আপাতত বন্ধ কাজ! আগে নির্মীয়মান বেসরকারি বহুতলের স্বাস্থ্যপরীক্ষা, মানুষের স্বার্থে তারাতলার ঘটনার পরই উদ্যোগ রাজ্য সরকারের

আপাতত বন্ধ কাজ! আগে নির্মীয়মান বেসরকারি বহুতলের স্বাস্থ্যপরীক্ষা, মানুষের স্বার্থে তারাতলার ঘটনার পরই উদ্যোগ রাজ্য সরকারের

West Bengal

-Ritesh Ghosh

গার্ডেনরিচ এবং তারাতলার মতো সাম্প্রতিক একাধিক বহুতল বিপর্যয়ের ঘটনা থেকে বড় শিক্ষা নিল রাজ্য সরকার। কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সমস্ত নির্মীয়মাণ বেসরকারি বাণিজ্যিক বহুতলের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে আপাতত এক মাসের জন্য জি+৫ (ছয় তলা বা তার বেশি) ভবনের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজ্য সরকারের এই নতুন নির্দেশিকার আওতাভুক্ত এলাকাগুলির মধ্যে রয়েছে কলকাতা, বিধাননগর, রাজারহাট, নিউটাউন, পূজালি, বারুইপুর, মহেশতলা, রাজপুর-সোনারপুর, দক্ষিণ দমদম, কামারহাটি, বরানগর এবং বালি পুরসভা। মূলত এইসব এলাকায় যেখানে দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে, সেখানে সুরক্ষার দিকটি সুনিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত। নির্মাণকাজে বড় ধরনের গাফিলতি বা বিল্ডিং প্ল্যান ও নকশায় ত্রুটি থাকলে সংশ্লিষ্ট বহুতলের অনুমোদন সরাসরি বাতিল করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

West Bengal halts G 5 building construction for safety audit

এদিন শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই বড় সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, সাধারণ মানুষের জীবনের সুরক্ষাকে কোনওভাবেই আপস বা অবহেলা করা যাবে না। সরকারের এই নজরদারির ফলে নির্মাণ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আসবে এবং প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে বেআইনি বা দুর্বল পরিকাঠামো গড়ে তোলার অসাধু প্রবণতা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই কাজের জন্য ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষ অডিট কমিটি মূলত নির্দিষ্ট এলাকাগুলির সমস্ত নির্মীয়মাণ বেসরকারি বাণিজ্যিক বহুতল বা জি+৫ ভবনগুলির সামগ্রিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা করবে। তদন্তের পর যদি কোনও বহুতলের নির্মাণ কাজ বা নকশায় বড়সড় অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তবে তার সরকারি অনুমোদন সরাসরি বাতিল করে দেওয়া হবে বলে সাফ জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে, যে সমস্ত বহুতলের নকশা বা নির্মাণে সামান্য ত্রুটি পাওয়া যাবে, তাদের ক্ষেত্রে অবশ্য কিছুটা শিথীলতা দেখানো হতে পারে। সেইসব নির্মাণ সংস্থাকে নিজেদের ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করার একটি সুযোগ দেওয়া হবে। সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে অডিট কমিটি যদি সংশ্লিষ্ট বহুতলটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে সবুজ সংকেত দেয়, তবেই আগামী ১ অগাস্ট থেকে সেই সমস্ত প্রকল্পের নির্মাণকাজ আবারও শুরু করা সম্ভব হবে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, এই নতুন সিদ্ধান্ত কেবল বেসরকারি বাণিজ্যিক বহুতলগুলির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। সাধারণ মানুষের নিজস্ব বসতবাড়ির সংস্কার বা মেরামতের ছোটখাটো কাজ এই সমস্ত কড়া বিধিনিষেধের আওতার বাইরে রাখা হচ্ছে। ফলে এই এক মাসের সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সাধারণ নাগরিকরা নিজেদের বাসাবাড়ির যাবতীয় প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজ কোনও বাধা ছাড়াই নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারবেন।

সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাজ্যের নগরায়নের গতি রুদ্ধ করা বা আবাসন শিল্পকে থমকে দেওয়া তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। আসল লক্ষ্য হল মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং আইন কানুনের সঠিক প্রয়োগ সুনিশ্চিত করা। একটি অপরিকল্পিত বা ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ যে কোনও বড়সড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে, যা অতীতে আমরা একাধিকবার প্রত্যক্ষ করেছি। তাই এই পদক্ষেপ বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত জরুরি ছিল।

অডিট কমিটির কাজের ধরন সম্পর্কেও নির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। কমিটির মনোনীত বিশেষজ্ঞরা প্রথম ধাপে পরীক্ষা করে দেখবেন যে, নির্মীয়মাণ বহুতলগুলির নকশা বা ব্লু-প্রিন্ট সরকারের অনুমোদিত নিয়ম মেনে যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে কিনা। এই প্রাথমিক নকশা পরীক্ষার কাজ গুরুত্ব দিয়ে শেষ করে আগামী ৭ দিনের মধ্যে অডিট কমিটিকে তাদের প্রথম পর্বের তদন্ত রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দিতে হবে।

ডিজাইন বা নকশা পরীক্ষার কাজ মিটে গেলে অডিট কমিটির নজর থাকবে ভবনের অন্যান্য অতি আবশ্যিক পরিকাঠামোর দিকে। বহুতলগুলিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সঠিকভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে কিনা এবং বিদ্যুতের সংযোগের ক্ষেত্রে কোনও ঝুঁকি বা গলদ আছে কিনা, বিশেষজ্ঞরা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবেন। এই সমস্ত জরুরি বিষয়ের বিস্তারিত যাচাই পর্ব শেষ করে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে অডিট কমিটিকে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গার্ডেনরিচ কাণ্ডের পর থেকেই কলকাতার বুকে অনিয়ন্ত্রিত ও বেআইনি নির্মাণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। প্রশাসনের কোনও কোনও স্তরের এবং স্থানীয় প্রোমোটারচক্রের যোগসাজেই এই ধরনের বেআইনি বহুতল গজিয়ে উঠছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ। নতুন করে যেন এমন কোনও বিপর্যয় দেখা না দেয়, তার জন্যই সরকারের এই নজিরবিহীন কড়া ও কঠোর মনোভাব বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

এই এক মাসের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এবং কড়া অডিট ব্যবস্থার জেরে সংশ্লিষ্ট আবাসন নির্মাতা ও প্রোমোটারদের ওপর সাময়িকভাবে বড়সড় ব্যবসায়িক চাপ সৃষ্টি হতে চলেছে ঠিকই, তবে প্রশাসনের এই কঠোর মনোভাবকে স্বাগত জানিয়েছেন শহরের সচেতন ও সুশীল সমাজ। তাঁদের মতে, বাণিজ্যিক মুনাফার চেয়ে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা সবার আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার, যা এতদিন অনেকটাই উপেক্ষিত ছিল।

Previous post

আচমকাই সোনার দাম বদলে গেল সপ্তাহের শেষে, আজ কিনলে বড় লাভ পেতে পারেন আপনি?

Next post

বেতনের নিরিখে এলন মাস্কের পরেই স্থান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীর প্রতিদিনের আয় ২৮ কোটি ! কে এই শঙ্খ মিত্র

Post Comment

You May Have Missed