নদিয়ায় সব্যসাচী ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেত্রীর বাড়ি থেকে উদ্ধার কোটি কোটি টাকার সোনা

নদিয়ায় সব্যসাচী ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেত্রীর বাড়ি থেকে উদ্ধার কোটি কোটি টাকার সোনা

West Bengal

-Ritesh Ghosh

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে আর্থিক দুর্নীতি ও বেআইনি সম্পত্তি অর্জনের জাল যে কতটা গভীরে বিস্তৃত, তা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে ভোটের ফল বেরনোর পর থেকেই বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে। বিধাননগরের প্রাক্তন মেয়র তথা হেভিওয়েট তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্তের গ্রেফতারি মামলার এক চাঞ্চল্যকর সূত্র ধরে এবার নদিয়ার এক জেলা পরিষদ সদস্যার বিলাসবহুল বাড়িতে হানা দিয়ে কার্যত তাজ্জব বনে গেলেন তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিকেরা। পুলিশ সূত্রে খবর, সোমবার গভীর রাতে নদিয়া জেলার তেহট্টে ওই তৃণমূল নেত্রীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৩৯ লক্ষ টাকা মূল্যের সোনার বিপুল অলঙ্কার।

বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল সোমবার রাতে এই আকস্মিক তল্লাশি অভিযান সম্পন্ন করে। পুলিশ সূত্রের খবর, ধৃত নেতা সব্যসাচী দত্তকে তাঁর হেফাজত থেকে সঙ্গে নিয়েই নদিয়া জেলা পরিষদের সদস্যা তথা প্রভাবশালী তৃণমূল নেত্রী টিনা ভৌমিক সাহার তেহট্টের বাড়িতে যান তদন্তকারীরা। তল্লাশি চালানোর সময় ওই বাড়ি থেকে প্রায় ৩ কিলোগ্রাম ওজনের বিপুল পরিমাণ বহুমূল্য সোনার অলঙ্কার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।

Police investigating recovered gold at politician home

ছবি সৌজন্য ফেসবুক ও পিটিআই

সম্প্রতি তোলাবাজি, জবরদখল এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অগাধ সম্পত্তি অর্জনের একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন সব্যসাচী দত্ত। বিধাননগরের একসময়ের দাপুটে এই প্রাক্তন মেয়র গত বিধানসভা নির্বাচনে শাসক দলের হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে বারাসত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও পরাজিত হয়েছিলেন। গ্রেফতারের পর পুলিশ তাঁর বিভিন্ন গোপন আস্তানা ও আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র খতিয়ে দেখতে গিয়েই নদিয়ার ওই নেত্রীর সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্কের বিষয়ে জানতে পারে।

তদন্তকারী আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, সব্যসাচী দত্তকে গ্রেফতারের পরপরই তাঁর রাজারহাটের ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাঙ্কের লকারে দফায় দফায় তল্লাশি চালানো হয়েছিল। সেখান থেকে ইতিপূর্বে উদ্ধার হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন কেজি সোনা। শুধু সোনা উদ্ধারই নয়, রাজারহাটের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে কোটি কোটি টাকার সোনা কেনার একাধিক সুনির্দিষ্ট রসিদ ও ভাউচারও পুলিশের হাতে এসেছিল। ধৃত নেতাকে ক্রমাগত জেরা করেই উঠে আসে ওই বিপুল সোনা কেনার পেছনের অসদুপায়ের আসল চিত্র।

জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালীন সব্যসাচী দত্ত নাকি স্বীকার করেন যে, তিনি নিজে যেমন অবৈধ উপার্জনের বিপুল অর্থ সোনায় বিনিয়োগ করেছিলেন, তেমনই তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ঘনিষ্ঠ বৃত্তের লোকেদেরও সোনা কিনে রাখার বিষয়ে নানা উপায়ে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর এই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠদের তালিকায় অত্যন্ত শীর্ষে অবস্থান করছিলেন নদিয়ার নেত্রী টিনা ভৌমিক সাহা। পুলিশ অনুসন্ধান করে জানতে পারে যে, সব্যসাচীর রাজারহাটের ফ্ল্যাটে টিনার নিয়মিত যাতায়াত ছিল এবং তাঁদের মধ্যে বড় অঙ্কের আর্থিক আদানপ্রদান চলত।

সোনার কেনার সেই অবৈধ বিনিয়োগের নথি ও সব্যসাচী দত্তের দেওয়া গোপন তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সোমবার রাতে বিধাননগর পুলিশের একটি বিশেষ দল সব্যসাচীকে নিয়ে সরাসরি তেহট্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। গভীর রাতে নদিয়ায় পৌঁছে নেত্রী টিনা ভৌমিক সাহার বাড়িতে আচমকা অভিযান চালিয়ে শুরু হয় ম্যারাথন তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব। রাতের অন্ধকারে চারপাশের নিস্তব্ধতার মধ্যে বিশাল পুলিশ বাহিনীর এই নাটকীয় পদক্ষেপে সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাতারাতি ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়।

দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার টানা তল্লাশি প্রক্রিয়া শেষ করে উদ্ধার হওয়া সমস্ত অলঙ্কার পরিমাপের পর দেখা যায় যে, তার মোট ওজন প্রায় ৩ কিলোগ্রাম। বর্তমান বাজারে সোনার অতি উচ্চ মূল্যের হিসেব অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ সোনার বাজার মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৩৯ লক্ষ টাকারও বেশি বলে অনুমান করা হচ্ছে। পুলিশ এই সমস্ত সোনার অলঙ্কার সম্পূর্ণ বাজেয়াপ্ত করে থানায় নিয়ে আসে এবং এই বিপুল সোনা ক্রয়ের যাবতীয় অর্থনৈতিক উৎসের আইনি খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে।

Post Comment

You May Have Missed