগ্রাধিকার দেওয়ায় গ্রামীণ ভারতের বড় অংশে সামাজিক পরিকাঠামোর বিকাশ এবং স্বাবলম্বী সমাজ নির্মাণের এক সামগ্রিক রূপরেখা তৈরি হচ্ছে।
আদানি গ্রুপের এই সামগ্রিক উদ্যোগের রূপরেখা থেকে স্পষ্ট যে, তাঁরা বৃহৎ ব্যবসার পাশাপাশি ভারতের সামাজিক ও মানবসম্পদ পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করার দায়িত্বকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। আদানি হেলথ সিটি চালুর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ও মানসম্পন্ন শিক্ষা আগামী দিনে দেশের প্রান্তিক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বিপুলভাবে উন্নত করবে এবং ভারতকে বিশ্বমানের চিকিৎসা গন্তব্যে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



Post Comment