শিল্পবান্ধব বাজেট, শিল্প চায় বাংলা, ব্যবসাকে সিন্ডিকেট-মুক্ত করতে আইন! শিল্পের জন্য সহজেই মিলবে জমি

শিল্পবান্ধব বাজেট, শিল্প চায় বাংলা, ব্যবসাকে সিন্ডিকেট-মুক্ত করতে আইন! শিল্পের জন্য সহজেই মিলবে জমি

তোলাবাজি আটকাতে আনা হচ্ছে নতুন আইন ৷ স্বপন দাশগুপ্ত জানান, হস্তক্ষেপ এবং চাঁদাবাজির ফলে ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। এই কারণে আগামী দিনে একটি আইন আনা হবে। ব্যবসাকে সিন্ডিকেট চার্জ এবং অন্য বেআইনি অর্থ আদায় থেকে রক্ষা করার আইন আনা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও সোমবার জানান, ‘‘ব্যাপক বিনিয়োগ এবং শিল্প আনতে গেলে আইনশৃঙ্খলাকে সুদৃঢ় করা, তোলাবাজি-সিন্ডিকেট বন্ধ করা। সিঙ্গল উইনডো সিস্টেমের মাধ্যমে শিল্প ও ব্যবসার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা ৷’’

বাংলায় নাকি শিল্প হয় না। বাংলায় নাকি বিনিয়োগ আসে না। গত পনেরো বছরে এই কথাই বারবার শুনতে হয়েছে রাজ্যবাসীকে। তৃণমূল জমানায় শিল্পের খরা দেখেছে রাজ্য। বড় শিল্প নেই। চাকরিও নেই। যে টুকু বিনিয়োগ এসেছে, তারও পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে তোলাবাজি, হুমকি। বাংলার এই শিল্প-ছবির বদল চায় রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকার। বাংলাকে শিল্পবান্ধব রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলতে একগুচ্ছ ঘোষণা অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর বাজেটে।

তোলাবাজি আটকাতে নতুন আইন:

অর্থমন্ত্রীর কথায়, ‘‘হস্তক্ষেপ ও চাঁদাবাজি ব্যবসাকে ক্ষতি করছে। এই কারণে সামনের দিনে আমরা একটি আইন আনছি। আমাদের সরকার আইন অনুযায়ী ব্যবসাকে সিন্ডিকেট চার্জ এবং অন্যান্য অর্থ আদায় করার আইন আনব ৷’’

তোলাবাজি মুক্তিতে কড়া দাওয়াই। একই সঙ্গে রাজ্যে ব্যবসার অনুকুল পরিবেশ তৈরি করতে একগুচ্ছ ঘোষণা। রাজ্য বাজেটে ঘোষণা, ‘‘১০০ কোটি টাকার বেশি প্রস্তাবিত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের NOC লাগবে না ৷’’

জমি পেতে সুবিধা:

বাংলায় শিল্পে বড় সমস্যা জমি। একলপ্তে জমি পেতে অসুবিধায় পড়তে হয় বিনিয়োগকারীদের। ল্যান্ড ব্যাঙ্ক নামেই। সেই ব্যাঙ্কে জমি মেলে না। বড় শিল্পের জন্য জমি পাওয়ার পথ সহজ করার ঘোষণা বাজেটে।

সিঙ্গল উইন্ডো নীতি:

স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, ‘‘বৃহৎ শিল্প বিনিয়োগ সহজতর করতে এবং Ease of Doing Business-এর উন্নতির জন্য ১০০ কোটি টাকা ও তার বেশি প্রস্তাবিত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জিলা পরিষদ ও পঞ্চায়েত সমিতি থেকে আলাদা করে বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন, ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক অনুমতি নেওয়ার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে। এর পরিবর্তে রাজ্য সরকার এই অনুমতিগুলি প্রয়োজনীয় আন্তর্বিভাগীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজ্য পর্যায়ের এক-জানালা ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি ও মঞ্জুর করবে ৷’’

বাজেট নিয়ে আশাবাদী শিল্পমহলও ৷ প্যাটন ইন্টারন্যাশনলের প্রেসিডেন্ট সুমিত গোয়েলের কথায়, ‘‘বড় শিল্প এখানে আসতে পারছিল না। ল্যান্ড সেলিংয়ে সমস্যা ছিল। নতুন বিজেপি সরকার ফ্রেশ এয়ার এনেছেন। শিল্পমহল আশাবাদী। নতুন সরকার ভালমতোই শিল্পবান্ধব ৷’’

শিল্পে ফিরছে অনুদান:

অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের কথায়, ‘‘শিল্প-বৃদ্ধিকে সুগম করতে ও ভূ-সম্পত্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিং ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার হাতে পড়ে থাকা অব্যবহৃত শিল্পের জমি চিহ্নিত ও পুনরুদ্ধার করে রাজ্য সরকার একটি সামগ্রিক ল্যান্ড ব্যাঙ্ক গড়ে তোলার প্রয়াস করবে। আমাদের সরকার একটি ইন্সেন্টিভ প্যাকেজের মাধ্যমে বেসরকারি ক্ষেত্রকে একক-পণ্যভিত্তিক এবং বহু-পণ্যভিত্তিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপনে উৎসাহ দেবে ৷’’

শিল্পপতি সঞ্জয় বুধিয়ার কথায়, ‘‘পজিটিভিটি ক্রিয়েট হয়েছে। ইনসেন্টিভ ওয়াইডলি অ্যাপ্রিশিয়েটেড। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, সেমি কন্ডাক্টর সেক্টর মানে বেঙ্গল মিনস বিজনেস। যত দ্রুত পারব আমরা করব ৷’’

শিল্প মানে উন্নতি। শিল্প মানে কর্মসংস্থান। শিল্প মানে বাংলায় আমূল বদল। বদলের বাংলায় ভরসার বাজেট। এই বাজেটে আশাবাদী শিল্পমহল। অম্বুজা নেওটিয়া গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান হর্ষবর্ধন নেওটিয়ার বক্তব্য, ‘‘বাংলার বাজেট শুধু কয়েকটি সিদ্ধান্ত নয়। একটি প্রক্রিয়া। নতুন বিমানবন্দর ও পরিকাঠামো তৈরির মাধ্যমে আঞ্চলিক বিনিয়োগের নেটওয়ার্ক তৈরির উদ্যোগ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিল্পের দিকেও নজর রয়েছে। আগামী দিনে বাংলার উন্নয়নের চাকা চিরাচরিত পথের বাইরে বেরোবে। এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলাকে ঘিরে উন্নয়নের মানচিত্র তৈরি হবে।’’

Harshavardhan Neotia, Chairman of Ambuja Neotia Group

হর্ষবর্ধন নেওটিয়ার কথায়, “এই বাজেটের সবচেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক দিক হল, এতে প্রবৃদ্ধিকে বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম) হিসেবে দেখা হয়েছে। নতুন বিমানবন্দর ও পরিকাঠামোর মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা উন্নয়নের ওপর জোর, প্রস্তাবিত শিল্পোন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপর গুরুত্ব—এই সব পদক্ষেপ একত্রে রাজ্যের ঐতিহ্যগত প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রগুলোর বাইরেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে, এই উদ্যোগগুলি নতুন আকাঙ্ক্ষার দুয়ার খুলে দিতে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং পশ্চিমবঙ্গের জন্য আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী উন্নয়নের নতুন আখ্যান গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।”

Dr Sanjiv Goenka, Chairman, RPSG Group

Dr Sanjiv Goenka, Chairman, RPSG Group

RPSG গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. সঞ্জীব গোয়েঙ্কার কথায়, “পশ্চিমবঙ্গের বাজেট রাজ্যের উন্নয়নের যাত্রাপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং এটি আরও প্রতিযোগিতামূলক ও ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত অর্থনীতি গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন। অবকাঠামো, শিল্প, প্রযুক্তি, সংযোগ ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্ন শক্তির উপর এর বিশেষ জোর রাজ্যজুড়ে বিনিয়োগ, উদ্যোগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করার সম্ভাবনা রাখে। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উন্নয়নের সুফল যাতে বাংলার প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছায়, সেই প্রচেষ্টা। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে লক্ষ্য করে এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই বাজেট পশ্চিমবঙ্গকে ব্যবসা ও শিল্পের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়। সামগ্রিকভাবে, এটি একটি প্রগতিশীল ও দূরদর্শী বাজেট, যা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সবার অংশীদারিত্বে সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করে।”

Post Comment

You May Have Missed