জোড়া গোলে বিশ্বকাপে রেকর্ড গড়লেন লিওনেল মেসি, আর্জেন্টিনা হারাল অস্ট্রিয়াকে
Football
-Ritesh Ghosh
বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন ইতিহাস গড়ার জন্য লিওনেল মেসির চেয়ে উপযুক্ত ফুটবলার আর কে-ই বা হতে পারতেন। আমেরিকার ডালাসের মাঠে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে বাঁ পায়ের সেই চিরপরিচিত শটেই ইতিহাস সৃষ্টি করলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় এখন শীর্ষে এককভাবে বসে আছেন এলএমটেন। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে তাঁর পা থেকে আসা আরও একটি গোল ইতিহাস লেখার পাশাপাশি ম্যাচের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুলে দিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার হাতে।
চলতি টুর্নামেন্টে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেই পাঁচটি গোল করে ফেলেছেন এই ফুটবল জাদুকর। মেসির এই অবিস্মরণীয় ফর্মের ওপর ভর করেই টুর্নামেন্টের গ্রুপ ‘জে’ থেকে নকআউট পর্বের খেলা প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। আগামী বুধবার ৩৯ বছরে পা দিতে চলা মেসির জন্য এবারের জন্মদিনের হয়তো এটাই সবথেকে বড় এবং স্মরণীয় উপহার। কেরিয়ারের সায়াহ্নে এসেও তাঁর এই ছন্দ ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে মুগ্ধ করে চলেছে।

ডালাসের এই রাত ফুটবলপ্রেমীদের মনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক সমাপতনের কারণে চিরকাল খোদাই করা থাকবে। আজ থেকে ঠিক ৪০ বছর আগের এই দিনটিতেই পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো মারাদোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং একক দৌড়ের অলৌকিক গোলের সৃষ্টি হয়েছিল। মারাদোনার ফুটবল ঈশ্বর হয়ে ওঠার চার দশক পূর্তির এই দিনে মেসির রেকর্ড গড়া মাঠের দর্শক এবং ধারাভাষ্যকারদের আবেগাপ্লুত করে তুলেছিল।
ডালাস শহরের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ফুটবল কাহিনীর এক বেদনাদায়ক ক্ষতের অধ্যায় জড়িত হয়ে ছিল। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে আমেরিকায় ডালাসের এই শহরেই দিয়েগো মারাদোনা বিশ্বমঞ্চে শেষবার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে খেলেছিলেন। এরপর ডোপ টেস্টে পজিটিভ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে নিষিদ্ধ হতে হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর একই শহরে মেসির এই বিশ্বরেকর্ড যেন সেই কলঙ্ক ও দুঃখের ইতিহাসকে ধুয়ে মুছে এক নতুন গৌরবময় সোনালী অধ্যায়ের শুভ সূচনা করল।
তবে অস্ট্রিয়ার মতো সুসংগঠিত দলের বিরুদ্ধে জয়ের এই পথ আর্জেন্টিনার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। রালফ রাংনিকের প্রশিক্ষণাধীন অস্ট্রিয়া দল প্রথম থেকেই আক্রমণের বদলে নিখুঁত পাসের সাহায্যে মাঝমাঠের দখল নেওয়ার চেষ্টা করছিল। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ পুরো ম্যাচে বেশ সতর্ক থাকলেও মাঝমাঠে তীব্র লড়াই প্রতি মুহূর্তের গতিপথ বদলে দিচ্ছিল। তবে প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালীই হোক না কেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দলে যে এক অলৌকিক জাদুকর রয়েছেন তা আবারও প্রমাণিত হল।
ম্যাচ শুরুর মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় টানটান উত্তেজনাপূর্ণ এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল স্টেডিয়ামের বুকে। অস্ট্রিয়ান ডিফেন্ডার স্টিফান পোশ পেনাল্টি বক্সের ভেতর মার্তিনেসকে জোর করে ফেলে দিলে রেফারি আমিন মোহামেদ ওমর প্রাথমিকভাবে ফাউলের নির্দেশ দেননি। কিন্তু ভিএআর প্রযুক্তির দীর্ঘ চেকের পর রেফারি আর্জেন্টিনার সমর্থনে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্টেডিয়ামজুড়ে তখন বাঁধভাঙা উল্লাস, সবাই ধরেই নিয়েছিলেন মেসির জাদুকরি শটে বল জালে জড়ানো এখন সময়ের ব্যবধান মাত্র।
কিন্তু অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে মেসি সেই সহজ পেনাল্টি শটটি গোলপোস্টের বাইরে মারেন। অতিমানব বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় তাঁর শটটি বাঁ দিকের পোস্টের পাশ দিয়ে সীমানার বাইরে চলে যায়। মাঠের হাজার হাজার ভক্ত এবং খেলোয়াড়েরা মুহূর্তের জন্য নিজেদের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। পেনাল্টি হাতছাড়া হওয়ার ধাক্কা কাটিয়ে অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়েরা আরও উজ্জীবিত ফুটবল খেলতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের রাস্তায় হাঁটে।
এই ধাক্কার সুযোগ নিয়ে অস্ট্রিয়া মাঝমাঠের দখল নিয়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। বিশেষ করে মার্সেল সাবিৎজারের পা থেকে আসা একটি অসাধারণ হাফ-ভলি রক্ষা করতে হয় ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোকে। অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার ডেভিড আলাবার একটি ভুল পাস দক্ষতার সঙ্গে ক্লিয়ার করে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে এগিয়ে যেতে দেননি। দুই দলের তীব্র ট্যাকল কড়া ফুটবলের মেজাজ যেন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
পেনাল্টি মিসের হতাশা ভুলে মেসি অবশ্য খুব দ্রুত খেলায় ফিরেছিলেন। ম্যাচের গতি কিছুটা কমতেই নিজের চেনা ছন্দ ফিরে পান তিনি। মাঝমাঠ থেকে থিয়াগো আলমাদা দারুণ কৌশলে বলটি ফরোয়ার্ডে পাঠিয়ে দেন ফাকুন্দো মেদিনার পায়ে। মেদিনার নিখুঁত ক্রস থেকে বক্সের মধ্যে সঠিক পজিশনে দাঁড়িয়ে বাঁ পায়ের ট্রেডমার্ক শটে অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন মেসি। চিরাচরিত নীরব উদযাপনের বদলে মেসি এবার আকাশের দিকে হাত তুলে এক পরম স্বস্তির প্রকাশ দেখান।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই অস্ট্রিয়া সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস দুর্দান্ত রিফ্লেক্সের পরিচয় দিয়ে সাবিৎজারের বেশ কয়েকটি ফ্রি-কিক এবং নিশ্চিত গোলের সুযোগ নস্যাৎ করে দেন। খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কোচ রক্ষণভাগে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর পরিবর্তে মাঠে নামান অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দিকে। অস্ট্রিয়ার ক্রমাগত আক্রমণ সত্ত্বেও গোলমুখ খুলতে ব্যর্থ হতে হয় তাদের শক্তিশালী রক্ষণভাগের কারণে।
খেলার শেষ মিনিটে মেসির দ্বিতীয় গোলটি অস্ট্রিয়ার পয়েন্ট পাওয়ার যৎসামান্য আশাটুকুও চিরতরে শেষ করে দেয়। প্রথম প্রয়াস প্রতিহত করা হলেও অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় ফিরতি শটে গোল করে খেলা নিজেদের খোপে পুরে নেয় আর্জেন্টিনা। এই জয়ের ফলে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের দল গ্রুপ পর্বে শীর্ষস্থান প্রায় নিশ্চিত করে মাঠে দাপট বজায় রাখল। মারাদোনার ছায়াবৃত ডালাস শহরের বুকে মেসির এই মহাকাব্য বিশ্ব ফুটবলে আজও এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা ইতিহাস হিসেবে উজ্জ্বল থাকবে।



Post Comment